নদীর ঠান্ডা পানিতে নেমে পাথর তোলেন বাবা। রোদ-বৃষ্টি-শীতে সেই পাথরই সংসারের ভরসা। সেই সংসারের মেয়েটি একসময় গ্রামের রাস্তায় হাঁটলে কটুকথা শুনত, অপমান লুকিয়ে চলত মাথা নিচু করে। আনন্দ-উৎসবে মা-বাবার হাত ধরে যাওয়াও ছিল নিষিদ্ধ—সমাজের চোখ আর কথার ভয়ে। আজ সেই মেয়েটি বিমানে চড়ে বিদেশে যায়—বুকের ভেতর লাল-সবুজের স্বপ্ন নিয়ে দেশের হয়ে লড়তে।
বলছি বাংলাদেশ নারী জাতীয় ভলিবল দলের খেলোয়াড় তাকফিয়া আক্তারের কথা।
দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়ে তাকফিয়া। বাবা জনাব আলী নদীতে পাথর তুলে কোনোমতে সংসার চালান।
মা সুলতানা বেগম নীরবে আগলে রাখেন চার মেয়েকে। তাকফিয়া চার বোনের মধ্যে তৃতীয়। অভাব ছিল তাঁদের প্রতিদিনের সঙ্গী, কিন্তু স্বপ্ন ছিল আকাশসমান।
তাকফিয়ার শৈশব কেটেছে সামাজিক কটাক্ষ আর মানসিক যন্ত্রণায়। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে অনেকে আমাকে বাজে মন্তব্য বলত। রাস্তায় চলাফেরা করলে মানুষ কটু মন্তব্য করত। এসব কারণে মা-বাবার সঙ্গে কোনো আনন্দ অনুষ্ঠানেও যেতে পারতাম না।’ একজন কিশোরীর জন্য এমন বাস্তবতা সহজ নয়। কিন্তু এই অপমান তাঁকে থামাতে পারেনি; বরং শক্ত করে তুলেছে।
তাকফিয়ার পড়াশোনার শুরু লোহাকাচি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ছোটবেলা থেকে খেলাধুলার প্রতি ছিল অদম্য আগ্রহ। হাইজাম্প, লংজাম্প আর ফুটবলে পারদর্শী ছিলেন তিনি। মাঠেই খুঁজে পেতেন নিজের মুক্তি। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁর প্রতিভা চোখে পড়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম ও সহকারী শিক্ষক হুমায়ূন কবিরের। তাঁদের হাত ধরে একসময় শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টে সুযোগ পান তাকফিয়া। সেখানে দুর্দান্ত পারফর্ম করে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতে নেন তিনি। এ সাফল্যই বদলে দেয় তাঁর জীবনের পথ। ভিপি দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হারুনুর রশিদ তাঁর খেলা দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকফিয়াকে নিজের স্কুলে ভর্তি করেন।
২০২২ সাল থেকে ভলিবল খেলা শুরু করেন তাকফিয়া। শিক্ষক আব্দুর রহমান ও মোছা. রুনা লায়লার নিবিড় তত্ত্বাবধানে তার ভলিবলে হাতেখড়ি। তাঁদের অনুপ্রেরণা আর প্রশিক্ষণে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ নারী জাতীয় ভলিবল দলে জায়গা করে নেন তিনি। জাতীয় দলের হয়ে নেপালে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন তাকফিয়া। এরপর দেশের ভেতরে একাধিক টুর্নামেন্টে নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন। ২০২৫ সালে টানা পাঁচ মাস জাতীয় ভলিবল ক্যাম্পে অনুশীলনের পর মালদ্বীপের মালে কাভা উইমেন্স ভলিবল কাপে অংশ নিয়ে ব্রোঞ্জ পদক জিতে দেশে ফেরেন তিনি।
জাতীয় দলের খেলোয়াড় হলেও তাকফিয়ার বাস্তবতা খুব একটা বদলায়নি। বর্তমানে তিনি তেঁতুলিয়া উপজেলার মাঝিপাড়া মহিলা ডিগ্রি কলেজে মানবিক বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। উচ্চমাধ্যমিকে ওঠার পর খেলাধুলার সুযোগ আগের মতো নেই বলে আক্ষেপ তাঁর। ১৬ থেকে ১৭ জন খেলোয়াড় থাকলেও অনুশীলনের জন্য রয়েছে মাত্র দুটি বল ও একটি নেট। পর্যাপ্ত সরঞ্জামের অভাবে নিয়মিত অনুশীলনে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও থেমে নেই তাকফিয়া। এ বছরের এপ্রিল মাসে এভিসি ওমেনস ভলিবল চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলতে জাপান যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
নদীতে পাথর তোলা বাবার ঘরে জন্ম নেওয়া যে মেয়েটি একসময় সমাজের কটাক্ষে উৎসবে যেতে পারতেন না, আজ সেই মেয়ে দেশের হয়ে লড়ছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। তাকফিয়া আক্তারের গল্প শুধু একজন খেলোয়াড়ের নয়—সহনশীলতা, সংগ্রাম আর স্বপ্নকে জয় করা এক লড়াকু মানুষেরও।

দারিদ্র্য, লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা বাল্যবিবাহের আশঙ্কা কাটিয়ে, অভাব-অনটন আর সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতা পায়ে দলে একদল কিশোরী ছুটছে ফুটবল মাঠে! তাদের মধ্যে কারও গায়ে উঠেছে জাতীয় দলের জার্সি, কেউ খেলছে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে। কেউ আবার ফুটবল ও অ্যাথলেটিকস—দুই ক্ষেত্রে ভালো করার...
৪ দিন আগে
আমি একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করি। স্বামী বর্তমানে দেশের বাইরে আছেন। ঢাকায় আমি দুই সন্তান নিয়ে থাকি। সব দিক সামলে আসলে আমার সন্তানদের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে পারছি না। তাদের একজনের বয়স ৭ আর একজনের ৫ বছর। তাদের মধ্যে মাকে নিয়ে একধরনের প্রতিযোগিতা কাজ করে।
৪ দিন আগে
সংসার, সন্তান আর ঘরের নানা দায়িত্বের মধ্যেও নিজের একটি পরিচয় তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন সালমা সুলতানা। হাতে থাকা কিছু টাকা কীভাবে ভবিষ্যতের জন্য কাজে লাগানো যায়—এমন ভাবনা থেকেই শুরু। ইউটিউবে বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজ করতে গিয়ে একসময় জানতে পারেন, কোনো একটি দক্ষতা শেখার পেছনে বিনিয়োগ করলে সেই দক্ষতা...
৪ দিন আগে
ব্রিটিশ ভারতের অবিভক্ত পাঞ্জাবের গুজরানওয়ালা এলাকায় ১৯১৯ সালের ৩১ আগস্ট একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে অমৃতা প্রীতমের জন্ম। সাহিত্যের সব শাখায় সমানভাবে বিচরণ করলেও কবিতাই তাঁকে প্রতিষ্ঠা করেছে। ১১ বছর বয়সে মাকে হারিয়ে বাবার সঙ্গে লাহোরে চলে যান। দেশভাগের পর তিনি লাহোর থেকে ভারতে চলে আসেন।
৪ দিন আগে