
তুষার চিতা (স্নো লেপার্ড), বিশ্বের অন্যতম বিরল প্রাণী। যাকে আবার ‘পাহাড়ের ভূত’ও বলা হয়। এশিয়ার অন্যতম রহস্যময় এই শিকারি প্রাণীটির দেখা মেলে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মাত্র ১২টি দেশে। আর এর মধ্যে ভারত একটি এবং ভারতেই সবচেয়ে বেশি তুষার চিতা রয়েছে।
২০২৩ সালে ভারতের প্রথম পূর্ণাঙ্গ জাতীয় জরিপে দেখা যায়, দেশটিতে ৭০০-এর বেশি তুষার চিতা রয়েছে। দেশটির শীতল-দুর্গম অঞ্চলে এদের দেখা যায় তাও আবার কদাচিৎ এরা মানুষের সামনে আসে। এই ক্ষিপ্র গতির শিকারিকে বিলুপ্ত হতে না দেওয়ার গুরু দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন ভারতের হিমাচল প্রদেশের একদল নারী।
বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে হিমাচল প্রদেশের স্পিতি উপত্যকার কিব্বার গ্রামের ওই সাহসী নারীদের কথা, যারা তুষার চিতার জন্য লড়াই করছে।
কিব্বার গ্রামটির আশপাশের রুক্ষ ও উচ্চ-উচ্চতার শীতল মরুভূমি তুষার চিতাদের বিচরণক্ষেত্র। পাথুরে ঢালে এরা এতই নিঃশব্দে চলাফেরা করে যে হিমালয়বেষ্টিত এই অঞ্চলে তুষারচিতা ‘পাহাড়ের ভূত’ হিসেবে পরিচিত।
তবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই প্রাণীগুলোকে গবাদি পশুর জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হতো। তবে কিব্বার ও আশপাশের গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। তাঁরা এখন বুঝতে শিখেছে, খাদ্যশৃঙ্খলে শীর্ষ শিকারি হিসেবে পরিচিত তুষার চিতা এই অঞ্চলের ভঙ্গুর পাহাড়ি প্রতিবেশ ব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে প্রায় এক ডজন স্থানীয় নারী হিমাচল প্রদেশ বন বিভাগ ও সংরক্ষণবিদদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তুষার চিতার গতিবিধি অনুসরণ ও সুরক্ষায় কাজ করছেন। সংরক্ষণ কার্যক্রমে তাঁদের ভূমিকা দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
স্থানীয়দের কাছে তুষার চিতা ‘শেন’ নামে পরিচিত। সেই নাম থেকেই নারীরা নিজেদের দলের নাম রেখেছেন ‘শেনমো’। ক্যামেরা ট্র্যাপ বসানো ও পর্যবেক্ষণের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই নারীরা এখন এমন সব ডিভাইস পরিচালনা করছেন যেগুলোতে বসানো থাকে বিশেষ আইডি এবং মেমোরি কার্ড। এই ক্যামেরাগুলোর সামনে দিয়ে কোনো তুষারচিতা পার হওয়ার সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটির ছবি তুলে রাখে।
অলাভজনক সংস্থা নেচার কনজারভেশন ফাউন্ডেশন (এনসিএফ) এবং বন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই ক্ষুদ্র দলের স্থানীয় সমন্বয়ক লোবজাং ইয়াংচেন বলেন, ‘আগে পুরুষরাই ক্যামেরা বসাতে যেত। আমরা ভাবতাম, আমরা কেন পারব না?’

২০২৪ সালের হিমাচল প্রদেশের তুষার চিতা জরিপে তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করেছিলেন এই নারীরা। জরিপে দেখা গেছে, রাজ্যটিতে তুষার চিতার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩, যা ২০২১ সালে ছিল ৫১।
এই জরিপে প্রায় ২৬ হাজার বর্গকিলোমিটার (১০ হাজার বর্গমাইল) এলাকায় বসানো ক্যামেরা ট্র্যাপের মাধ্যমে তুষার চিতাসহ আরও ৪৩টি প্রজাতির উপস্থিতি নথিভুক্ত করা হয়েছে। চিতাবাঘজাতীয় প্রাণীর ক্ষেত্রে প্রচলিত পদ্ধতি অনুযায়ী, গায়ের পশমে থাকা স্বতন্ত্র ‘রোজেট’ বা নকশা দেখে প্রতিটি প্রাণীকে আলাদাভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। এই তথ্যগুলো এখন বৃহত্তর সংরক্ষণ ও আবাসস্থল ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
নারী সদস্যদের প্রসঙ্গে স্পিতি বন্যপ্রাণী বিভাগের ডেপুটি কনজারভেটর অব ফরেস্ট গোল্ডি ছাবরা বলেন, ‘প্রতিটি প্রাণীকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই তথ্য সংগ্রহের কাজ অত্যন্ত শ্রমসাধ্য। এর বেশিরভাগই করা হয় শীতকালে। এ সময় ভারী তুষারপাতের কারণে তুষারচিতা এবং তাদের শিকার অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকায় নেমে আসে, যার ফলে তাদের গতিবিধি শনাক্ত করা সহজ হয়।

জরিপের দিনগুলোতে নারীরা খুব ভোরে ওঠেন, গৃহস্থালির কাজ সেরে বেস ক্যাম্পে জড়ো হন। এরপর যে পর্যন্ত গাড়ি চলে সে পর্যন্ত যানবাহনে গিয়ে বাকি পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দেন। অনেক ক্ষেত্রেই উচ্চতা থাকে ১৪ হাজার ফুটেরও (৪ হাজার ৩০০ মিটার) বেশি, যেখানে হালকা বাতাসে সামান্য নড়াচড়াও হয়ে ওঠে ক্লান্তিকর।
গত ডিসেম্বরে এমন এক অভিযানে দলটির সঙ্গে ছিল বিবিসি। হাড়কাঁপানো শীতে কয়েক ঘণ্টা হাঁটার পর এক সংকীর্ণ পথে এসে নারীরা হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন।
লোবজাং ইয়াংচেন ধুলোর ওপর থাবার ছাপ (পাগমার্ক) দেখিয়ে বললেন, ‘তুষারচিতা সম্প্রতি এখানে এসেছিল। দাগগুলো একদম টাটকা।’
পাগমার্কের কাছাকাছি এলাকায় দলটি আঁচড় ও গন্ধ দিয়ে এলাকা চিহ্নিত করতে থাকে। এরপর সতর্কতার সঙ্গে ট্রেইলের ধারে একটা পাথরে ক্যামেরা স্থাপন করেন।
এরপর একজন নারী ‘ওয়াক টেস্ট’ করেন, পথ ধরে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখেন ক্যামেরার উচ্চতা ও কোণ ঠিকঠাকভাবে সেট করা হয়েছে কি না, যাতে স্পষ্ট ছবি পাওয়া যায়।
এরপর দলটি পুরনো সাইটগুলোতে গিয়ে কয়েক সপ্তাহ আগে বসানো মেমোরি কার্ড সংগ্রহ করে এবং ব্যাটারি বদলে দেয়।

দুপুর গড়াতেই তাঁরা ক্যাম্পে ফিরে বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করে ছবি সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের কাজ শুরু করেন। এসব প্রযুক্তির সঙ্গে অনেকেরই আগে কোনো পরিচয় ছিল না।
দলটির সদস্য চেরিং লানজোম বলেন, ‘আমি মাত্র পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। শুরুতে কম্পিউটার ধরতেও ভয় লাগত। আস্তে আস্তে কিবোর্ড আর মাউস চালানোও।’
২০২৩ সালে ক্যামেরা-ট্র্যাপিং প্রোগ্রামে যোগ দেন এই নারীরা। শুরুতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ তাদের মূল কাজ ছিল না। স্পিতি উপত্যকায় শীতকাল দীর্ঘ হয়, কোনো কৃষিকাজও থাকে না। লোবজাং বলেন, ‘শুরুতে তুষার চিতার এই কাজ আমাদের আগ্রহের বিষয় ছিল না। কৌতূহল থেকে এসেছিলাম, আর সামান্য আয়ও হতো।’
এই কাজের বিনিময়ে তাঁরা প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৭০০ রুপি আয় করেন। তবে শুধু উপার্জনই নয়, এই কাজ তুষারচিতার প্রতি পুরো সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে সাহায্য করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ডলমা জাংমো বলেন, ‘আগে আমরা ভাবতাম তুষার চিতা আমাদের শত্রু। এখন মনে করি, এদের সংরক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
জরিপের পাশাপাশি এই নারীরা গ্রামবাসীদের গবাদিপশুর জন্য সরকারি বীমা সুবিধা পেতে সহায়তা করেন। ‘প্রিডেটর-প্রুফ কোরাল’ বা শিকারি-প্রতিরোধী খোয়াড় তৈরিতে উৎসাহ দেন, যেগুলো পাথর বা জাল দিয়ে তৈরি হয় যাতে রাতে পশুগুলো নিরাপদ থাকে।

এমন এক সময়ে তাদের এই প্রচেষ্টা চলছে যখন এই অঞ্চলটি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাচ্ছে। স্পিতি উপত্যকাকে সম্প্রতি ‘কোল্ড ডেজার্ট বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ’-এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা স্থানীয় জীবিকা সহায়তার পাশাপাশি ভঙ্গুর বাস্তুসংস্থান রক্ষার একটি ইউনেস্কো-স্বীকৃত নেটওয়ার্ক।
জলবায়ু পরিবর্তন যখন হিমালয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে বদলে দিচ্ছে, তখন সংরক্ষণবিদেরা বলছেন, তুষার চিতার মতো প্রজাতি রক্ষায় স্থানীয়দের অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
এনসিএফ-এর ‘হাই অল্টিটিউড’ কর্মসূচির প্রোগ্রাম ম্যানেজার দীপশিখা শর্মা বলেন, ‘যখন এসব কাজে স্থানীয়রা যুক্ত হন, তখন সংরক্ষণ প্রক্রিয়া আরও টেকসই হয়ে ওঠে। এই নারীরা কেবল সহায়তা করছেন না, তারা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণে দক্ষ হয়ে উঠছেন।’
নারীদের ভাষায়, এই কাজ তাদের নিজেদের বাড়ি, গ্রাম এবং যে পাহাড়ে তারা বড় হয়েছেন তার সঙ্গে এক গভীর বন্ধন তৈরি করেছে।
লোবজাং বলেন, ‘আমরা এখানে জন্মেছি, এটাই আমাদের সবকিছু। কখনো কখনো ভয়ও লাগে, কারণ তুষারচিতা তো শেষ পর্যন্ত শিকারি প্রাণীই। তবু এটাই আমাদের জায়গা, আমাদের ঠিকানা এখানেই।’

শিশুশ্রম বন্ধ ও গৃহকর্মী সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে নারী ও শিশুদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন জাতীয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ফোরাম (জেএনএনপিএফ) এবং চাইল্ড লেবার এলিমিনেশন প্ল্যাটফর্ম (স্লেপ)। আজ সোমবার পৃথক দুটি বিবৃতিতে এ দাবি জানায় তারা।
৬ ঘণ্টা আগে
সমতলের চা-বাগান আর কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার জন্য বেশ খ্যাতি লাভ করেছে দেশের একেবারে উত্তরের জনপদ তেঁতুলিয়া। হিমালয়ের খুব কাছের এই এলাকায় বছরের বেশির ভাগ সময় থাকে তীব্র শীত, ঝড়-বৃষ্টি আর প্রতিকূল আবহাওয়া। আধুনিক চিকিৎসা-সুবিধা এখানকার মানুষের কাছে এখনো অনেকটা স্বপ্নের মতো।
১৩ দিন আগে
বয়স কেবল একটি সংখ্যা মাত্র, প্রবাদটি যেন চীনের ওয়েনজু শহরের ১০১ বছর বয়সী জিয়াং ইউয়েচিনের জীবনে অক্ষরে অক্ষরে সত্য। সাত সন্তানের জননী জিয়াংয়ের জীবনযাপন আধুনিক স্বাস্থ্যবিধির প্রচলিত নিয়মগুলোকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এক ভিন্ন রকম আনন্দের বার্তা দেয়।
১৩ দিন আগে
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের মণ্ডপে এবারও পৌরোহিত্য করেছেন সমাদৃতা ভৌমিক। তৃতীয়বারের মতো এই অভিজ্ঞতা নিয়ে আনন্দিত তিনি। তবে বরাবরের মতোই আলোচনা ও সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন। অনেকেই প্রশ্ন করেছেন তাঁর পোশাক নিয়ে।
১৩ দিন আগে