Ajker Patrika

রয়টার্সের প্রতিবেদন /বাংলাদেশেই বিশ্বের প্রথম নির্বাচন, যেখানে ফলাফল নির্ধারণ করবে জেন-জি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১: ১৭
বাংলাদেশেই বিশ্বের প্রথম নির্বাচন, যেখানে ফলাফল নির্ধারণ করবে জেন-জি
ফাইল ছবি

গণ-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে বহু বছর ধরেই বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে রাজপথে বিরোধী দলগুলোর প্রায় কোনো উপস্থিতি ছিল না। তারা কখনো নির্বাচন বর্জন করেছে, আবার কখনো শীর্ষ নেতাদের গণগ্রেপ্তারের মাধ্যমে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি উল্টো। আগামী বৃহস্পতিবারের ভোটের আগে দৃশ্যপট পুরো বদলে গেছে।

গণ-আন্দোলনের সময় সহিংস দমনপীড়নের দায়ে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁর সরকার পতনে যাঁরা ভূমিকা রেখেছিলেন, সেই তরুণদের অনেকেই বলছেন, আসন্ন এই নির্বাচনই ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশের প্রথম সত্যিকারের প্রতিযোগিতামূলক জাতীয় নির্বাচন। ওই বছর থেকেই শেখ হাসিনা টানা ১৫ বছরের শাসন শুরু করেছিলেন।

এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি জয়ের সবচেয়ে বড় দাবিদার বলে মনে করা হচ্ছে। তবে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন একটি ইসলামপন্থী জোটও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছে। ৩০ বছরের নিচে জেন-জি তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি নতুন দলও আছে, যারা রাজপথে শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকলেও শক্ত নির্বাচনী ভিত্তি গড়তে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধেছে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান রয়টার্সকে বলেছেন, তাঁর দল সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টিতে প্রার্থী দিয়েছে এবং সরকার গঠনের মতো পর্যাপ্ত আসন পাবেন বলে তাঁরা আত্মবিশ্বাসী।

বিশ্লেষকদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে যদি পরিষ্কার ও নির্ধারক ফলাফল আসে, তাহলে তা সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের দেশে স্থিতিশীলতা ফেরাতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে। শেখ হাসিনার পতনের পর কয়েক মাস ধরে অস্থিরতা চলেছে। এতে তৈরি পোশাক খাতসহ বড় বড় শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই খাতেই বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ। এই নির্বাচনের ফলাফল দক্ষিণ এশিয়ার দেশটিতে চীন ও ভারতের ভূমিকার ওপর বড় প্রভাব ফেলবে।

ঢাকার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, জনমত জরিপে বিএনপি এগিয়ে আছে বলে মনে হচ্ছে। তবে মনে রাখতে হবে, এখনো উল্লেখযোগ্য ভোটার সিদ্ধান্তহীন। ফলাফলে অনেক বিষয় প্রভাব ফেলবে। এর মধ্যে জেনারেশন জেড বা জেন-জি ভোটারদের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশই এই তরুণ প্রজন্ম।

সারা দেশে এখন দেখা যাচ্ছে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ এবং জামায়াতের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকসংবলিত সাদা-কালো পোস্টার ও ব্যানার। সেগুলো খুঁটি ও গাছে ঝুলছে। রাস্তার পাশের দেয়ালে সাঁটা আছে। অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থীর পোস্টারও রয়েছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দলীয় অস্থায়ী কার্যালয় থেকে প্রচারের গান বাজছে।

আগের নির্বাচনগুলোর সঙ্গে এটি বড় ধরনের পার্থক্য। তখন চারদিকে প্রায় শুধু আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীকই দেখা যেত। জনমত জরিপগুলো বলছে, একসময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াত এবারের নির্বাচনে তাদের ইতিহাসের সেরা ফল করতে পারে, এমনকি সরকার গঠন না করলেও। দলটি ১৯৭১ সালে ভারতের সহায়তায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল।

চীন ও ভারতের প্রভাব নিয়েও এই নির্বাচনের ফল গুরুত্বপূর্ণ হবে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, শেখ হাসিনাকে ভারতপন্থী হিসেবে দেখা হতো। ক্ষমতা হারানোর পর তিনি ভারতে আশ্রয় নেন এবং এখনো সেখানেই আছেন। এই কারণে বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব কমছে। অন্যদিকে চীনের প্রভাব বাড়ছে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, বিএনপি জামায়াতের তুলনায় ভারতের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি সমন্বয়মূলক অবস্থানে থাকতে পারে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার হলে তারা পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকতে পারে। পাকিস্তানও একটি মুসলিমপ্রধান দেশ এবং ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। জামায়াতের জেন-জি মিত্র দলটি বলেছে, বাংলাদেশের ওপর ‘নয়াদিল্লির আধিপত্য’ তাদের বড় উদ্বেগের জায়গা। তাদের নেতারা সম্প্রতি চীনা কূটনীতিকদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। তবে জামায়াত বলছে, তারা কোনো নির্দিষ্ট দেশের দিকে ঝুঁকতে চায় না। দলটির দাবি, তারা ইসলামি নীতির আলোকে সমাজ পরিচালনা করতে চায়।

বিএনপির তারেক রহমান বলেছেন, তাঁর দল সরকার গঠন করলে যেসব দেশ বাংলাদেশের জনগণ ও দেশের জন্য উপযোগী প্রস্তাব দেবে, তাদের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা হবে। বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। এখানে চরম দারিদ্র্যের হার এখনো বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ায় দেশটি বড় অঙ্কের বিদেশি অর্থায়ন খুঁজতে বাধ্য হয়েছে। ২০২২ সাল থেকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে বিলিয়ন ডলার ঋণ নিতে হয়েছে।

ঢাকাভিত্তিক গবেষণা সংস্থা কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজের এক জরিপে দেখা গেছে, ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ দুর্নীতি। এর পরেই রয়েছে মূল্যস্ফীতি। বিশ্লেষকেরা বলছেন, জামায়াতের প্রতি ভোটারদের আগ্রহের বড় কারণ তাদের ‘পরিচ্ছন্ন’ ভাবমূর্তি। ইসলামী আদর্শের চেয়ে এই ভাবমূর্তিই বেশি প্রভাব ফেলছে।

জরিপে বলা হয়েছে, ভোটাররা বিপুলভাবে ভোট দিতে আগ্রহী। তারা ধর্মীয় বা প্রতীকী বিষয় নয়, বরং দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সমস্যাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁরা এমন নেতৃত্ব চান, যারা দায়িত্বশীল, দক্ষ এবং জনগণের প্রতি যত্নশীল।

তবু সব মিলিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানকেই পরবর্তী সরকারপ্রধান হিসেবে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা ব্যক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে যদি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে যায়, তাহলে তাদের আমির শফিকুর রহমানও দেশের শীর্ষ দায়িত্বে আসতে পারেন। ২১ বছর বয়সী মোহাম্মদ রাকিব এবার প্রথমবার ভোট দেবেন। তিনি বলেন, তিনি আশা করেন, আগামী দিনের সরকার জনগণকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেবে এবং স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করবে।

রাকিব বলেন, সবাই শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। জাতীয় নির্বাচনে মানুষ ভোটই দিতে পারেনি। মানুষের কোনো কণ্ঠস্বর ছিল না। তিনি বলেন, যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তিনি চান তারা এই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করুক।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

স্কুলছাত্রকে হত্যা: ফেনীতে ছাত্রদল কর্মীসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড

প্রয়োজনে ইরান থেকে নিজেদের বিজ্ঞানীদের সরিয়ে নিতে প্রস্তুত রাশিয়া

গণভোটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট চাওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ: ইসি

সাত আসনে দাঁড়িপাল্লা বনাম জোটের প্রার্থী, বেকায়দায় জামায়াত

নান্দাইলে ট্রাকের ধাক্কায় কলেজছাত্র নিহত

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত