Ajker Patrika
সাক্ষাৎকার

‘দুটি পুরস্কারই আমার কাছে অনেক সম্মানের ব্যাপার’

‘দুটি পুরস্কারই আমার কাছে অনেক সম্মানের ব্যাপার’

টেবিল টেনিসের বোর্ডে যাঁর বিচরণ ছিল দুই দশকেরও বেশি সময়, যিনি ১৬ বার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়ে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য এক উচ্চতায়, যাঁর কীর্তি ঠাঁই করে নিয়েছে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে; তিনি জোবেরা রহমান লিনু। এ বছর রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ দেওয়া হচ্ছে তাঁকে। আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে দেশের নারী ক্রীড়াঙ্গনের সম্ভাবনা, সংকট আর আগামীর পথচলা নিয়ে আজকের পত্রিকার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনোয়ার সোহাগ

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২৬, ২১: ১৫

প্রশ্ন: আপনার ক্যারিয়ার তো অনেক বর্ণিল। অনেক পুরস্কারও পেয়েছেন। দিন শেষে স্বাধীনতা পুরস্কার কি আপনার জন্য সেরা অর্জন হয়ে থাকল?

জোবেরা রহমান লিনু: আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে কীভাবে শুকরিয়া আদায় করব, জানি না। আমার জীবনে আর কিছু পাওয়ার নেই। আমার শ্রেষ্ঠ যে পুরস্কার, সেটা আল্লাহ আমাকে দিয়ে দিয়েছেন। আর কিছুই চাওয়ার নেই জীবনে। আমি এখন চাই, সুস্থ থেকে ইমানের সঙ্গে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে আমি নাম লিখিয়েছি, সেটাও আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন। আমার আসলে আর চাওয়ার কিছু নেই।

গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসেও নাম লিখিয়েছিলেন জোবেরা রহমান লিনু। ছবি: সংগৃহীত
গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসেও নাম লিখিয়েছিলেন জোবেরা রহমান লিনু। ছবি: সংগৃহীত

প্রশ্ন: আজ নারী দিবস। নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য রোল মডেল হিসেবে এই বিশেষ দিনে আপনার বার্তা কী থাকবে?

লিনু: আসলে অধিকার পুরুষ ও নারীর সমান। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে আমরা সেই অধিকারটা পাই না। সমানভাবে পায়ে পা মিলিয়ে চলার যে অধিকার, সেটা আমরা পাই না। নারী স্বাধীনতা কী? আমার প্রাপ্য সম্মানটুকু যেন পাই। একটা ছেলে যে কাজটা করতে পারে, একটা মেয়েও তা পারে। কিন্তু সেখানে দেখা যায়, মেয়ের ক্ষমতা বা যোগ্যতা থাকলেও তাকে সেই জায়গায় পৌঁছাতে দেওয়া হয় না। মনে করা হয়, সে পারবে না। তো আমরা চাই, মেয়েদের সমান অধিকারটা দেওয়া হোক, যোগ্যতা অনুযায়ী আমরা প্রাপ্যটুকু যেন পাই। একই সময়ে আমি মেয়েদেরও বলব, আপনারা বা আমরা কেউ যেন স্বাধীনতার নামে এমন কোনো কাজ না করি, যেটা দেখতে খারাপ লাগে। আজ থেকে ৫ হাজার বছর আগের কথাও যদি বলেন, সেখানেও কিন্তু মেয়েদের বিপদ ছিল, মেয়ে সব সময় কিন্তু সুরক্ষিত ছিল না, তাই না? এখন যদি বলি, আমরা সুরক্ষিত হতে চাই, সেটা সরকারের কাছে চাইতে পারি। তারা যেন মেয়েদের সুরক্ষিত হওয়ার যেসব পদক্ষেপ প্রয়োজন, সেগুলো নিশ্চিত করে। কিন্তু একইভাবে একটা পুরুষকেও তাদের নজর ঠিক রাখতে হবে। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পুরুষেরা মেয়েদের পোশাক-আশাক এবং চালচলন নিয়ে অনেক কিছু কথা বলে; যেটাকে ইভ টিজিং বলে। আমার মনে হয়, এটা প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ব্যাপার। সেটা তাদের জানার বিষয় না। যে সেটা করবে, তার প্রাপ্য তাকে পেতে হবে। কিন্তু তাই বলে তাকে অ্যাসিড মারা, গায়ে হাত তোলা, ধর্ষণ করা-এই ধরনের আচরণ ঠিক নয়। তো সেটা পুরুষদের দৃষ্টি সংযত করতে হবে এবং আমি মনে করি, একটা মেয়ে হিসেবে তারও সংযতভাবে চলাফেরা করতে হবে। এটা হচ্ছে আমার কথা। দিন শেষে আমরা মেয়ে বা পুরুষ না, সবাই মানুষ। আমরা মানুষ হিসেবে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চাই।

প্রশ্ন: টেবিল টেনিস খেলাটা এখনও সম্ভাবনাময় হয়ে উঠতে পারেনি কেন?

লিনু: এখানে একটি কথা বলি। আপনি প্রতিটা সময় দেখবেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু বদলায়। যেমন লন টেনিসে গ্র্যান্ড স্লাম যে নারী পেয়েছেন, সম্ভবত মার্গারেট কোর্ট, আজ পর্যন্ত তাঁর রেকর্ডটা কেউ ভাঙতে পারেনি-২৪টা গ্র্যান্ড স্লাম। এখনো তাঁকে সেই সম্মানটা দিতে হবে। ম্যারাডোনার সম্মান তাকে দিতে হবে। সময়ের সঙ্গে যুগে যুগে কিন্তু মানুষ এগিয়ে যায়, কিন্তু পেছনে যিনি আছেন, তাঁকেও অবজ্ঞা করা যাবে না। এখন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েরা ভালো করছে, যেমন খই খই মারমা ভালো করছে, জাভেদ ভালো করছে। ভবিষ্যতে আরও ভালো করবে বলে আশা করি। কারণ, এখনকার ছেলেমেয়েরা কিন্তু আগের চেয়ে অনেক সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে; বরং যে সুযোগ-সুবিধা তারা পাচ্ছে, তার তিন ভাগের আধা ভাগও আমরা পাইনি। তারপরও কিন্তু আমরা খেলে গেছি এবং যতটুকুই হোক অর্জন করার, করেছি। যেমন আমি ১৯৮০ সালে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের পর এখনো আমাদের দেশের কোনো মেয়ে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে কিন্তু ফিফথ হতে পারেনি। এটা তো দুঃখজনক। আমার বিশ্বাস, ভবিষ্যতে বাংলাদেশে টেবিল টেনিসে ছেলে-মেয়েরা ভালো করবে।

প্রশ্ন: ঈদের আনন্দটা কি এবার দ্বিগুণ হয়ে গেল, স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়ে?

লিনু: আসলে ছোটবেলা ছাড়া ঈদের আনন্দ আমাকে খুব একটা টানেনি। কারণ, ঈদটাকে ছোটবেলায় যেভাবে উদযাপন করেছি, আনন্দ করেছি, এখন তো বয়স হয়েছে, এখন আনন্দ করার কিছু নেই। তবে আমার সামগ্রিক জীবনের যে আনন্দ, সেটা আমার অনেক, মানে, আসলে বলার ভাষা নেই। আমি তো জীবনের প্রায় শেষ প্রান্তে। কিন্তু এই যে মরণোত্তর হয়নি আমার, এ জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। আমার পুরো জীবনের আনন্দটাই ঘিরে রয়েছে এই পুরস্কার।

প্রশ্ন: আপনার সিনিয়র ক্রীড়াবিদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন এখনো স্বাধীনতা পুরস্কার পাননি...

লিনু: হ্যাঁ, আমি একটা কথা বলি। এখানে এই কথাটা এল যখন বলি। আপনি হয়তো জানেন যে একটা সময় কিন্তু স্বাধীনতা বলেন, একুশে বলেন, কোনো পুরস্কারের জন্য আবেদন করতে হতো না। আমি কিন্তু এই স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য আবেদন করেছিলাম। আবেদন যদি না করতাম, তাহলে আমাকে দিত না। আবেদন করেছি এবং সবকিছু দেখে হয়তো আমাকে বিবেচনা করে পুরস্কারটি দেওয়া হয়েছে। কারণ, আমার সঙ্গে যদি কেউ আবেদন করত, তিনি যদি আমার চেয়ে বেশি ডিজার্ভ করতেন, তাঁকেই তো দিত, তাই না?

স্পোর্টস ক্যারিয়ারে যে রেজাল্ট আমার আছে ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক মিলিয়ে, সেই রেজাল্টটা আমার চেয়ে হয়তো দু-চারজনের থাকতে পারে। তবে গিনেস রেকর্ডটা আমার একার। এখন তাঁদের পুরস্কার দেওয়া হয়নি কেন, কিংবা সেই প্রশ্নের উত্তর যদি আমাকে দিতে হয়, সেটাতে বিব্রত হব। আমি এটার উত্তর দিতে পারব না। কারণ, আপনিও এটা চিন্তা করেন, ববিতা ম্যাডাম, উনিও কিন্তু একুশে পদক পেয়েছেন ৭২ বছর বয়সে। এখন অনেকে বলেন, গিনেস বুকে তাঁরাও তাঁদের নাম লেখাতে পারেন। তো ওয়েলকাম করছি সবাইকে, সবাই আবেদন করুক। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ যে ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড স্পোর্টসে, সেটাও যদি আপনি পেতে চান, তাহলে আপনাকে ফেডারেশনের পক্ষ থেকে সংগঠক হিসেবে বা খেলোয়াড় হিসেবে আবেদন করতে হবে। আপনি আবেদন করবেন না, আর ঘরে বসে কেউ আপনাকে অ্যাওয়ার্ড দিয়ে যাবে, তা তো আসলে হয় না?

