আজ খতমে তারাবিতে চতুর্থ পারার পুরোটা ও পঞ্চম পারার প্রথম অর্ধেক; মোট দেড় পারা তিলাওয়াত করা হবে। সুরা আলে ইমরানের ৯২ থেকে সুরা নিসার ৮৭ নম্বর আয়াত পর্যন্ত—এই অংশে বদর যুদ্ধ, ইসলামের দাওয়াত, উত্তরাধিকার, এতিমের অধিকার, বিয়েশাদি, পারিবারিক বিরোধ মীমাংসাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিধানের কথা আলোচিত হয়েছে। এখানে সংক্ষেপে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কথা তুলে ধরা হলো—
আল্লাহ তাআলা সুরা আলে ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতকে শ্রেষ্ঠ উম্মত ঘোষণা করে তাদের তিনটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন—এক. তারা সৎ কাজের আদেশ দেয়, দুই. তারা অন্যায় কাজে বাধা দান করে এবং তিন. তারা আল্লাহর প্রতি ইমান আনে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের আগে ৭০টি উম্মত অতিক্রান্ত হয়েছে। তবে সবার মধ্যে তোমরাই শ্রেষ্ঠ।’ (ইবনে মাজাহ)
সুরা আলে ইমরানের ১২১ থেকে ১২৯ নম্বর আয়াতে বদর যুদ্ধের আলোচনা রয়েছে। মুসলিম ইতিহাসের প্রথম সশস্ত্র লড়াই এটি। দ্বিতীয় হিজরির ১৭ রমজান মদিনার উপকণ্ঠে বদর নামক স্থানে কাফেরদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের যুদ্ধ। এটি ছিল অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের লড়াই। দাম্ভিকতার বিরুদ্ধে একনিষ্ঠতার লড়াই। অবিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিশ্বাসের লড়াই। এ যুদ্ধে কুরাইশ বাহিনীর ১ হাজার সশস্ত্র সেনা, ১০০টি ঘোড়া, ৭০০টি উট ছিল। মুসলমানেরা ছিলেন ৩১৩ জন। তাঁদের সঙ্গে ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া ও ৭০টি উট। মুসলিমরা এ যুদ্ধে আল্লাহর গায়েবি মদদে অলৌকিকভাবে বিজয় লাভ করেন এবং কাফেররা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এতে কুরাইশদের ৭০ জন নিহত হয় ও ৭০ জন বন্দী হয়। মুসলিমদের ১৪ জন শহিদ হন।
সুরা নিসা মদিনায় অবতীর্ণ। এ সুরার আয়াত সংখ্যা ১৭৬। পবিত্র কোরআনের চতুর্থ সুরা এটি। নিসা অর্থ নারী। এ সুরায় নারীর অধিকার, নারীর উত্তরাধিকার, দাম্পত্যজীবন, তালাক ও নারী সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ের আলোচনা রয়েছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এ সুরার নাম রাখা হয় সুরা নিসা। নারীর উত্তরাধিকার বিষয়ে এত বিস্তারিত আলোচনা অন্য কোনো সুরায় করা হয়নি।
আল্লাহর বিধান অনুযায়ী মৃতের সম্পদ ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ করা ফরজ। আমাদের সমাজে উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টনে নানাবিধ উদাসীনতা দেখা যায়। কোনো মুসলমান মারা গেলে তার সম্পত্তি বণ্টনের আগে কিছু আনুষ্ঠানিকতা পালন করা জরুরি। যেমন—তার সম্পদ থেকে দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করা, ঋণ আদায় করা, স্ত্রীর দেনমোহর আদায় করা এবং অসিয়ত করে গেলে তার প্রাপককে বুঝিয়ে দেওয়া। এ কাজগুলো শেষ হলে মৃত ব্যক্তির অবশিষ্ট সম্পত্তি ইসলামি ফারায়েজ আইন অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কমবেশি করা যাবে না। মা, স্ত্রী, ফুফু ও বোনদের ঠকানো যাবে না। আমাদের সমাজে সম্পদ বণ্টনে তাঁদের নানাভাবে ঠকানোর প্রবণতা দেখা যায়।
ইসলামি শরিয়তে মা, স্ত্রী, কন্যা কখনোই উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয় না। তাঁরা উত্তরাধিকার হিসেবে সম্পদ পাবেনই। মৃতের সম্পদ বণ্টনে আল্লাহর আইন অমান্য ও ওয়ারিশ ঠকানো পাপ। কবিরা গুনাহ।
আপনি নিয়মিত নামাজ, রোজা, তারাবি, হজ, জাকাত, ফিতরা, সদকা, দান-খয়রাত করছেন, কিন্তু ওয়ারিশ ঠকিয়েছেন, তাহলে আপনার ইবাদত কবুল হবে না। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনেরা, জোরপূর্বক নারীর উত্তরাধিকার হওয়া তোমাদের জন্য বৈধ নয়। আর তাদের আবদ্ধ করে রেখো না, যাতে তোমরা তাদের যা (প্রাপ্য সম্পত্তি) প্রদান করেছ, তার কিয়দংশ নিয়ে নাও।’ (সুরা নিসা: ১৯)
উল্লেখ্য, জাহেলি যুগে স্ত্রীদের স্বামীর সাধারণ সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হতো। ফলে স্বামীর মৃত্যুর পর অন্যান্য সম্পত্তির মতো স্ত্রীও তাঁর উত্তরাধিকারীর (বাবা, ভাই, ছেলে ইত্যাদি) সম্পত্তিতে পরিণত হতো। সে যুগে বাবার মৃত্যুর পর সৎমাকে বিয়ে করা যেত। ওই নারী সম্পদের মালিক হয়ে থাকলে সেগুলো কুক্ষিগত করতে জোর করে বিয়ে করা হতো। এমনকি সম্পদশালী নারীর বিয়ে ঠেকিয়ে দিত তার স্বজনেরা। (তাফসিরে জাকারিয়া)
সব নারী-পুরুষ একে অন্যের সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না। কাকে বিয়ে করা যায় আর কাকে বিয়ে করা যায় না, এ বিষয়ে ইসলামে একটি মৌলিক নীতি আছে। সুরা নিসার ২৩ থেকে ২৫ নম্বর আয়াতে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। যে ১৪ শ্রেণির নারীকে বিয়ে করা হারাম, তাদের তালিকা এখানে দেওয়া হলো—
১. মা
২. দাদি, নানি ও তাদের ওপরের সবাই
৩. নিজের মেয়ে, ছেলের মেয়ে, মেয়ের মেয়ে ও তাদের গর্ভজাত কন্যাসন্তান
৪. সহোদর, বৈমাত্রেয় (সৎমায়ের মেয়ে) ও বৈপিত্রেয় (সৎবাবার মেয়ে) বোন
৫. বাবার সহোদর বোন এবং বাবার বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় বোন
৬. যে স্ত্রীর সঙ্গে দৈহিক মিলন হয়েছে, তার পূর্ববর্তী বা পরবর্তী স্বামীর ঔরশজাত কন্যাসন্তান, স্ত্রীর আপন মা, নানি শাশুড়ি ও দাদি শাশুড়ি
৭. মায়ের সহোদর বোন এবং মায়ের বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় বোন
৮. ভাতিজি অর্থাৎ সহোদর, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় ভাইয়ের মেয়ে ও তাদের পরের প্রজন্মের কন্যাসন্তানেরা
৯. ভাগ্নি অর্থাৎ সহোদর, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় বোনের মেয়ে ও তাদের পরের প্রজন্মের কন্যাসন্তানেরা
১০. দুধ মেয়ে (স্ত্রীর দুধ পান করেছে এমন), সেই মেয়ের মেয়ে, দুধছেলের মেয়ে ও তাদের পরের প্রজন্মের কোনো কন্যাসন্তান এবং দুধছেলের স্ত্রী
১১. দুধ মা এবং তার দিকের খালা, ফুফু, নানি, দাদি ও তাদের ঊর্ধ্বতন নারীরা
১২. দুধ বোন, দুধ বোনের মেয়ে, দুধ ভাইয়ের মেয়ে এবং তাদের গর্ভজাত যেকোনো কন্যাসন্তান। অর্থাৎ দুধ সম্পর্ককে রক্তসম্পর্কের মতোই গণ্য করতে হবে
১৩. ছেলের স্ত্রী
১৪. এমন দুই নারীকে একসঙ্গে স্ত্রী হিসেবে রাখা যাবে না, যাদের একজন পুরুষ হলে তাদের মধ্যে বিয়ে বৈধ হতো না। যেমন—স্ত্রীর বোন, খালা, ফুফু এ ছাড়াও ওহুদ যুদ্ধ, মৃত্যু, হাশর, আসমান-জমিন সৃষ্টি, দাম্পত্য জীবন, মুমিনদের বারবার পরীক্ষার কারণ, আমানত আদায়, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা ও জিহাদ পালনসহ ইত্যাদি বিষয় আলোচিত হয়েছে।
লেখক: ইসলামবিষয়ক গবেষক ও সাংবাদিক
আরও খবর পড়ুন:

কোরবানি একদিকে আত্মত্যাগের মহাকাব্য, অন্যদিকে মুসলিম সমাজের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রদর্শনী। বিশ্বের নানা প্রান্তে এই ইবাদতকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এমন সব লোকজ রীতি, যা কখনো বিস্ময় জাগায়, কখনো আবার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। কোথাও কোরবানির পশুকে সন্তানস্নেহে নাম দেওয়া হয়, কোথাও আবার মেহেদি পরিয়ে সাজানো হয়...
১ ঘণ্টা আগে
ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুসারে, কোরবানি কোনো পরিবারের ওপর ওয়াজিব হয় না, বরং এটি ব্যক্তির ওপর ওয়াজিব হয়। অর্থাৎ, পরিবারের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক সদস্য (নারী বা পুরুষ), যাঁর কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, তাঁকে আলাদাভাবে কোরবানি দিতে হবে।
১ ঘণ্টা আগে
মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। আনন্দ-উৎসবের পাশাপাশি আত্মত্যাগ, আনুগত্য ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মহিমান্বিত শিক্ষা বহন করে এ দিনটি। এর মূল ভিত্তি হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর সেই অবিস্মরণীয় ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত, যেখানে আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম...
১ ঘণ্টা আগে
একজন মুমিনের জন্য নামাজ হলো আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও জীবনের বরকত লাভের সর্বোত্তম মাধ্যম। প্রতিদিন সময়মতো নামাজ আদায় করা প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ। নিচে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার জন্য আজকের নামাজের সময়সূচি তুলে ধরা হলো।
৭ ঘণ্টা আগে