Ajker Patrika

নারীর অংশগ্রহণে সর্বজনীন হয়েছিল নির্বাচন

রজত কান্তি রায়, ঢাকা  
নারীর অংশগ্রহণে সর্বজনীন হয়েছিল নির্বাচন

আগামীকাল দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এতে বেশ উৎসবমুখর পরিবেশ থাকলেও একটি জায়গায় খানিক অস্বস্তি রয়ে গেছে। তা হলো, এবারের নির্বাচনে দেশে নারী প্রার্থীর সংখ্যা বেশ কম। এই নির্বাচনে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল নারীদের মনোনয়ন দেয়নি। কিন্তু পৃথিবীর নির্বাচনের ইতিহাস বলছে, নির্বাচন সর্বজনীন হয়েছিল নারীদের অংশগ্রহণে, প্রায় ১৩৩ বছর আগে, ১৮৯৩ সালের ২৮ নভেম্বর। যে দেশে এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি ঘটেছিল, তার নাম নিউজিল্যান্ড।

এটিও বেশ আশ্চর্য বটে, ইউরোপের দেশগুলোতে নারী স্বাধীনতা, নারীমুক্তি, মানবাধিকারের কথা বলা হলেও নারীদের ভোটাধিকার ছিল না। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে জার্মানির নারীরা ভোটাধিকার পান ১৯১৮ সালে—এটিই ইউরোপে প্রথম। অথচ তারও ২৫ বছর আগে নিউজিল্যান্ডের নারীরা তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে ফেলেছেন।

আরেকটি বিষয় এখানে বলে রাখা ভালো, প্রকৃতপক্ষে নারীদের তো নয়ই, পুরুষদেরও ভোটাধিকার ছিল সীমিত। খ্রিষ্টপূর্ব সময়ে প্রাচীন এথেন্সের ইতিহাস কিংবা প্রাচীন রোমেও শুধু জমিদার, সম্পত্তিসম্পন্ন পুরুষ নাগরিকেরাই ভোট দিতেন। দাস, শ্রমিক কিংবা দরিদ্র পুরুষদের ভোট দেওয়ার অধিকার ছিল না। অত প্রাচীন গল্পে না গিয়েও বলা যায়, উনিশ শতকে যুক্তরাজ্যের যেসব পুরুষ ১০ পাউন্ড স্টারলিংক জমির কর দেওয়ার ক্ষমতা রাখতেন, শুধু তাঁরাই ভোট দেওয়ার অধিকার পেতেন। আর ব্রিটিশ ভারতে শিক্ষিত ও ভূ-সম্পত্তিসম্পন্ন পুরুষদের ছিল সেই অধিকার।

উনিশ শতকের ইউরোপ ও আমেরিকায় সর্বজনীন পুরুষ ভোটাধিকার বা ইউনিভার্সাল ম্যানহুড সাফরেজ পুরোপুরি চালু হয় ১৯১৪ সালের পর। তার আগে সব দেশে কিন্তু সব পুরুষের ভোট দেওয়ার অধিকার ছিল না। সেই সব এখন থাক। আমরা আসি নারীদের ভোটের প্রসঙ্গে।

NN
NN

আগেই বলার চেষ্টা করা হয়েছে যে নিউজিল্যান্ডের নারীরা বিশ্বে প্রথম এমন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। সেটিকেই নারী ও পুরুষ উভয়ের সমান অংশগ্রহণে প্রথম আধুনিক নির্বাচন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু ঘটনাটি যত সহজে বলা গেল, তত সহজে তা ঘটেনি। নারীদের সেই অধিকার লাভ করার পেছনে ছিল দীর্ঘ সংগ্রাম। আবার একই সঙ্গে যুক্ত ছিল ভূমিসংক্রান্ত উত্তরাধিকারের প্রশ্ন।

১৮৬৯ সাল থেকে নিউজিল্যান্ডের নারীসমাজ ধীরে ধীরে তাদের অধিকারের বিষয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাঁরা বিভিন্নভাবে নিজেদের অধিকারের প্রশ্ন তোলেন এবং কর্তৃপক্ষের কাছে ‘পিটিশন’ জমা দিতে থাকেন। ১৮৯১ সালে প্রায় ২০ হাজার নারীর স্বাক্ষরযুক্ত একটি পিটিশন নিউজিল্যান্ডের সংসদে পৌঁছায়। প্রধানমন্ত্রী জন ব্যাল্ফোরের নেতৃত্বাধীন লিবারেল পার্টি নারীদের এই দাবিকে সমর্থন করে। ফলে সংসদে সেটি পাস হয়ে যায় এবং ২১ বছর বয়সী প্রত্যেক নারী ও পুরুষ ভোট দেওয়ার যোগ্য হয়ে ওঠেন। তবে এখানে একটি ফুটনোট দেওয়া দরকার, নিউজিল্যান্ডের মাওরি নারীরা ১৮৯৩ সাল থেকে ভোটাধিকার পেলেও সে দেশের পলিনেশিয়ান নারীরা ১৯৬০-এর দশকে সেই অধিকার পান।

১৮৯৩ সালের ২৮ নভেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে, একই বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর নিউজিল্যান্ডের সে সময়ের গভর্নর জেনারেল লর্ড গ্লাসগো নারীদের ভোটাধিকার আইন কিংবা ইলেকটোরাল বিল অনুমোদন করেন। আইনটি বিশ্বব্যাপী নারী অধিকার আন্দোলনের এক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। এরপরই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং সেই নির্বাচনে প্রায় ৮৭ শতাংশ নারী তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। সেটি ছিল এক অভূতপূর্ব ঘটনা। তা শুধু নির্বাচনই ছিল না, ছিল লৈঙ্গিক সমতার প্রতীক। এরই ফলে ১৯১৯ সালে এলিজাবেথ ম্যাকওম্ব নিউজিল্যান্ডের প্রথম নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ ঘটনা পরবর্তী সময়ে ইউরোপ, আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার নারীদের ভোটাধিকার আন্দোলন ত্বরান্বিত করে।

কাজী নজরুল বলেছেন, পৃথিবীর যা কিছু সুন্দর, তার অর্ধেক নারী আর অর্ধেক পুরুষের অবদান। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের সেই নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল ‘অর্ধেকের বেশি কিছু’। সেই নির্বাচনের পরই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নারীদের ভোটাধিকারের আন্দোলন জোরদার হয় এবং তাঁরা নিজেদের অধিকার বুঝে পেতে শুরু করেন।

নিউজিল্যান্ডে একটি সর্বজনীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পরও বিশ্বজুড়ে নারীদের ভোটাধিকারের আন্দোলন সফল হতে চলে গেছে বিশ শতকের অর্ধেক সময়।

সে যাক, আমাদের এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা কম হলেও নারীদের অংশগ্রহণে নানা বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে। এই বৈচিত্র্যময় অংশগ্রহণই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। এর জন্যই পৃথিবীতে যুগে যুগে ঘটেছে অনেক আন্দোলন আর রক্তক্ষয়ের ঘটনা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

‘ক্রিকেট ডিপ্লোমেসিতে বাংলাদেশ গোল্ড মেডেল পেয়েছে’

নির্বাচনে টংয়ের দোকানে বসাসহ যেসব কাজ করতে পারবে না পুলিশ

নভোএয়ারে কক্সবাজার ভ্রমণ প্যাকেজ, পরিশোধ করা যাবে কিস্তিতে

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ

পদ হারানোর পথে স্টারমার, প্রথম মুসলিম প্রধানমন্ত্রী পেতে পারে যুক্তরাজ্য

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত