Ajker Patrika

ভারতকে ‘শান্তি’ দিয়েছি, বিনিময়ে ‘স্বস্তি’ চাই

এম তমিজ উদ্দিন ভুঁইয়া সেলিম
আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৮: ৪৪
ভারতকে ‘শান্তি’ দিয়েছি, বিনিময়ে ‘স্বস্তি’ চাই

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে চার দিনের সরকারি সফর শেষে দেশে ফিরেছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর নানা কারণেই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তবে দিল্লি বিমানবন্দরে ভারতের একজন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রীর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানানোর বিষয়টি নিয়ে আমাদের দেশে কেউ কেউ এমন প্রচারণা চালিয়েছেন যে শেখ হাসিনার প্রতি ভারত অবহেলা দেখিয়েছে। বিমানবন্দরে বিদেশি অতিথিদের স্বাগত জানানোর একটি রাষ্ট্রাচার আছে। ভারতে অতিথিকে স্বাগত জানানোর সাধারণ যে রীতি, তার ব্যতিক্রম কিছু হয়নি। তবে ২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের সময় নিয়ম ভেঙে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়েছিলেন। ওটা ছিল ব্যতিক্রম। ব্যতিক্রম বারবার ঘটে না।

দেখার বিষয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের সময় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সফরকারী দলের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক কোনো আচরণ করেছে কি না। কিংবা আতিথেয়তায় কোনো ঘাটতি বা অবহেলা দেখা গেছে কি না। না, তেমন কিছু হয়নি।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ৬ সেপ্টেম্বর দিল্লির দায়দরাবাদ হাউসে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ১৯৭১ সালের আদর্শ জীবন্ত রেখে মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদী শক্তিকে সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করা জরুরি। এসব শক্তি আমাদের পারস্পরিক বিশ্বাসকে আঘাত করতে চায়।

নরেন্দ্র মোদির এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। এ কথার মধ্যেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে ধারণ করা হয়েছে।

আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারত নৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য নিয়ে অকৃপণভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিল। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলার জন্য, বিশ্বনেতাদের সমর্থন আদায়ের জন্য এ দেশ থেকে ও দেশ ঘুরেছেন। বাংলাদেশ থেকে প্রাণভয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে ভারতের মাটিতে গিয়ে শরণার্থী হয়েছিল প্রায় এক কোটি বাঙালি। যুদ্ধজয় নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে ভারতীয় বাহিনী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে, রক্ত দিয়েছে, জীবন দিয়েছে। বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর স্বল্পতম সময়ে ভারত তার সৈন্য ফিরিয়ে নিয়েছিল। সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি পুনর্গঠনের কাজেও ভারতের উদার সহায়তা অব্যাহত ছিল। আমাদের বিপদের দিনে ভারত প্রকৃত বন্ধুর পরিচয় দিয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব রক্ত দিয়ে লেখা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হলে দেশ আবার পুরোপুরি পাকিস্তানি ধারায় ফিরে যায়। ১৯৮১ সালের ১৭ মে পর্যন্ত এক চরম দুঃসময়ে কাটে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষের। আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসার পর নতুন করে স্বাধীনতার ধারায় দেশকে ফিরিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম নতুন করে শুরু হয়।

শেখ হাসিনার এই নতুন চলার পথে ফুল বিছানো ছিল না; বরং ছিল কণ্টকময়। নানা ষড়যন্ত্র, বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে ২১ বছর পর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগকে ১৯৯৬ সালে আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন। নতুন সময়, নতুন চ্যালেঞ্জ। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরির পরিবর্তে ভারতবিরোধিতার নামে বৈরিতার রাজনীতি করে কার্যত দেশের বৃহত্তর স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনা ক্ষমতায় ফিরে ভারতের সঙ্গে বৈরিতার নীতি পরিহার করে বন্ধুত্বের ধারা প্রসারিত করার উদ্যোগ নেন। পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর, ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকা গঙ্গার পানিচুক্তি, সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি, ছিটমহল বিনিময়সহ অনেকগুলো ইতিবাচক চুক্তি স্বাক্ষর হয়।

শেখ হাসিনা রাজনীতিতে ষড়যন্ত্রের ধারা নির্মূলে উদ্যোগী হন। প্রথম দফায় মেয়াদ শেষে ২০০১ সালে শান্তিপূর্ণভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। কিন্তু বিচারপতি লতিফুর রহমানের সঙ্গে বিএনপি আগেই বিশেষ বন্দোবস্তের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নিজেদের পক্ষে নিতে সক্ষম হয়। লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নিতে না নিতেই সচিব পরিবর্তনসহ এমন কিছু পদক্ষেপ নেয়, যাতে দেশের মানুষের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে যায় যে ওই সরকার আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে।

২০০১ সালে তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে কার্যত বিএনপি-জামায়াতের অনুকূলে একটি ভারসাম্যহীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি-জামায়াত চরম প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার কার্যত বিএনপি-জামায়াতের হাতের পুতুলে পরিণত হয়।

দেশকে হিন্দুশূন্য এবং আওয়ামী লীগশূন্য করার এক সুদূরপ্রসারী অ্যাজেন্ডা নিয়ে আক্রমণ চলে হিন্দুসম্প্রদায়ের বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, উপাসনালয়ে। হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনাকে হত্যার অপচেষ্টাও বিএনপি-জামায়াত চালিয়েছে। লোকদেখানো বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে ঘটনার দায় ভারতের ওপর চাপানোর হাস্যকর অপকৌশলের আশ্রয় নিতেও তারা লজ্জাবোধ করেনি।

বিএনপি সব সময়ই ভারতবিরোধিতাকে তাদের রাজনীতির একটি উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছে। তাদের কৌশল ছিল দ্বিমুখী। প্রকাশ্যে ভারতবিরোধিতা আর ক্ষমতায় থাকার জন্য গোপনে ভারতকে তোয়াজ-তোষামোদ করা। ফলে তারা ক্ষমতায় থাকতে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিল না। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়ে নাশকতামূলক তৎপরতা চালাতে সহযোগিতা করেছে। কিন্তু এসব করে ভারতের ক্ষতি যতটা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি বাংলাদেশেরই হয়েছে। কারণ, ভারত বাংলাদেশকে সন্দেহের চোখে দেখেছে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির স্বার্থেই ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’—এই নীতি নিয়ে অগ্রসর হওয়া উচিত। কিন্তু বিএনপি এই নীতি অনুসরণে ব্যর্থ হয়েছে। 
বাংলাদেশ নামের স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রটি একাত্তরের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের অর্জন।

একাত্তরে আমাদের শত্রু ছিল, মিত্রও ছিল। এই শত্রু ও মিত্র যেমন দেশের ভেতরে ছিল, তেমনি বাইরেও ছিল। বিজয় অর্জনের পর স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা হয়েছিল, স্বাধীন দেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের কোনো জায়গা হবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি যা-ই হোক, কেউ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবিরোধী হবে না। ধর্ম নিয়ে কেউ রাজনীতি করবে না। কিন্তু সেটা বাস্তবে হয়নি; বরং দুঃখজনক এটাই যে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের বিকল্প না হয়ে প্রতিপক্ষ হয়ে উঠল বিএনপি। এই দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবি করলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে পুনর্বাসিত করে রাজনীতির যে সর্বনাশ করেছেন, তা মেরামত করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সরকারে এবং বিরোধী দলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের বাইরে কেউ থাকবে না—এটা অসম্ভব করে তুলেছে বিএনপি। 

১৬ বছর ধরে বিএনপি ক্ষমতার বাইরে আছে। মাঠের রাজনীতিতেও তারা দুর্বল। দলটির নীতি ও কৌশলে কোনো পরিবর্তন না আসায় তাদের রাজনীতি এখন কথামালা ছাড়া আর কিছু নয়। সন্ত্রাস, সহিংসতা এবং অন্ধ আওয়ামী লীগ ও ভারতবিরোধিতার রাজনীতির চর্চার গণ্ডির বাইরে বেরোতে পারছে না। তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানকে অস্বীকার করার জেদ পরিহার করতে পারছে না।

বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় কোনো সমস্যারই সন্তোষজনক সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের মধ্যে অনিষ্পন্ন অনেক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়েছে। এই যে শেখ হাসিনার সরকার ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে, এটাও বিএনপির মনঃকষ্টের কারণ।

২০১৮ সালের ৩০ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘আমরা ভারতকে যা দিয়েছি, তারা তা সারা জীবন মনে রাখবে। প্রতিদিনের বোমাবাজি থেকে আমরা তাদের শান্তি ফিরিয়ে দিয়েছি।’ এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের মধ্য দিয়ে উভয় দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার হওয়ার বাস্তব ভিত্তি তৈরি হয়েছে। তিস্তার পানি না পাওয়া, সীমান্ত হত্যাসহ কিছু বিষয়ে বাংলাদেশের মানুষ ভারতের উদারতা প্রত্যাশা করে। সহযোগিতা একতরফা হওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশের প্রতি সংবেদনশীল মনোভাব দেখিয়েই এ দেশের মানুষের আস্থা ফিরে পেতে হবে। বাংলাদেশ ভারতকে যে শান্তি দিয়েছে, তা মনে রেখে আমাদের তিস্তার পানি দিয়ে স্বস্তি দেবে কি? বল এখন ভারতের কোর্টে। 

লেখক: আওয়ামী লীগ নেতা ও শিল্পপতি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত