Ajker Patrika

ভবন ৩২ তলা, ফ্ল্যাট বিক্রি হলো ৩৪ তলার

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৯ জুন ২০২৬, ১১: ০১
ভবন ৩২ তলা, ফ্ল্যাট বিক্রি হলো ৩৪ তলার

টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কিনেছিলেন চীনের এক ব্যক্তি। সব প্রস্তুতি শেষে যখন ফ্ল্যাটটি বুঝে নেওয়ার সময় এল, তখনই ঘটল চরম বিস্ময়কর এক ঘটনা। ক্রেতা জানতে পারলেন, যে বহুতল ভবনের ৩৪তম তলায় তিনি ফ্ল্যাট কিনেছেন, পুরো ভবনটিই আসলে ৩২ তলা! অর্থাৎ, যে ফ্ল্যাটের জন্য তিনি টাকা জমিয়েছিলেন, বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্বই নেই।

অবিশ্বাস্য ও নজিরবিহীন এই জালিয়াতির ঘটনাটি ঘটেছে চীনের শানসি প্রদেশের শি’আন শহরের উপকণ্ঠের একটি গ্রামে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে এই ঘটনার বিস্তারিত প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়েছে।

শেন নামের ওই ভুক্তভোগী ক্রেতা ২০১৩ সালে এই ফ্ল্যাটটি কিনেছিলেন। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আইনি লড়াই ও চেষ্টা চালিয়েও তিনি আজ পর্যন্ত নিজের টাকা বা ফ্ল্যাট—কোনোটিই ফেরত পাননি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে শেন নামের ওই ব্যক্তি শিআনের একটি প্রকল্পের একটি ফ্ল্যাট পছন্দ করেন। ৯০ বর্গমিটারের (প্রায় ৯৬৮ বর্গফুট) ওই ফ্ল্যাটটির প্রতি বর্গমিটারের দাম ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৬৪৬ ইউয়ান (যা চীনের ওই অঞ্চলের গড় বাজার দরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ)।

ফ্ল্যাটের দাম এত কম হওয়ার মূল কারণ ছিল এটির আইনি মর্যাদা। আবাসন প্রকল্পটি মূলত ‘লিমিটেড প্রোপার্টি রাইটস’ বা সীমিত সম্পত্তির অধিকার আইনের আওতাধীন ছিল। চীনে এই ধরনের ফ্ল্যাট সাধারণত গ্রামীণ সমবায়ের জমিতে অবৈধভাবে গড়ে ওঠে এবং সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন থাকে না।

সাধারণত এই ধরনের অবৈধ আবাসনগুলোতে কোনো আইনি সুরক্ষা পাওয়া যায় না এবং এগুলো সরকারিভাবে পুনঃবিক্রয়ও করা যায় না। তবে অত্যন্ত কম দাম হওয়ায় চীনের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারা প্রায়ই এই ঝুঁকিপূর্ণ ফাঁদে পা দিয়ে থাকেন। ফ্ল্যাটটি কেনার সময় ডেভেলপার কোম্পানি শেনকে আশ্বাস দিয়েছিল যে, অতি দ্রুত তারা সরকারি অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে ফেলবে। এই আশ্বাসে বিশ্বাস করে শেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৭০০ ইউয়ান অগ্রিম (ডাউন পেমেন্ট) পরিশোধ করেন।

চুক্তি অনুযায়ী ২০১৫ সালে ফ্ল্যাটটি শেনকে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্মাণকাজে বিলম্বের কারণে অবশেষে ২০১৭ সালে এসে ডেভেলপার কোম্পানি শেনকে জানায় নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।

তবে ফ্ল্যাটের চাবি দেওয়ার পরিবর্তে তারা শেনকে এক অদ্ভুত তথ্য দেয়। ডেভেলপার জানায়, শেষ পর্যন্ত ভবনটি ৩২ তলা পর্যন্ত নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছে। ফলে শেনের কেনা ৩৪ তলার ফ্ল্যাটটির কোনো অস্তিত্ব নেই।

বিকল্প হিসেবে ডেভেলপার কোম্পানি শেনকে ৩২ তলার একটি ফ্ল্যাট নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ওই মুহূর্তে বাকি টাকা শোধ করতে না পারায় মাত্র দুই মাসের মাথায় ডেভেলপার কোম্পানি সেই ফ্ল্যাটটি অন্য এক ক্রেতার কাছে বিক্রি করে দেয়।

নিজের থাকার স্বপ্ন ভেস্তে যাওয়ার পর শেন তাঁর দেওয়া অগ্রিম অর্থ ফেরত চান। কিন্তু ডেভেলপার কোম্পানি আর্থিক সংকটের অজুহাত দেখিয়ে টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তীতে ২০২০ সালে ২০ হাজার ইউয়ান এবং ২০২২ সালে ৫০ হাজার ইউয়ান আংশিক ফেরত দেওয়ার পর ডেভেলপার কোম্পানি শেনের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়।

কোনো উপায় না পেয়ে শেন বিষয়টি নিয়ে সালিশি আদালতের দ্বারস্থ হন। আদালত শেনের পক্ষে রায় দিয়ে ডেভেলপার কোম্পানিকে বাকি ৪৭ হাজার ৭০০ ইউয়ান এবং সেই সঙ্গে ২৭ হাজার ইউয়ান সুদ পরিশোধের নির্দেশ দেয়। নির্দিষ্ট সময়ে অর্থ পরিশোধ না করলে আরও ৪৭ হাজার ইউয়ান ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়।

আদালতের এই স্পষ্ট নির্দেশনার পরও চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত শেন তাঁর পাওনা টাকা পাননি। পরবর্তীতে স্থানীয় একটি আদালত দেনাদার কোম্পানির ওপর ‘কনজাম্পশন রেস্ট্রিকশন অর্ডার’ বা কেনাকাটা ও খরচের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কিন্তু ওই ডেভেলপার কোম্পানির নামে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা রেজিস্টার্ড সম্পদ না থাকায় আইনিভাবে এই অর্থ আদায় করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

ফ্ল্যাট কেনার এক দশকেরও বেশি সময় পর শেন আজ গৃহহীন এবং তাঁর কষ্টার্জিত অর্থও হারিয়ে গেছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত