
২০১৬ সালের কথা। দেশের গমচাষিরা হয়তো এখনো ভুলে যেতে পারেননি সেই দুঃস্বপ্নের কথা। একদিন সকালে তাঁরা খেতে গিয়ে দেখতে পেলেন, সবুজ-সোনালি শিষগুলো রাতারাতি সাদা হয়ে গেছে। প্রথমে কেউ বুঝতেই পারেননি কী হয়েছে। পরে জানা গেল, এশিয়ার মাটিতে এই প্রথম হানা দিয়েছে গমের ব্লাস্ট রোগ। এটি এমন এক রোগ, যা আগে শুধু দক্ষিণ আমেরিকায় দেখা যেত। প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমির গম নষ্ট হয়ে যায় সেবার—কোথাও কোথাও ফলনের ক্ষতি একেবারে শতভাগ। আর কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ!
এরপর বিষয়টি থেকে মুক্তির উপায় ভাবতে শুরু করেন গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তোফাজ্জল ইসলাম। তিনি ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। রোগটি কীভাবে ছড়াচ্ছে, আর কেন এটি এত ভয়ংকর—এসব নিয়ে গবেষণা তো হলোই; কিন্তু তাঁর মাথায় তখন অন্য একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল, শুধু রোগ চিহ্নিত করে লাভ কি, যদি এমন একটা জাত তৈরি করা না যায়, যেটা এই রোগে কাবু হবে না?
এই লক্ষ্য নিয়ে ২০১৯ সালে শুরু হয় একটি দীর্ঘ গবেষণা প্রকল্প। ভিয়েনার আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) অর্থায়নে সেই গবেষণার কাজ শুরু করেন অধ্যাপক ড. তোফাজ্জল ইসলাম। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের পিএইচডি ফেলো ড. হোসেন সোহরাওয়ার্দী। এর পদ্ধতি হিসেবে বেছে নেওয়া হয় মিউটেশন ব্রিডিং, অর্থাৎ গামা রশ্মি এবং এক্স-রে দিয়ে বীজের জিনগত পরিবর্তন ঘটানো। শুধু তা-ই নয়, চীনের বেইজিংয়ের ইনস্টিটিউট অব ক্রপ সায়েন্সের সঙ্গে যৌথভাবে লানঝৌর ল্যাবে গমের বীজে প্রয়োগ করা হয় উচ্চশক্তির কার্বন আয়ন বিম। বাংলাদেশে গম নিয়ে তিন ধরনের পারমাণবিক পদ্ধতি একসঙ্গে ব্যবহার আগে হয়নি।
বছরের পর বছর ল্যাবরেটরি গবেষণার পর আসে মাঠপর্যায়ের পরীক্ষার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ব্লাস্টের সবচেয়ে বড় হটস্পট বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা মেহেরপুরের মাঠে শুরু হলো পরীক্ষা। কয়েক স্তরের পরীক্ষার ফলাফল দেখে বিজ্ঞানীদের চোখ আনন্দে নেচে উঠল। তৈরি হলো অষ্টম প্রজন্মের এমন কিছু সমজাতীয় মিউট্যান্ট লাইন, যা ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয় না। এই নতুন গম যে রোগ প্রতিরোধে শতভাগ সফল, তা-ই শুধু নয়; মাঠের সাধারণ এলিট জাতের তুলনায় এর ফলন ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখলেন, প্রতিটি গমগাছে কার্যকর কুশি বা টিলারের সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় এই অভাবনীয় ফলন সম্ভব হচ্ছে।
এ বিষয়ে ড. তোফাজ্জল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশে ব্লাস্ট-প্রতিরোধী এবং উচ্চফলনশীল গমের জাত উদ্ভাবনে আয়ন বিম ও এক্স-রে ব্যবহার কিন্তু এবারই প্রথম। এই মিউট্যান্ট লাইনগুলো এখন নতুন জাত হিসেবে ছাড় করার জন্য মাঠপর্যায়ে আঞ্চলিক ট্রায়ালের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। এটি যদি সফল হয়, তাহলে কৃষকদের ফলন বিপর্যয় ঠেকানোর পাশাপাশি দেশের খাদ্যনিরাপত্তাও অনেকটা নিশ্চিত হবে।’
ড. তোফাজ্জল ইসলামের কথা শুনতে সহজ মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে বছরের পর বছরের নির্ঘুম রাত, বারবার ব্যর্থ হয়েও আবার শুরু করার গল্প। যে মাটিতে একদিন গম পুড়ে সাদা হয়ে গিয়েছিল, সেই মাটিতে সফলতা এসেছে এই পরীক্ষা। জন্ম নিতে চলেছে রোগপ্রতিরোধী এবং উচ্চফলনশীল নতুন এক জাতের গম। অধ্যাপক ড. তোফাজ্জল ইসলামের ল্যাবরেটরি ও মাঠপর্যায়ের গবেষণা শেষ হয়েছে এ বছর। বর্তমানে তাঁর উদ্ভাবিত গমের প্রজাতিটি নিবন্ধন করার উদ্দেশ্যে ডিইউএস (স্বাতন্ত্র্য, একরূপতা ও স্থায়িত্ব) এবং ভিসিইউ পরীক্ষার জন্য জমা দেওয়ার জন্য চলছে পরিকল্পনা।
পুরো গবেষণাকর্মটি এরই মধ্যে বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সে প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া এটি আন্তর্জাতিক জার্নাল সায়েন্টিফিক রিপোর্ট, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব রেডিয়েশন বায়োলজি এবং সিআরপি বুক চ্যাপ্টারে প্রকাশের জন্য পর্যালোচনাধীন রয়েছে।
দেশের জনসংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, চাষের উপযোগী জমি যেভাবে কমছে, এই বাস্তবতায় এমন আবিষ্কার আসলে শুধু সাফল্যের খবর নয়; একধরনের ভরসা যে সংকট যত বড়ই হোক, সমাধান খুঁজে বের করার মতো মানুষ এই দেশে এখনো আছেন। এখন অপেক্ষা শুধু একটাই—আঞ্চলিক ট্রায়াল পার হয়ে এই গম কবে দেশের সব প্রান্তিক কৃষকের খেতে পৌঁছায়, আর কবে আবার সেই মাঠগুলো ভরে উঠবে সোনালি শিষে।

সৃষ্টির জন্য বয়স যে কোনো সমস্যা নয়, তার বহু উদাহরণ আছে পৃথিবীতে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ মানা জাম্পালা। এআই প্রযুক্তির যুগে জন্ম ও বেড়ে ওঠা মানা যে এই প্রযুক্তিতে কিছু করে ফেলবে, সেই রাস্তা যেন তৈরিই ছিল।
৭ ঘণ্টা আগে
সাধের ওয়াই-ফাই কানেকশনটি হুটহাট স্লো হয়ে যাওয়া কিংবা বাফারিং করা এক চরম বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা। অনেক সময় আমরা ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বা রাউটারকে দোষ দিই। কিন্তু ১৯৯৩ সালে বিশ্বের প্রথম বড় ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক তৈরির কারিগর কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অ্যালেক্স হিলস জানান...
৮ ঘণ্টা আগে
আদিগন্ত অন্ধকার আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। চারপাশে নিঃসীম শূন্যতা, নেই কোনো সাড়াশব্দ। আমাদের চেনা পৃথিবী থেকে প্রায় ৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন মাইল দূরে সৌরজগতে একাকী ভাসছে একটি মানবসৃষ্ট বস্তু। ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে সেটি নিথর অবস্থায় ছিল। কোনো শক্তি নেই, কোনো সাড়া নেই।
৮ ঘণ্টা আগে
চীন এবং ইউরোপের যৌথ উদ্যোগে গাড়ি চালনায় যুক্ত হয়েছে স্টিয়ার-বাই-ওয়্যার। এটি বৈদ্যুতিক সংকেতে স্টিয়ারিং ঘোরানোর প্রযুক্তি। প্রচলিত গাড়ির মতো যান্ত্রিক শ্যাফটের পরিবর্তে এই প্রযুক্তিতে চালকের স্টিয়ারিং ঘোরানোর তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তরিত হয়।
৯ ঘণ্টা আগে