প্রশ্ন: অস্ট্রেলিয়ায় মেয়েরা ফুটবল খেলছে নারী এশিয়ান কাপে প্রথমবারের মতো। এই বিষয়টা নিশ্চয়ই আপনাকে গর্বিত করছে।

লিনু: একসময় কিন্তু মেয়েরা যখন ফুটবল খেলত হুজুরেরা তাদের থ্রেট করেছিল, হাফপ্যান্ট পরে খেলাধুলা করছে বলে। সেই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে মেয়েরা যে এই মঞ্চে এসে ভালো করছে, সেটা তো অবশ্যই একটা পজিটিভ দিক। আর একটা কথা আমি একটু বলতে চাই, কেউ যদি অন্যভাবে না নেয়। এখনকার মেয়েরা কিন্তু এখনো অল্প বয়স। সুতরাং অবশ্যই আমরা সাধুবাদ জানাব, উৎসাহ দেব, কিন্তু তাদের অতিরিক্ত যদি আমরা লাইমলাইটে নিয়ে আসি, তাহলে কিন্তু ওরা খেই হারিয়ে ফেলবে। কারণ ওরা কিন্তু অনেক কষ্ট করে এই জায়গায় এসেছে। সুতরাং অনেক কিছু দেখেনি তারা। তো যখন আপনি হঠাৎ করে অনেক কিছু দেখে ফেলবেন, তখন অনেকেরই তো মাথা ঠিক থাকে না। ওদের আমরা অবশ্যই হাততালি দেব, কিন্তু এমন হাততালি দেব না, যাতে ওরা মনে করে যে আমার আর কিছু করার নেই। আমি তো অনেক কিছু করে ফেলেছি। তখন ওদের কাছ থেকে আমরা আর বেশি কিছু পাব না। সাফল্যের চেয়ে যদি তারা উদ্‌যাপনটা বেশি করে ফেলে, তাহলে কিন্তু তারা এর চেয়ে বেশি আর রেজাল্ট ভালো করবে না। সুতরাং তাদেরও এই জিনিসটা বুঝতে দিতে হবে, তোমাদের অনেক দূর যেতে হবে। শুধু এখানেই তোমাদের শেষ না। তোমরা এখন ভালো করছ, ভবিষ্যতে আরও ভালো করতে হবে।

টেবিল টেনিসে ১৬ বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন লিনু। ছবি: সংগৃহীত
টেবিল টেনিসে ১৬ বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন লিনু। ছবি: সংগৃহীত

প্রশ্ন: নারী ক্রীড়াবিদদের মধ্যে কেউ এখন এককভাবে তারকা হয়ে উঠতে পারছেন না। তো কোথায় ঘাটতিটা দেখছেন?

লিনু: খেলাধুলা কিংবা যেকোনো কিছুতে প্রেজেন্টেবল হওয়াটা খুব জরুরি। এটা পৃথিবীর সব ক্ষেত্রে। প্রত্যেক মানুষের ভেতরে একটা নিজস্ব ব্যক্তিত্ব তুলে ধরতে হয়। যাতে অন্য মানুষ আকর্ষিত হবে। শারীরিক আবেদনের কথা বলছি না, একটা মানুষকে শ্রদ্ধা করার যে জিনিসটা, সেটি তার প্রতি আসতে হবে। সেটা তার চলাফেরা, পোশাক-আশাক, চালচলন প্রতিটা জিনিস এমনভাবে হতে হবে, যাতে অন্যরা তাকে দেখে শেখে এবং সে একইভাবে নিজেকে প্রেজেন্ট করতে পারে-হ্যাঁ, ইনি স্মার্ট, ইনি কথা বলতে জানেন, ইনি পড়াশোনায় শিক্ষিত কিংবা স্বশিক্ষিত। সবকিছু মিলিয়ে একটা মানুষ তারকা হয়ে যেতে পারে। সুতরাং আমার মনে হয়, আমাদের কিছুটা ঘাটতি এখানেও আছে। মনে হয়, তারকা হতে গেলে তার বিশেষ কিছু গুণাবলি থাকতে হবে। তাহলে সে তারকা হতে পারবে। যেটা হচ্ছে না, হয়তোবা কিছুটা ঘাটতি আছে বলেই হচ্ছে না।

প্রশ্ন: গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস নাকি স্বাধীনতা পুরস্কার-কোনটি আপনি এগিয়ে রাখবেন?

লিনু: বাংলাদেশে তো আমি এখন পর্যন্ত একজনই এবং শুধু বাংলাদেশে নয়, ওয়ার্ডে আমার রেকর্ডটা এখন পর্যন্ত কেউ ভাঙতে পারেনি। এসব বিষয় বিবেচনা করেই হয়তো আমাকে স্বাধীনতা পুরস্কার দিয়েছে। আমি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে জায়গা করে নেওয়া একমাত্র বাংলাদেশি। সুতরাং গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসটা যেমন অনেক উচ্চতায় আছে, ঠিক তেমনিভাবে স্বাধীনতা পদকেরও একটা উচ্চতা আছে। সুতরাং এই দুটিকে আমি কোনোভাবে আলাদা করতে চাই না। দুটোই দুটোর পরিপূরক। স্বাধীনতা পুরস্কারকে আমি মাথার ওপরে রাখব; গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডকেও। দুটোই আমার কাছে সন্তানের মতো। দুটিই আমার কাছে অনেক সম্মানের ব্যাপার।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত