Ajker Patrika

শীর্ষ ধনীদের গোপন ক্লাব: অদ্ভুত সব নিয়ম, নিজস্ব ধর্ম প্রচারসহ যেসব বিষয়ে চলে আলাপ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
শীর্ষ ধনীদের গোপন ক্লাব: অদ্ভুত সব নিয়ম, নিজস্ব ধর্ম প্রচারসহ যেসব বিষয়ে চলে আলাপ
ডায়ালগ ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন পিটার থিয়েল। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী প্রায় ২০০ জন মানুষ প্রতি বছর একটি অত্যন্ত গোপনীয় বৈঠকে মিলিত হন। তাঁরা সেখানে কী করেন? কী নিয়ে আলোচনা করেন? অতিথি তালিকাতেই বা কারা থাকেন? দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে থাকা এই সব কৌতুহলোদ্দীপক প্রশ্নের উত্তর এবার সামনে এসেছে একটি বড় ধরনের তথ্য ফাঁসের মাধ্যমে।

সুইস হ্যাকার ‘মাইয়া আরসন ক্রাইমিউ’-এর ফাঁস করা গোপন নথি থেকে পেপ্যালের সাবেক প্রধান পিটার থিয়েল এবং বিনিয়োগকারী অরেন হফম্যানের সহ-প্রতিষ্ঠিত অতি-গোপন সামাজিক ক্লাব ‘ডায়ালগ’-এর ভেতরের চাঞ্চল্যকর কর্মকাণ্ডের চিত্র উঠে এসেছে। হ্যাকার ক্রাইমিউ এর আগে ২০২৩ সালে মার্কিন বিচার বিভাগের নো-ফ্লাই তালিকার তথ্য ফাঁস করে আলোচনায় এসেছিলেন।

২০০৬ সাল থেকে সক্রিয় এই নেটওয়ার্কটি মূলত বিশ্বের ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ, উদ্যোক্তা, বিদেশী কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, সিলিকন ভ্যালির প্রতিষ্ঠাতা এবং হলিউড তারকাদের আমন্ত্রণ জানানোর মাধ্যমে বছরজুড়ে অত্যন্ত ব্যক্তিগতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে। আগামী আগস্টে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনের উপকণ্ঠে এই ক্লাবের দুই দিনের একটি বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

ডায়ালগ নামের এই ক্লাবের অস্তিত্বের কথা আগে থেকেই জানা থাকলেও, এবারের তথ্য ফাঁসে সংগঠনটির ভেতরের এমন কিছু অদ্ভুত ও গোপন নিয়ম সামনে এসেছে যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তৈরি করেছে।

সদস্যদের গোপন রেটিং ও বৈষম্যমূলক ফি

প্রযুক্তি বিষয়ক সাময়িকী ‘ওয়্যারড’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ডায়ালগ তাদের সম্মেলনে আসা অতিথিদের অত্যন্ত গোপনে একটি স্কেলের মাধ্যমে মূল্যায়ন এবং গ্রেডিং করে থাকে। তাঁদের সম্পদ ও খ্যাতির ওপর ভিত্তি করে এ, বি বা সি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়। তবে মজার বিষয় হলো, সবচেয়ে বিখ্যাত এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দেওয়া হয় ‘সি’ গ্রেড।

যেমন, হলিউড অভিনেতা জশ ব্রোলিনকে এখানে একজন ‘ভিআইপি’ বা ‘সি’ গ্রেডের সদস্য হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর প্রোফাইলে লেখা রয়েছে, ‘অ্যাভেঞ্জার্স সিরিজে থানোস চরিত্রে তাঁর অভিনয় এবং অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম-এর মতো ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্রে তাঁর সম্পৃক্ততা। এই সিরিজ প্রায় ২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করেছে। এই সিরিজই তাঁকে এই অনন্য অবস্থানে নিয়ে এসেছে।’

তবে শুধু খ্যাতিই নয়, ডায়ালগের কর্মীরা সদস্যদের ১ থেকে ৪ স্কেলের মধ্যে একটি ‘ভ্যালু-অ্যাড’ বা মূল্যায়ন স্কোরও দিয়ে থাকেন। যদি কোনো সদস্যের স্কোর অতি নিম্ন হয় অথবা তিনি ক্লাবের সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই না হন, তবে তাঁকে পরবর্তী ইভেন্টগুলোতে আর আমন্ত্রণ জানানো হয় না।

এই গ্রেডিং পদ্ধতিটি মূলত ইভেন্টের প্রবেশ মূল্য নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়, যা একেকজনের জন্য হাজার হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে। কম প্রভাবশালী সদস্যদের কাছ থেকে প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে পুরো ফি আদায় করা হয়, যেখানে প্রভাবশালী ভিআইপিদের মাত্র ২৫ শতাংশকে এই চড়া মূল্য পরিশোধ করতে হয়।

অদ্ভুত ও বিচিত্র সব অধিবেশন

এই ক্লাবের বার্ষিক সম্মেলনের আলোচনার বিষয়বস্তু সাধারণ করপোরেট সভার মতো নয়, বরং বেশ বিচিত্র এবং কখনো কখনো বিতর্কিত।

পরিকল্পিত অধিবেশনগুলোর তালিকায় রয়েছে—‘পারমাণবিক শক্তি ফিরিয়ে আনা’, ‘অপতথ্য ও ডিপফেক’, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিপরীতমুখী চিন্তা’ এবং ‘নজরদারির অধীনে গণতন্ত্র’।

তবে সাধারণ আলোচনার বাইরেও এখানে কিছু চমকপ্রদ সেশন থাকে। যেমন—কীভাবে নিজের নামে ধর্মমত বা দল গড়ে তোলা যায় (যার সঞ্চালক একটি খ্রিস্টান ওয়েবসাইটের প্রতিষ্ঠাতা), ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমাদের করণীয় কী’ এবং ‘আপনার যৌন জীবন কেমন চলছে?’-এর মতো অদ্ভুত সব বিষয়।

ক্লাবের ভেতরেই চলে ঘটকালি

তথ্য ফাঁসে জানা গেছে, ডায়ালগ কেবল পেশাদার নেটওয়ার্কিংয়ের জায়গা নয়, এটি সদস্যদের প্রেম বা ডেটিংয়ের জন্য ব্যাকস্টেজ ম্যাচমেকিং বা জুটি মেলানোর কাজও করে থাকে।

উন্মোচিত নথির একটি নোটে দেখা গেছে, দুই সদস্যের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পেছনে কর্মকর্তাদের যুক্তি ছিল—‘তাঁরা দুজনেই নিউইয়র্কে থাকেন এবং সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত রয়েছেন।’ পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় একে অপরকে ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতি পাঠানো হয়। তবে এই ব্যবস্থায় একটি ‘ডু-নট-পেয়ার’ (জুটি না করার) তালিকাও রয়েছে, যেন বিবাহিত দম্পতি বা আগে থেকেই পেশাগতভাবে পরিচিত সহকর্মীদের ভুল করে একসঙ্গে যুক্ত না করা হয়।

কীভাবে ফাঁস হলো এই সুরক্ষিত তথ্য?

ডায়ালগের বৈচিত্র্যময় গ্রেডিং পদ্ধতি কিংবা ডেটিং সেবার চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ডেটার নিরাপত্তা নিয়ে। বিশ্ব রাজনীতি ও সংস্কৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা যেখানে এই ক্লাবের সদস্য, সেখানে তাঁদের তথ্য কেন এত অরক্ষিত অবস্থায় ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ফাঁস হওয়া তথ্যের মধ্যে সদস্যদের বাড়ির ঠিকানা, ফোন নম্বর, ই-মেইল, জন্মতারিখ, কার কোন খাবারে অ্যালার্জি এবং কার রাজনৈতিক আদর্শ কেমন—সব বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।

তথ্য ফাঁসকারী মাইয়া আরসন ক্রাইমিউ মার্কিন সংবাদমাধ্যম স্ট্রেট অ্যারো-কে বলেন, ‘পৃথিবী নিয়ন্ত্রণকারী এই মানুষগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে এতটাই আত্মবিশ্বাসী যে তারা সাধারণ অপারেশনাল সিকিউরিটির (ডিজিটাল নিরাপত্তা) কোনো তোয়াক্কাই করে না। এমনকি তাদের এই “অফ দ্য রেকর্ড” গোপন বৈঠকের জন্যও কোনো বিশেষ সতর্কতা ছিল না, যেখানে বসে তারা আমাদের সবার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত