Ajker Patrika

ভুয়া ওয়েবসাইট বন্ধের ঘোষণা ভারতের, ইন্টারনেটে বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা গোড্যাডির

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৬, ১৪: ১১
ভুয়া ওয়েবসাইট বন্ধের ঘোষণা ভারতের, ইন্টারনেটে বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা গোড্যাডির
ভুয়া ওয়েবসাইট বন্ধের ঘোষণা ভারতের, ইন্টারনেটে বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা গোড্যাডির। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের বৃহত্তম ইন্টারনেট ডোমেইন নিবন্ধনকারী প্রতিষ্ঠান গোড্যাডি সতর্ক করেছে, বিখ্যাত ব্র্যান্ডের নামে পরিচালিত ভুয়া ওয়েবসাইট দমনে ভারতের আদালতের নতুন নির্দেশনা বৈধ ব্যবসার জন্য ইন্টারনেটকে আরও কম নিরাপদ করে তুলবে এবং এর প্রভাব বৈশ্বিক পর্যায়ে পড়বে। রয়টার্সের পর্যালোচনা করা আদালতের গোপন নথি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানিটি দিল্লি হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চে ওই নির্দেশনার বিরুদ্ধে আপিল করেছে। তাদের যুক্তি, আদালতের নির্দেশনা শুধু ভারতে নয়, আন্তর্জাতিক ডোমেইন ব্যবস্থাপনাতেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে অনলাইন জালিয়াতিও বেড়েছে। এটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। গত বছর ভারত সরকার কথিত সাইবার জালিয়াতির ২৪ লাখ অভিযোগ পেয়েছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ২৪০ কোটি মার্কিন ডলার।

এর আগে ২০১৯ সাল থেকে আমাজন, ম্যাকডোনাল্ডসসহ ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক কয়েক ডজন প্রতিষ্ঠান নিজেদের ব্র্যান্ডের নামে পরিচালিত ভুয়া ওয়েবসাইটের বিরুদ্ধে মামলা করে। গত ডিসেম্বরে নয়াদিল্লির একটি আদালত ১ হাজার ১০০টির বেশি এমন ওয়েবসাইট ব্লক করার নির্দেশ দেন। তবে বিচারক শুধু ওয়েবসাইট ব্লক করার নির্দেশেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, তিনি এমন কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন, যা কার্যত ইন্টারনেট পরিচালনার নিয়মকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে।

আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, ডোমেইন নিবন্ধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রাহকদের বিনা মূল্যে প্রাইভেসি সুরক্ষা দিতে পারবে না। যে কেউ ‘বৈধ স্বার্থ’ দেখাতে পারলে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট ডোমেইন মালিকের নিবন্ধন তথ্য সরবরাহ করতে হবে। পাশাপাশি সুরক্ষিত ট্রেডমার্ক বা ব্র্যান্ডের নামের বিভিন্ন রূপ বা কাছাকাছি বানানের ডোমেইন নিবন্ধন নিষিদ্ধ করতে হবে।

গোড্যাডির দাবি, একই ধরনের নাম বহনকারী বহু বৈধ ব্যবসা এই নির্দেশনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কোম্পানিটি বলেছে, ডিফল্ট প্রাইভেসি সুরক্ষা তুলে দিলে বৈধ ওয়েবসাইট মালিকদের নাম, ঠিকানা, টেলিফোন নম্বর ও ই-মেইল ঠিকানা প্রকাশ্যে চলে আসবে। এতে তাঁরা অনুসরণ, হয়রানি এবং অন্যান্য পূর্বানুমেয় গোপনীয়তা ও নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে পড়বেন।

গোড্যাডি আরও যুক্তি দিয়েছে, ডোমেইন নাম কোনো নির্দিষ্ট দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ফলে ভারতের আদালতের এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হলে প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্বজুড়ে ডোমেইন নিবন্ধনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হতে পারে। এ ছাড়া আদালত ‘বৈধ স্বার্থ’ থাকা ব্যক্তিদের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নিবন্ধন তথ্য দেওয়ার যে নির্দেশ দিয়েছেন, সেটিও বাস্তবসম্মত নয় বলে দাবি করেছে গোড্যাডি। তাদের ভাষ্য, কার বৈধ স্বার্থ রয়েছে, তা নির্ধারণের মতো সক্ষমতা তাদের নেই।

প্রায় ৫ হাজার ১২১ পৃষ্ঠার আপিল নথির একটিতে কোম্পানিটি বলেছে, এই ‘বাণিজ্যিকভাবে অস্থিতিশীল’ নির্দেশনাগুলো ডোমেইন নিবন্ধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘ভারত ছেড়ে যেতে’ বাধ্য করতে পারে। গোড্যাডির বার্ষিক আয় ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ৮ কোটি ডোমেইন পরিচালনা করে এবং ২ কোটির বেশি গ্রাহককে সেবা দেয়। ২০২৪ সালে কোম্পানির কর্মকর্তারা ভারতকে উদীয়মান বাজারগুলোর মধ্যে তাদের সবচেয়ে বড় অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

আদালতের নথি অনুযায়ী, গোড্যাডির প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনাভিত্তিক নেমচিপ এবং নেদারল্যান্ডসভিত্তিক হোস্টিং কনসেপ্টসও একই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে। তবে তাদের আপিলের বিস্তারিত জানা যায়নি। প্রতিষ্ঠান দুটি রয়টার্সের প্রশ্নেরও জবাব দেয়নি।

এই মামলার সূত্রপাত হয় ২০টির বেশি প্রতিষ্ঠানের আবেদনের মাধ্যমে। তারা আদালতের কাছে অভিযোগ করে, ভুয়া ওয়েবসাইটগুলো তাদের ব্র্যান্ডের ক্ষতি করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল আমাজন, ম্যাকডোনাল্ডস, মাইক্রোসফট, শাওমি এবং কোলগেট-পামোলিভ। তাদের কেউই রয়টার্সের প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। গত ডিসেম্বরের রায়ে আদালত ভুয়া ওয়েবসাইটগুলোকে ‘বৃহৎ পরিসরের প্রতারণার ইঞ্জিন’ বলে উল্লেখ করেন।

রায়ে উল্লেখিত ১৪টি ব্যবস্থার একটি অনুযায়ী, ডোমেইন মালিকের পরিচয় গোপন রাখার সুবিধা আর বিনা মূল্যে দেওয়া যাবে না। এটি অর্থের বিনিময়ে দিতে হবে। আদালতের ভাষায়, এই সুবিধা অসাধু পরিচালকদের পরিচয় আড়াল করার ‘একটি পর্দা’ হিসেবে কাজ করে। তবে আদালতের নির্দেশ কার্যকর থাকা সত্ত্বেও গোড্যাডির ওয়েবসাইটে এখনো ‘চিরদিনের জন্য বিনা মূল্যে প্রাইভেসি সুরক্ষা’ দেওয়ার প্রচার রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, জনসাধারণের ডিরেক্টরি থেকে গ্রাহকের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর ও ই-মেইল গোপন রাখা হবে।

গোড্যাডির দাবি, প্রাইভেসি সুরক্ষা দুর্বল করা ভারতের তথ্য সুরক্ষা আইন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিডিপিআরের ‘প্রাইভেসি বাই ডিফল্ট’ নীতির পরিপন্থী। নিউইয়র্কভিত্তিক ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স গবেষক ফারজানেহ বাদি এই রায়ের সমালোচনা করে বলেন, ইউরোপে নিবন্ধন তথ্য গোপন রাখার কারণ ছিল এগুলো প্রকাশ করে হয়রানি ও লক্ষ্যভিত্তিক ফিশিংয়ের অপব্যবহার। তাঁর ভাষায়, ‘যাঁরা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তাঁরা সাংবাদিক, অধিকারকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসার মালিক এবং সাধারণ মানুষ। ব্র্যান্ডের ছদ্মবেশ ধারণকারী প্রতারকেরা নয়।’

এদিকে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এ বছর বলেছেন, দেশটিতে প্রতি ৩৭ সেকেন্ডে একজন মানুষ সাইবার অপরাধের শিকার হন এবং কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এটি ‘জাতীয় সংকটে’ পরিণত হতে পারে। আদালতের নথিতে দেখা যায়, গত ডিসেম্বরে বিচারকের নির্দেশনার আগে ভারত সরকারও একই ধরনের অবস্থান তুলে ধরেছিল।

গোড্যাডির আপিলের সঙ্গে যুক্ত ২০২৩ সালের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একটি ৫৯ পৃষ্ঠার অপ্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, সরকার আদালতকে জানিয়েছিল যে তারা ‘ডোমেইন নামের অপব্যবহার’ এবং ‘কঠোর যাচাইয়ের অভাব’ নিয়ে উদ্বিগ্ন। সাইবার অপরাধ মোকাবিলার দায়িত্বে থাকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আদালতকে জানায়, তদন্তের স্বার্থে নিবন্ধন তথ্য সহজলভ্য হওয়া উচিত।

এই অবস্থান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মেটা, এক্স, গুগল ও টেলিগ্রামের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মোদি সরকারের বিরোধের ধারাবাহিকতার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলে বিবেচিত কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগে নয়াদিল্লি এসব প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করেছে এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে আদালতের দ্বারস্থও হয়েছে। গোড্যাডির দাবি, এসব ওয়েবসাইট বন্ধ করার পর আদালত যে ট্রেডমার্কের বিভিন্ন বর্ণ বা সংখ্যা পরিবর্তিত সংস্করণও নিষিদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন, তা কার্যত ‘সর্বব্যাপী নিষেধাজ্ঞা’, যা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন।

কোম্পানিটি যুক্তি দিয়েছে, ‘ম্যাকডোনাল্ড’ একটি স্কটিশ উৎসের প্রচলিত নাম, যার অর্থ ‘বিশ্বশাসকের পুত্র।’ এই শব্দ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে ভাষাগত ও ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন একটি সাধারণ নামের ওপর কার্যত একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। রয়টার্স দেখতে পেয়েছে, ‘mcdonalds-india-franchise. com’ ডোমেইনটি এখনও গোড্যাডি ইন্ডিয়ায় প্রায় ১০ মার্কিন ডলারে নিবন্ধনের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।

এ ছাড়া গোড্যাডি মেরিয়াম-ওয়েবস্টার অভিধানের গবেষণার তথ্য আদালতে জমা দিয়ে বলেছে, ইউনিলিভারের ভারতীয় ইউনিট এইচইউএলের ট্রেডমার্কের বিভিন্ন রূপ সুরক্ষিত করতে গেলে ইংরেজি ভাষার অন্তত ১১৮টি শব্দের সঙ্গে সংঘাত তৈরি হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তারা ‘hulk’ এবং ‘moghul’ শব্দের কথা উল্লেখ করেছে। গোড্যাডির ভাষ্য, ‘নিবন্ধিত কোনো ট্রেডমার্কের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে মিলে যায় না, এমন ইংরেজি শব্দযুক্ত ডোমেইন নিবন্ধন করা কার্যত অসম্ভব।’

দিল্লি হাইকোর্ট আগামী ১৬ জুলাই এসব আপিলের শুনানি করবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত