Ajker Patrika

আন্তর্জাতিক নারী : বিতর্কের কেন্দ্রে জে কে রাউলিং

ফিচার ডেস্ক
আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৮: ৪৬
আন্তর্জাতিক নারী : বিতর্কের কেন্দ্রে জে কে রাউলিং
জে কে রাউলিং। ছবি: সংগৃহীত

‘হ্যারি পটার’ সিরিজের স্রষ্টা জে কে রাউলিং একসময় ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিশু-কিশোর সাহিত্যিকদের একজন। কিন্তু গত কয়েক বছরে তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে আরেকটি বিষয় স্থায়ীভাবে জড়িয়ে গেছে। সেটি হলো নারীর ‘সেক্স-বেসড রাইট’ বা জৈবিক লৈঙ্গিকভিত্তিক অধিকার নিয়ে তাঁর অবস্থান।

সমর্থকদের কাছে তিনি নারী অধিকার রক্ষার অন্যতম সোচ্চার কণ্ঠস্বর; সমালোচকদের কাছে তিনি ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীর অধিকারের বিরোধী। এই মতবিরোধ এখন সাহিত্য কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গণ্ডি ছাড়িয়ে আদালত, নীতিনির্ধারণ, ক্রীড়া, কর্মক্ষেত্র এবং মানবাধিকার বিতর্কের কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে।

বিতর্কের সূচনা

২০১৯-২০২০ সালের দিকে রাউলিং প্রথম প্রকাশ্যে লৈঙ্গিক পরিচয় এবং জৈবিক লিঙ্গ নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। ২০২০ সালে প্রকাশিত একটি দীর্ঘ প্রবন্ধে তিনি

বলেন, ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের প্রতি বৈষম্য বা সহিংসতার তিনি বিরোধী হলেও আইন ও নীতিমালায় জৈবিক লিঙ্গের স্বীকৃতি বজায় রাখা জরুরি। তাঁর মতে, নারী হিসেবে জন্ম নেওয়া মানুষের জন্য নির্ধারিত কিছু নিরাপদ স্থান; যেমন আশ্রয়কেন্দ্র, কারাগার, পরিবর্তন কক্ষ কিংবা নির্দিষ্ট ক্রীড়া প্রতিযোগিতা—জৈবিক লিঙ্গের ভিত্তিতেই পরিচালিত হওয়া উচিত।

জৈবিক লৈঙ্গিকভিত্তিক অধিকার আসলে কী

রাউলিং ও তাঁর সমর্থকদের ব্যবহৃত জৈবিক লৈঙ্গিকভিত্তিক অধিকার বলতে বোঝানো হয় এমন অধিকার, যা জৈবিক নারী হওয়ার ভিত্তিতে আইনি বা সামাজিকভাবে স্বীকৃত। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • নারী-নির্দিষ্ট নিরাপদ স্থান
  • নারীদের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের নীতি
  • কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যবিরোধী সুরক্ষা
  • যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য পৃথক সেবা
  • সরকারি নথিতে জৈবিক লিঙ্গের স্বীকৃতি।
  • সমর্থকদের দাবি, এই অধিকারগুলো

দুর্বল হলে নারীরা বাস্তব ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

ট্রান্স অধিকারকর্মীদের আপত্তি অন্যদিকে ট্রান্স অধিকার সংগঠন এবং বহু মানবাধিকারকর্মী মনে করেন, রাউলিংয়ের বক্তব্য ট্রান্সজেন্ডার নারীদের সামাজিকভাবে আরও প্রান্তিক করে তুলবে। তাঁদের মতে, ট্রান্স নারীও নারী; তাই নারী-নির্দিষ্ট অনেক অধিকার ও সেবায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। সমালোচকদের অভিযোগ, জৈবিকলৈঙ্গিকভিত্তিক অধিকারের ধারণাটি বাস্তবে ট্রান্সজেন্ডার মানুষকে বাদ দেওয়ার রাজনৈতিক ভাষায় পরিণত হয়েছে।

নতুন বিতর্ক: জে কে রাউলিং উইমেন্স ফান্ড

২০২৫ সালে রাউলিং জে কে রাউলিং উইমেন্স ফান্ড প্রতিষ্ঠা করেন। এই তহবিলের ঘোষিত উদ্দেশ্য হলো এমন ব্যক্তি ও সংগঠনকে আইনি সহায়তা দেওয়া, যারা নারী ও কন্যাশিশুর জৈবিক লৈঙ্গিকভিত্তিক অধিকার রক্ষায় মামলা পরিচালনা করছে। এটি কর্মক্ষেত্র, খেলাধুলা এবং নারী-নির্দিষ্ট নিরাপদ স্থানে নারীদের অধিকার রক্ষায় কাজ করবে।

২০২৬ সালে বিতর্ক আরও তীব্র

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাউলিং আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির ট্রান্সজেন্ডার ক্রীড়াবিদদের বিষয়ে নেওয়া একটি সিদ্ধান্তকে প্রকাশ্যে সমর্থন

করেন এবং এটিকে নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য ‘ন্যায্য প্রতিযোগিতা’ নিশ্চিত করার পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেন।

এদিকে যুক্তরাজ্যের অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিবেদনে রাউলিং-সমর্থিত কিছু সংগঠনকে ‘অ্যান্টি রাইটস’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বিশেষ করে যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত বেইরা’স প্লেসকে (Beira’s Place) ঘিরে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সংগঠনটি এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নয়।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নাকি বৈষম্য

এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত এটিই। রাউলিংয়ের সমর্থকদের মতে, জৈবিক লিঙ্গ সম্পর্কে মত প্রকাশ এবং নারী-নির্দিষ্ট অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা গণতান্ত্রিক সমাজে বৈধ মতপ্রকাশের অংশ। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের এমন বক্তব্য ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামাজিক বিদ্বেষ ও বৈষম্যকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারে।

ফলে এটি শুধু একজন লেখককে ঘিরে বিতর্ক নয়; বরং আধুনিক সমাজে নারীর অধিকার, ট্রান্সজেন্ডার অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমতার ধারণার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হবে, সেই বৃহত্তর প্রশ্নের প্রতিফলন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত