Ajker Patrika

যুক্তরাষ্ট্রে টিকটককে ছাড়িয়ে গেল এক ফিলিস্তিনির তৈরি অ্যাপ, কে তিনি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
যুক্তরাষ্ট্রে টিকটককে ছাড়িয়ে গেল এক ফিলিস্তিনির তৈরি অ্যাপ, কে তিনি
২০২৫ সালে আপস্ক্রলড তৈরি করেন ফিলিস্তিনি–জর্ডানিয়ান–অস্ট্রেলীয় ডেভেলপার ইসাম হিজাজি। ছবি: রেস্ট অব ওয়ার্ল্ড

জনপ্রিয় শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্ম টিকটকের যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারত্ব এখন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওরাকলের মালিক ল্যারি এলিসনের হাতে। বহু আইনি ঘোল খাওয়ানোর পর অবশেষে চীনা মালিকানাধীন কোম্পানি বাইটড্যান্সের থেকে মার্কিন কার্যক্রম নিয়ে নিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে যাঁর হাতে গেল, তিনি ব্যবহারকারীদের মধ্যে বেশ বির্তকিতই বলা চলে। কেন না ল্যারি এলিসন ইসরায়েলের দৃঢ় সমর্থক এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কনটেন্ট সেন্সর হতে পারে এ আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকের জনপ্রিয়তা কমছে বলে আল-জাজিরার প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে।

গত বুধবার টিকটক গাজা থেকে কাজ করা এমি পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও আল জাজিরার অবদানকারী বিসান আওদাকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করে। এরপর টিকটকের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভ ও বয়কটের আহ্বান ওঠে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন কর্মকর্তাদের (আইসিই) সহিংসতা সংক্রান্ত কনটেন্ট সেন্সরের অভিযোগও ওঠে টিকটকের বিরুদ্ধে।

টিকটকের এই জটিলতার বেড়াজালে যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক দেশে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাপ ‘আপস্ক্রলড’। নামটি নতুন শোনা গেলেও এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে।

টিকটকের মার্কিন মালিকানা হস্তান্তরিত হওয়ার পর নেটিজেনরা এর বিকল্প মাধ্যম খুঁজতে শুরু করে আর সে সময়ই সবার নজর কাড়ে ‘আপস্ক্রলড’। মাত্র এক বছর আগে যাত্রা শুরু করা ‘আপস্ক্রলড’ চলতি সপ্তাহে চমকপ্রদভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অ্যাপ ডাউনলোডের শীর্ষে উঠে আসে। ‘স্বচ্ছ প্রযুক্তি’ (Transparent Tech) দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করছে বলে জানিয়েছে আপস্ক্রলড। ব্যবহারকারীদের চাপে গত সপ্তাহের শেষে অ্যাপটির সার্ভারও সাময়িক সময়ের জন্য বিকল হয়ে পড়ে।

আপস্ক্রলড কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?

আপস্ক্রলডে ছবি, স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও ও লেখা পোস্ট করা যায়। এটিকে অনেকটা এক্স (সাবেক টুইটার) ও ইনস্টাগ্রামের সংমিশ্রণ বলে মনে হয়। এর ইন্টারফেস এক্স-এর মতো এবং এক্স-এর ব্যবহারকারীদের মতো আপস্ক্রলডের ব্যবহারকারীরাও কোনো পোস্টে লাইক দিতে, মন্তব্য করতে কিংবা পুনরায় পোস্ট (রিপোস্ট) করতে পারেন।

তবে অধিকাংশ ব্যবহারকারী টিকটকের বদলে এই অ্যাপ ব্যবহার শুরু করলেও এখন পর্যন্ত আপস্ক্রলডে স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিওর তুলনায় লেখা ও ছবিভিত্তিক পোস্টেই বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন তাঁরা।

আপস্ক্রলডে স্ন্যাপচ্যাটের মতো একটি ‘ডিসকভার পেজ’ রয়েছে। এই ডিসকভার পেজে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জনপ্রিয় বিষয় ফিলিস্তিন। গাজা উপত্যকায় চলমান মানবিক বিপর্যয় এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে করা শত শত পোস্টে অ্যাপটি এখন সয়লাব।

আপস্ক্রলডে কয়েকজন ‘হাই-প্রোফাইলড’ ব্যক্তিও যোগ দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মার্কিন শ্রম অধিকারকর্মী ও সাবেক অ্যামাজন ইউনিয়ন সংগঠক ক্রিস স্মলস। তিনি ২০২৫ সালের জুলাইয়ে গাজা উপত্যকার অবরোধ ভাঙার প্রচেষ্টায় গাজা ফ্রিডম ফ্লোটিলায় অংশ নিয়েছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪ লাখ বার এবং বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭ লাখ বার আপস্ক্রলড ডাউনলোড হয়েছে। ছবি: গুগল প্লে স্টোর
যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪ লাখ বার এবং বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭ লাখ বার আপস্ক্রলড ডাউনলোড হয়েছে। ছবি: গুগল প্লে স্টোর

এছাড়া জনপ্রিয় ক্রাইমভিত্তিক মার্কিন টিভি সিরিজ ‘ব্রুকলিন নাইন-নাইন’–এ অভিনয় করা ইহুদি-মার্কিন অভিনেতা জ্যাকব বার্গারও আপস্ক্রলডে যুক্ত হয়েছেন। তিনিও ফ্রিডম ফ্লোটিলা অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন।

এদিকে, চলতি সপ্তাহের শুরুতে অ্যাপটির কিছু ব্যবহারকারী অভিযোগ করেন, ভিডিও আপলোড করতে গিয়ে অ্যাপটি ক্র্যাশ করছিল। গত বৃহস্পতিবার অ্যাপটির ভেতরে দেওয়া এক আপডেটে আপস্ক্রলড জানায়, ব্যবহারকারীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় এই সমস্যা দেখা দিয়েছিল এবং তারা দাবি করে, ত্রুটিগুলো এরইমধ্যে ঠিক করা হয়েছে।

আপস্ক্রলডের নির্মাতা ও নির্মাণের গল্প

২০২৫ সালে আপস্ক্রলড তৈরি করেন ফিলিস্তিনি–জর্ডানিয়ান–অস্ট্রেলীয় ডেভেলপার ইসাম হিজাজি। এর আগে ওরাকল ও আইবিএমের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন তিনি। ফিলিস্তিনপন্থী প্রযুক্তি উদ্যোগে অর্থায়নকারী অ্যাডভোকেসি প্রকল্প ‘টেক ফর প্যালেস্টাইন’-এর সমর্থনে এই অ্যাপটি তৈরি করা হয়েছে।

প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম রেস্ট অব ওয়ার্ল্ডকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হিজাজি বলেন, গাজায় ইসরায়েলের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ তাকে বিগ টেকের চাকরি ছেড়ে একটি বিকল্প প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করেছে। জনপ্রিয় অ্যাপগুলোতে কনটেন্ট সেন্সরশিপের হার বেড়ে যাওয়াও এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি বড় কারণ বলে জানান তিনি।

হিজাজি বলেন, ‘আমি আর নিতে পারছিলাম না। গাজায় পরিবারের সদস্য হারিয়েছি। আমি এই অন্যায়ের অংশীদার হতে চাইনি। তাই মনে হয়েছে, এই কাজ আমি আর করব না, আমি উপকারী কিছু করতে চাই।’

এই ডেভেলপার আরও বলেন, ‘বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর সেন্সরশিপের কারণে ব্যবহারকারীরা একটি সেন্সরবিহীন প্ল্যাটফর্ম খুঁজছিল। বাজারে এর শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। অনেককেই এমন প্ল্যাটফর্ম খুঁজতে দেখছিলাম। তখনই ভাবলাম, নিজেই কেন একটা বানাই না? তারপর এই অ্যাপটি তৈরি করলাম।’

গত বছর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রানচেস্কা আলবানিজে আইবিএমসহ আরও কয়েকটি বড় প্রযুক্তি কোম্পানির বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ‘গণহত্যা’য় সহযোগিতার অভিযোগ তোলেন। এদিকে ইনস্টাগ্রাম, এক্স ও টিকটক–এর মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিলিস্তিনপন্থী কনটেন্টে ‘শ্যাডো ব্যান’-এর অভিযোগ করে আসছেন ব্যবহারকারীরা।

আপস্ক্রলডের দাবি, তারা কেবল অবৈধ কনটেন্ট, যেমন-মাদক বিক্রি, নিয়ন্ত্রণ করে, এর বাইরে আর কিছু নয়। টিকটকসহ অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের মতো মানুষকে লাগাতার স্ক্রলে প্রলুব্ধ করতে আপস্ক্রলডের অ্যালগরিদম তৈরি করা হয়নি বলে জানান হিজাজি।

সাক্ষাৎকারে আপস্ক্রলড প্রতিষ্ঠাতা আরও বলেন, ‘বিষয়টা আমরা এটা জানি না এমন নয়, এ ধরনের অ্যালগরিদম সেট করা খুবই সহজ। কিন্তু আমি সেটা করতে চাই না, কারণ আমি জানি এর মানসিক প্রভাব কতটা হতে পারে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ওপর।’

আপস্ক্রলডের দাবি, তাদের ফিড পুরোপুরি কালানুক্রমিক (ক্রোনোলজিক্যাল) রাখা হয়েছে। ব্যবহারকারীদের অভিযোগ সত্ত্বেও অন্যান্য জনপ্রিয় অ্যাপে বহু আগেই তুলে দেওয়া হয়েছে।

প্ল্যাটফর্মটি জানিয়েছে, ডিসকভার পেজে থাকা পোস্টগুলো বর্তমানে এনগেজমেন্টের ভিত্তিতে সাজানো হচ্ছে। ব্যবহারকারীর আচরণ অনুযায়ী ফিড নতুনভাবে সাজাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে টিমটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে।

নিজেদের ওয়েবসাইটে আপস্ক্রলড জানায়, তারা ব্যবহারকারীদের এমন একটি জায়গা দিতে চায়, যেখানে মানুষ ‘মুক্তভাবে নিজের ভাবনা প্রকাশ করতে, মুহূর্ত ভাগাভাগি করতে এবং অন্যদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে’ পারবে। কোম্পানিটির ভাষ্য অনুযায়ী, এই অ্যাপটি ব্যবহারকারীদেরই, ‘গোপন অ্যালগরিদম বা বাইরের কোনো এজেন্ডার নয়’।

কতজন আপস্ক্রলড ডাউনলোড করেছেন?

মার্কেটিং ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান সেন্সর টাওয়ার–এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন মাসে আপস্ক্রলড অ্যাপটি চালু হওয়ার পর থেকে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪ লাখ বার এবং বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭ লাখ বার ডাউনলোড হয়েছে।

গত ২২ জানুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অ্যাপটির ডাউনলোড হঠাৎ বেড়ে যায়। ওই দিনই টিকটক একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার মাধ্যমে তাদের অ্যাপের যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত একটি সংস্করণ তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সেন্সর টাওয়ার–এর হিসাব অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে আপস্ক্রলডের মোট ডাউনলোডের ৮৫ শতাংশই ঘটেছে ২১ থেকে ২৭ জানুয়ারির মধ্যে। এ ছাড়া কানাডা, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াতেও অ্যাপটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরিমাণে ডাউনলোড হয়েছে।

গুগল প্লে স্টোরে টিকটক শীর্ষে থাকলেও, অ্যাপল অ্যাপ স্টোরে এটি থ্রেডস, হোয়াটসঅ্যাপ এবং টিকটককে ছাড়িয়ে এক নম্বরে পৌঁছেছে। গুগল প্লেতেও অ্যাপটি ফ্রি সোশ্যাল অ্যাপের তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে আছে।

নতুন ব্যবহারকারীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় সার্ভার বিকল হওয়ার পর গত রোববার প্ল্যাটফর্মটিতেই এক পোস্টে প্রতিষ্ঠাতা ইসাম হিজাজি লেখেন, ‘আমাদের সার্ভারে ভয়ানক চাপ পড়েছে। এটি ভীষণ রোমাঞ্চকর!’

পরবর্তীতে তিনি আরও লেখেন, ‘ত্রুটি ও গ্লিচের জন্য দুঃখিত। আমরা এই চাপ সামাল দিতে সক্ষমতা বাড়াচ্ছি। আগামী ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হবে বলে আশা করছি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত