Ajker Patrika

পৃথিবী ধ্বংস হবে আগামী ১৩ নভেম্বর, বিজ্ঞান গবেষণাপত্রে জাদুকরের ভবিষ্যদ্বাণী

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
পৃথিবী ধ্বংস হবে আগামী ১৩ নভেম্বর, বিজ্ঞান গবেষণাপত্রে জাদুকরের ভবিষ্যদ্বাণী
হেইঞ্জ ফন ফোয়ারস্টার। ছবি: সংগৃহীত

১৯৬০ সালে বিশ্বের অন্যতম প্রধান বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্স’ একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিল। শিরোনাম ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট কিন্তু ভয়ংকর—‘Doomsday: Friday, 13 November, A. D.2026’ অর্থাৎ, “মহাপ্রলয় দিবস: ১৩ নভেম্বর, শুক্রবার, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ। ”

গবেষণাপত্রটিতে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, এই তারিখে, অর্থাৎ আজ থেকে মাত্র এক মাসের কিছু বেশি সময় পর পৃথিবীর মানব জনসংখ্যা অসীমের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষ কার্যত নিজেদেরই ধ্বংস করে ফেলবে। দাবিটি এতটাই অদ্ভুত ছিল যে এটি দ্রুত সাধারণ মানুষের ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করে। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, এর পেছনের গবেষণা ও গণিত যথেষ্ট যুক্তিসংগত বলে মনে হওয়ায় বিজ্ঞানীরাও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আলোচনা করেছিলেন।

গবেষণাটির লেখক ছিলেন হেইঞ্জ ফন ফোয়ারস্টার নামে এক অস্ট্রিয়ান-আমেরিকান অধ্যাপক ও সাইবারনেটিক্স বিশেষজ্ঞ এবং তাঁর দুই শিক্ষার্থী প্যাট্রিসিয়া এম. মোরা ও লরেন্স ডব্লিউ. অ্যামিওট। তাদের যুক্তি ছিল, মানবজাতির জনসংখ্যা অন্য সব জনসংখ্যার তুলনায় ব্যতিক্রমী। মানুষের সংখ্যা হয়তো শুধু সাধারণ সূচকীয় হারে বাড়ে না, বরং সেই বৃদ্ধির হারও ক্রমাগত বাড়তে পারে। তারা লিখেছিলেন, ‘আমাদের প্রপৌত্ররা অনাহারে মারা যাবে না। তারা চাপে পিষ্ট হয়ে মারা যাবে।’

গবেষণাপত্রটি নিয়মিত বিভিন্ন জায়গায় উদ্ধৃত হতে থাকে। এমনকি এর ভবিষ্যদ্বাণীগুলোও আশ্চর্যজনকভাবে সঠিক বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু প্রায় ১৯৯৩ সালের দিকে, অর্থাৎ পূর্বাভাস দেওয়া ‘ডুমসডে’র অর্ধেক পথ পেরোনোর সময়, বিশ্বের জনসংখ্যা তাদের হিসাবের তুলনায় পিছিয়ে পড়তে শুরু করে।

আজ বিশ্বের জন্মহার ১৯৬০ সালের তুলনায় অর্ধেকেরও সামান্য কম। আশা করা যায়, আগামী ১৩ নভেম্বর আমরা সবাই ঘুম থেকে উঠে দেখব, এটি আর দশটি সাধারণ দিনের মতোই একটি দিন। তবু এই গবেষণাপত্রটি আজও গুরুত্বপূর্ণ এক উদাহরণ হিসেবে রয়ে গেছে। কারণ এতে কঠোর বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে এমন এক ধরনের নাটকীয় উপস্থাপনার কৌশলের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যার প্রভাব ছিল অসাধারণ।

মানুষের অনন্য ক্ষমতা

২০ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বজুড়ে জনসংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় সমাজে উদ্বেগও বাড়তে থাকে। মানুষের সংখ্যা এত বেশি বেড়ে গেলে পৃথিবীর সম্পদে ঘাটতি দেখা দিতে পারে এবং এর ফলে ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতও তৈরি হতে পারে, এমন আশঙ্কা তখন ব্যাপক ছিল।

এই উদ্বেগের পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ম্যালথাসীয় এক ধারণা কাজ করছিল। এই ধারণার মূল কথা হলো—মানুষের জনসংখ্যা স্বাভাবিকভাবে সূচকীয় হারে বাড়তে পারে, কিন্তু খাদ্য উৎপাদন ও মানুষের বেঁচে থাকার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা সেই বৃদ্ধিকে শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে।

কিন্তু ভন ফোয়ারস্টার এবং তার সহলেখকেরা তাদের গবেষণাপত্রে ভিন্ন যুক্তি দেন। তাঁরা বলেন, জনসংখ্যার ক্ষেত্রে মানুষ হয়তো অন্য প্রাণী বা জীবের তুলনায় ‘ব্যতিক্রমী।’ মানুষের মধ্যে যোগাযোগ করার এবং সমস্যা সমাধানের জন্য ‘জোট’ বা ‘coalition’ তৈরি করার ক্ষমতা রয়েছে। ফলে জনসংখ্যার ঘনত্ব বাড়ার অর্থ শুধু আরও বেশি মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতা নয়। বরং এর অর্থ হতে পারে, মানুষের মধ্যে সহযোগিতার আরও বেশি সুযোগ তৈরি হওয়া।

এই কারণে মানুষের সংখ্যা শুধু সূচকীয় হারে বাড়তেই পারে না, বরং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও ক্রমাগত বাড়তে পারে।

২ হাজার বছরের তথ্য

এরপর গবেষকেরা গত ২ হাজার বছরজুড়ে পৃথিবীর জনসংখ্যার ২৪টি হিসাব ব্যবহার করেন। এই তথ্যের মাধ্যমে তারা দেখানোর চেষ্টা করেন যে বাস্তবে মানবজাতির সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে আগের প্রত্যাশার তুলনায় দ্রুত বেড়েছে। পুরো যুক্তিটি উপস্থাপন করা হয়েছিল অত্যন্ত শান্ত, বৈজ্ঞানিক ভাষায়। এর সঙ্গে ছিল অনেক জটিল গাণিতিক সমীকরণ।

বিষয়টি তাই বাইরে থেকে দেখতে একেবারে গুরুগম্ভীর বৈজ্ঞানিক গবেষণার মতোই ছিল।

‘চাপে পিষ্ট হয়ে মৃত্যু’

এরপর ভন ফোয়ারস্টার ও তাঁর সহলেখকেরা অতীতের এই জনসংখ্যার তথ্যকে ভবিষ্যতের দিকে প্রসারিত করেন। তাদের হিসাব অনুযায়ী, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যেহেতু ক্রমাগত বাড়ছে, তাই ২০২৬ সালে পৃথিবীর মানুষের সংখ্যা অসীমের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। অবশ্য সৌভাগ্যের বিষয় হলো, মানবজাতির যে সহযোগিতা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা ইতিহাসজুড়ে আমাদের উন্নতি করতে সাহায্য করেছে, সেই একই ক্ষমতা হয়তো এই বিপর্যয়ও ঠেকাতে পারে।

গবেষকেরা ধরে নিয়েছিলেন, মানুষ স্বাভাবিকভাবে নিজেদের আয়ু কমাতে চাইবে না। তাই তাদের মতে, আমাদের একসঙ্গে কাজ করে বিশ্বের জন্মহার অর্ধেকে নামিয়ে আনতে হবে। তাদের এই গবেষণাপত্র প্রকাশের পরপরই ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ব্রিটিশ সাময়িকী টাইমস ও মার্কিন সংবাদমাধ্য দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এটি পোগো (Pogo) কমিক স্ট্রিপের একাধিক পর্বের বিষয়ও হয়ে ওঠে।

অনেক ভাষ্যকার গবেষণাপত্রটিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ভয় নিয়ে করা এক ধরনের রসিক বা ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য হিসেবে দেখেছিলেন।

জনসংখ্যা বিস্ফোরণ

কিন্তু গল্পটি সেখানেই শেষ হয়নি। বরং অদ্ভুত একটি ঘটনা ঘটল। সায়েন্স ম্যাগাজিন যখন গণিতবিদ ও জনসংখ্যাবিদদের লেখা চিঠি প্রকাশ করল, যেখানে তারা ভন ফোয়ারস্টার ও তার সহকর্মীদের গবেষণার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন এবং সেটিকে ‘হাস্যকর’ এবং ‘স্পষ্টতই অযৌক্তিক’ বলেছিলেন, তখন গবেষণাটির লেখকেরা পাল্টা জোরালো প্রতিক্রিয়া জানান। তাঁরা নিজেদের গবেষণার পেছনের গণিত এবং সেই গণিত থেকে পাওয়া সিদ্ধান্তের পক্ষেই আরও দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেন।

১৯৬০-এর দশক থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত ‘Doomsday’ সমীকরণটি নিয়মিত সাইট বা উদ্ধৃত হতে থাকে। জেনেটিক্স, পরিবেশবিদ্যা এবং জনসংখ্যাবিজ্ঞান বিষয়ে বিভিন্ন পাঠ্যবইয়ে সাধারণত কোনো বিশেষ সতর্কতা ছাড়াই বা মূল হিসাবকে সত্য ধরে নিয়েই এই সমীকরণ ব্যবহার করা হতো। এমনকি এটি আরও অদ্ভুত জায়গাতেও হাজির হয়েছিল।

কানাডার পার্লামেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে

১৯৬৩ সালে কানাডার একটি সংসদীয় কমিটির শুনানিতে রাসায়নিক শিল্পের একজন প্রতিনিধি এই সমীকরণকে গুরুত্ব দিয়ে উদ্ধৃত করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, সামনে যে জনসংখ্যা বিস্ফোরণ আসছে, সেটি সামাল দিতে মানুষকে খাওয়ানোর জন্য রাসায়নিক কীটনাশক প্রয়োজন।

১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের একটি গর্ভপাত-সংক্রান্ত মামলায়, যা পরবর্তীতে রো বনাম ওয়েড মামলার দিকে নিয়ে যায়, এই জনসংখ্যা-ভিত্তিক ধারণাটিও উদ্ধৃত করা হয়েছিল। সেখানে এটি এমন একটি যুক্তির অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয় যে, জনসংখ্যা বাড়ানোর পক্ষে সরকারের বিশেষভাবে কোনো বাধ্যতামূলক কারণ নেই।

কেন ‘ডুমসডে’ ধারণাটি টিকে ছিল

‘ডুমসডে’ ধারণাটি টিকে থাকার একটি কারণ ছিল এর ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা সম্পর্কে পূর্বাভাসগুলো কিছু সময়ের জন্য সত্যিই অত্যন্ত নির্ভুল ছিল। এর মূল সমীকরণ ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে অধিকাংশ জনসংখ্যাবিদদের পূর্বাভাসের তুলনায় ভালো ফল দিচ্ছিল। কিন্তু প্রায় ১৯৯৩ সালের দিকে সেই নির্ভুলতা কমতে শুরু করে।

বিশ্বের প্রকৃত জনসংখ্যা পূর্বাভাসের তুলনায় কমতে শুরু করে। এর কারণ ছিল একটি গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়—বিশ্ব ধীরে ধীরে ঠিক সেই কাজটিই করতে শুরু করেছিল, যেটি ভন ফোয়ারস্টার ও তার সহকর্মীরা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, বিশ্বজুড়ে জন্মহার কমতে শুরু করেছিল।

আজকের বিশ্বে জন্মহার ১৯৬০ সালের তুলনায় অর্ধেকেরও সামান্য কম।

বিজ্ঞান ও নাটকীয় উপস্থাপনা

সম্ভবত আমরা সবাই আগামী শুক্রবার, ১৩ নভেম্বর ‘চাপে পিষ্ট হয়ে’ মারা যাব না। কিন্তু শুধু বিষয়টি ভুল প্রমাণিত হয়েছে ধরে নিয়ে পরের কোনো সম্ভাব্য ‘ডুমসডে’ বা প্রলয়দিবসের প্রস্তুতিতে চলে যাওয়ার আগে, এই ঘটনা থেকে আমরা কী শিখতে পারি, সেটি ভাবা দরকার।

লেখকের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো আমরা কীভাবে আমাদের বিশ্বাস ও ধারণাকে বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করি। হেইঞ্জ ভন ফোয়ারস্টার জীবনের একটি পর্যায়ে মঞ্চের জাদুকর বা স্টেজ ম্যাজিশিয়ান ছিলেন। মঞ্চে জাদু দেখানোর প্রচলিত কৌশলের ভাষা ব্যবহার করলে, একটি কার্যকর বিভ্রম বা illusion সাধারণত তিনটি অংশের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে—

১. প্রস্তুতি

প্রথমে দর্শককে একটি স্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে রাখা হয়।

২. অস্বাভাবিক মোড়

এরপর এমন কিছু ঘটে, যা দর্শকের প্রত্যাশার বাইরে।

৩. শেষের প্রকাশ

শেষে সেই রহস্যের সমাধান হয় এবং পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

ভন ফোয়ারস্টার ও তার সহলেখকদের গবেষণাপত্রও ঠিক এভাবেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এটি ছিল মূলত একটি সাধারণ বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র, কিন্তু সেটিকে ঘিরে দেওয়া হয়েছিল এক অসাধারণ ও ভয়ংকর শিরোনাম এবং উপসংহার। তারপরও গবেষণাটি গুরুত্ব ধরে রাখতে পেরেছিল, কারণ এর ভিত্তি ছিল বাস্তব গবেষণা, তথ্য ও যুক্তি। অর্থাৎ, নিছক ভয় দেখানো নয়, বরং বৈজ্ঞানিক যুক্তিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল যে মানুষ সেটিকে উপেক্ষা করতে পারেনি।

একটি গুরুতর বিষয় নিয়ে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ইচ্ছাকৃতভাবে অদ্ভুত বা প্রায় অসম্ভব একটি ধারণাকে ব্যবহার করা—এটিও এক ধরনের চমৎকার কৌশল।

তথ্যসূত্র: দ্য ইনডিপেনডেন্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত