Ajker Patrika

ভাইরাস: সুপার মারণাস্ত্র হয়ে আবারও ফিরছে কি

মইনুল হাসান, ফ্রান্স  
ভাইরাস: সুপার মারণাস্ত্র হয়ে  আবারও ফিরছে কি
চীনের উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজির প্রধান নারী ভাইরাসবিজ্ঞানী শি ঝেংলি। সূত্র: এএফপি

বছর পাঁচেক আগে করোনার সংক্রমণে পৃথিবী থেমে গিয়েছিল, পুরো মানবসভ্যতা বিলীন হতে বসেছিল। আর তার ১০০ বছর আগে স্প্যানিশ ফ্লুর বিষাদময় বৈশ্বিক মহামারির ইতিহাসও আমাদের জানা আছে। ১৯১৮ থেকে ১৯২০ সাল—এই দুই বছরে ২০০ কোটির কম মানুষের এই পৃথিবীর ৩ থেকে ৫ কোটি মানবসন্তানের জীবনহানি ঘটিয়েছিল সেই ভয়ংকর ভাইরাস। তারপর যেমন আচমকা উদয় হয়েছিল, তেমন করেই পৃথিবী থেকে বিদেয় নিয়েছিল স্প্যানিশ ফ্লুর অতি প্রাণঘাতী ভাইরাস। আসলেও কি তাই?

বিজ্ঞানীরা ঠিক তা বলছেন না। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে একদল বিজ্ঞানী সেকালের একজন ভিকটিমের ফুসফুস থেকে খানিকটা নমুনা সংগ্রহ করে ভাইরাসের ডিএনএ পুনর্গঠন করেন এবং গবেষণাগারে স্প্যানিশ ফ্লুর সমতুল্য ভাইরাস সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। এই ভাইরাসের অতি প্রাণঘাতী ক্ষমতা পরীক্ষা করার জন্য আমেরিকান গবেষকেরা ইঁদুরে সংক্রামিত করেন। গবেষণাগারে সংক্রামিত ইঁদুরগুলো একটিও রেহাই পায়নি, সব কটির মৃত্যু হয়। এদিকে কানাডার গবেষকেরা এই একই ভাইরাসের মারণক্ষমতা পরীক্ষা করার জন্য একটি বিশেষ প্রজাতির বানরকে বেছে নেন। সাধারণত এই প্রজাতির বানরকে ভাইরাস কাবু করতে পারে না। মানুষের উদ্ভাবিত এই ভাইরাসে সংক্রামিত হওয়ার পরপরই সেই বানরেরা দ্রুত আক্রান্ত হয় এবং সব বানর মারা যায়। বিজ্ঞানীরা তখন তড়িঘড়ি করে প্রচণ্ড হিমায়িত সিন্দুকে এই দানবকে বন্দী করেন। আজও তা গবেষণাগারের সতর্ক প্রহরায় সুরক্ষিত হিমায়িত কুঠুরিতে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন।

‘ভাইরাস’ নামক অতি ক্ষুদ্র এবং অতি সংক্রামক দানবের বংশগতির অণু, ডিএনএ অথবা আরএনএ নকশার বিন্যাসে পরিবর্তন ঘটিয়ে ল্যাবরেটরিতে নতুন প্রকরণের সৃষ্ট ভাইরাসকে বলা হয় ‘ফ্রাঙ্কেনভাইরাস’। পৃথিবীর দেশে দেশে বিজ্ঞানীরা জীবজগতের কল্যাণের জন্য ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করছেন, সৃষ্টি করেছেন এই নতুন সব ফ্রাঙ্কেনভাইরাস। তবে এই অতি ক্ষুদ্র এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতি সংক্রামক, সেই সঙ্গে অতি মারণক্ষমতার ভাইরাস নিয়ে গবেষণার ঝুঁকি মোটেই কম নয়। ঝুঁকি এবং বিপদের মাত্রা বিবেচনায় রেখে পৃথিবীর দেশে দেশে ভাইরাস গবেষণাগারগুলোকে পি২, পি২+, পি৩, পি৩+ এবং পি৪—এই পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ১৯৬০ সাল থেকে অতি বিপজ্জনক গবেষণাগার ‘পি৪’ দেখা দিতে শুরু করে। বর্তমানে পৃথিবীতে এ ধরনের গবেষণাগারের সংখ্যা ৫২টি। এই তালিকায় অচিরেই যোগ হতে যাচ্ছে আরও ১৪টি গবেষণাগার!

তবে ভাইরাস গবেষণা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, আরও প্রশ্ন উঠেছে পুরো জীবজগতের নিরাপত্তা নিয়ে। অসতর্কতা, ভুল বা দুর্ঘটনার কারণে গবেষণাগারের কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেদ করে এই ভাইরাস বেরিয়ে পড়লে মানবজাতিকে মহাদুর্যোগের মোকাবিলা করতে হবে, এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। কারণ, ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী। তাঁদের মধ্যে ১৯৩২ সালে গবেষণাগারে সংক্রামিত বানরের কামড়ে ভাইরাস সংক্রামিত হয়ে প্রাণ হারান গবেষক উইলিয়াম ব্রেবনার। ১৯৪৩ সালে অস্ট্রেলিয়ান বিজ্ঞানী ডোরা লাস যখন গবেষণাগারে টিকা উদ্ভাবনের চেষ্টা করছিলেন, তখন তাঁর আঙুলে মারাত্মক অণুজীব লেগে থাকা একটি সুচ বিঁধে যায়। ফলে অল্পদিনের ব্যবধানে তিনি প্রাণ হারান। এমন আরও উদাহরণ দেওয়া যাবে।

পি৪ ভাইরাস গবেষণাগারে কর্মরত একজন গবেষক। সূত্র: ল্যাবরেটরি জঁ মেরিও
পি৪ ভাইরাস গবেষণাগারে কর্মরত একজন গবেষক। সূত্র: ল্যাবরেটরি জঁ মেরিও

এ প্রসঙ্গে আজও অনেকে বিশ্ব কাঁপিয়ে দেওয়া অতিমারি কোভিড-১৯-এর উদাহরণ দেন। ২০১৯ সালের নভেম্বরে চীনের উহান শহর থেকে সেই অতিমারি অতিদ্রুত ছড়িয়ে পড়ে প্রায় পুরো পৃথিবীতে। সেই শহরেই আছে উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি পি৪। চীনা বিজ্ঞানীরা খুবই সতর্কতার সঙ্গে এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টনীতে সংরক্ষণ করছিলেন এই ‘অতি বিপজ্জনক’ নতুন করোনাভাইরাস। তবে কি চীনা বিজ্ঞানীদের সর্বোচ্চ সতর্কতা এবং নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার সব ধাপ অতিক্রম করে, দুর্ঘটনাক্রমে কোভিড-১৯ ভাইরাসটি বেরিয়ে পড়েছিল? করোনাভাইরাসের উৎপত্তি সম্পর্কে সবার মনেই একটা খটকা লেগে আছে।

c74dd2f4-68af-40fc-9db4-4d82f0df6ae3

১৯৫০ সালে অস্ট্রেলিয়াজুড়ে বন্য খরগোশের অতিরিক্ত উৎপাত শুরু হলে সেখানকার জীববৈচিত্র্য লোপ পেতে শুরু করে। তখন মাইক্সোমাটোসিস ভাইরাসে সংক্রামিত করে কিছু খরগোশকে ছেড়ে দেওয়া হয় বন্য সংক্রমিত খরগোশদের মধ্যে। এর ফলে দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে থাকে সুস্থ থাকা খরগোশদের মধ্যে। এতে ৯৫ শতাংশ বন্য খরগোশ নির্মূল হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে খরগোশ নির্মূল করার জন্য ভাইরাসকে মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৭৫ বছর আগে। আজ ৭৫ বছর পরে, খরগোশের জায়গায় মানুষ হলে পৃথিবী বিরান হবে। তাতে যে ভয়াবহ অবস্থা হবে, সেটি কল্পনাও করা সম্ভব নয়।

মানুষের হাতে পড়ে ভাইরাস পরিণত হচ্ছে ক্যানসারসহ জটিল ব্যাধি নিরাময়ের এক অতি বিস্ময়কর এবং অব্যর্থ হাতিয়ার হিসেবে। এর নাম ফ্রাঙ্কেনভাইরাস বা সুপার ভাইরাস। তবে সেই সঙ্গে আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে, অশুভ শক্তির হাতে পড়লে এই ভাইরাস হতে পারে এক অতি ভয়ংকর দানব ফ্রাঙ্কেনস্টাইন; যেটি হয়ে উঠতে পারে সুপার অস্ত্র।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত