Ajker Patrika

ছাইচাপা আগুনে ইরানি নারীদের অধিকারের সংগ্রাম

ফিচার ডেস্ক
ছাইচাপা আগুনে ইরানি নারীদের অধিকারের সংগ্রাম
মাহসা জিনা আমিনি। ছবি: সংগৃহীত

আধুনিক ইতিহাস ও নারী অধিকার আন্দোলনের পাতায় ১৬ সেপ্টেম্বর তারিখটি রক্তক্ষয়ী এক সংগ্রামের প্রতীক হয়ে থাকা কালো দিন। আজ থেকে ঠিক চার বছর আগে, ২০২২ সালের এই দিনে তেহরানের একটি হাসপাতালে মাত্র ২২ বছর বয়সী এক কুর্দি তরুণী শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। সেই তরুণীর নাম মাহসা জিনা আমিনি। ঠিকভাবে হিজাবটা পরা হয়নি, এই অপরাধে ইরানের নৈতিকতা পুলিশ বা গেশ্ত-ই এরশাদের হেফাজতে থাকা অবস্থায় তিনি নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।

মাথার খুলি ফেটে যাওয়া এবং মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের নথিপত্র পরে তা স্পষ্ট করে দেয়। মাহসার রক্ত থেকে জ্বলে উঠেছিল এক দাবানল। তাঁর শেষকৃত্য থেকে শুরু হওয়া সেই ক্ষোভ মুহূর্তে রূপ নিয়েছিল কালজয়ী আন্দোলনে। ইরান লড়েছিল ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’র পক্ষে। সেই আন্দোলনের জন্য পাঁচ শর বেশি মানুষ রাজপথে প্রাণ দেন, হাজার হাজার আন্দোলনকারী চোখ হারান, বন্দী হন, এমনকি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ান।

কিন্তু চার বছর পেরিয়ে এখনো প্রশ্ন জাগে, ‘সম-অধিকারের দেশ’ কি শেষ পর্যন্ত পেয়েছে ইরানের নারীরা?

কী পরিবর্তন এল

এককথায় বলতে গেলে, ইরানি নারীরা তাঁদের কাঙ্ক্ষিত সম-অধিকার আজও পাননি। কিন্তু তাঁদের অবাধ্যতার ধরন রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে। সেই রাষ্ট্রের নিপীড়ন থামেনি, বরং সময়ের সঙ্গে তা আরও নিষ্ঠুর হয়েছে। জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চার বছর পর আজ আবারও ইরানের রাজপথে নেমেছে মোরালিটি পুলিশ। নারীদের অবাধ্যতা দমাতে তারা আধুনিক এআই নজরদারি, ফেশিয়াল রেকগনিশন, যানবাহন বাজেয়াপ্তকরণ এবং ক্যাফে-রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেওয়ার মতো কৌশল নিয়েছে। সম্প্রতি ‘হিজাব ও পরিচ্ছন্নতা আইন’ কিছুটা থমকে গেলেও, অনাবৃত মস্তকে ঘরের বাইরে বের হওয়া নারীদের গ্রেপ্তার ও নিপীড়ন বন্ধ হয়নি। তবে চার বছরে শাসনব্যবস্থা যেমন নৃশংস হয়েছে, সমাজের রূপও তেমনি বদলে গেছে।

জেগে ওঠা নতুন আন্দোলন

চার বছরে মাহসা আমিনি একজন ব্যক্তি থেকে বৈপ্লবিক দর্শনে পরিণত হয়েছেন। ২০২৫ সালের শেষ ভাগ ও ২০২৬ সালের শুরুতেও ইরানের চরম অর্থনৈতিক সংকট এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসে। এই সময়ও সেখানে মূল সুর ছিল মাহসার আন্দোলন থেকে পাওয়া সেই একই চেতনা। শাসনব্যবস্থার নির্দয় মেশিনগান আর নির্বিচার মৃত্যুদণ্ডের মুখে দাঁড়িয়েও সমাজের সর্বস্তরের মানুষ সেখানে কথা বলেছেন এক জোট হয়ে। রাজপথে ছিলেন শ্রমিক, নার্স, অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী ও শিক্ষক। ১০টি শক্তিশালী নাগরিক ও সামাজিক সংগঠন চার বছর পূর্তির ঠিক আগে যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ‘ভয়ের দেয়াল ভেঙে গেছে, আর পেছনে ফেরার পথ নেই।’

সম-অধিকারের দেশ কি তৈরি হলো

আইনগত বা রাষ্ট্রীয় দিক থেকে উত্তর অবশ্যই ‘না’। ইরানের ইসলামিক রিপাবলিক আজ মৃত্যুদণ্ডকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার বা অস্ত্রের মতো ব্যবহার করছে। নারী অধিকার ও রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িত থাকার দায়ে আজও একের পর এক নারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে বা ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে ফাঁসির মঞ্চে। কিন্তু সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে নারীরা বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছেন। চার বছর আগের বাধ্যবাধকতাকে নারীরা নীরবে মেনে নিতেন। কিন্তু আজ তেহরানের রাজপথে শত শত তরুণী প্রকাশ্যেই চুল খুলে হেঁটে বেড়ান। রাষ্ট্র তাঁদের গ্রেপ্তার করছে, কিন্তু তাঁদের ভেতরের অবাধ্যতাকে গৃহবন্দী করতে পারছে না। ইরানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পুরুষেরা শুধু দর্শক না থেকে নারীদের এই সম-অধিকারের আন্দোলনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করছে।

ছাইচাপা আগুনের ভবিষ্যৎ

জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক মাই সাতো বলেছেন, ‘চার বছর পরও মাহসার মৃত্যু থেকে জন্ম নেওয়া প্রতিরোধ শিখা নিভে যায়নি। অধিকার কেড়ে নিয়ে চিরকাল দমিয়ে রাখা যায় না।’ চার বছর আগে যে মাহসা আমিনির নাম এক বিষাদময় সুর হিসেবে ধ্বনিত হয়েছিল; ২০২৬ সালে এসে তা এক অধিকার আদায়ের অবিনাশী শক্তি হয়ে উঠেছে। সম-অধিকারের দেশ হয়তো এখনো দূরবর্তী এক স্বপ্ন, তবে সেই স্বপ্নের দিকে যাওয়ার পথটি এখন ইরানি নারীদের পদভারে উত্তাল।

সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল, ইরান ওয়ার, সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ইন ইরান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত