Ajker Patrika

এআই প্রশিক্ষণ: বিশ্বের অর্ধেক শ্রমশক্তি ভারতের ছোট শহর ও গ্রামে

ফিচার ডেস্ক
এআই প্রশিক্ষণ: বিশ্বের অর্ধেক শ্রমশক্তি ভারতের ছোট শহর ও গ্রামে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা এআই নিয়ে আলোচনা হলে আমাদের চোখে ভেসে ওঠে সিলিকন ভ্যালি, অত্যাধুনিক ডেটা সেন্টার কিংবা বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নাম। কিন্তু এ প্রযুক্তি বিপ্লবের পেছনে রয়েছেন ভারতের গ্রামাঞ্চলের অনেক সাধারণ মানুষ।

ঝাড়খন্ড রাজ্যের ২৭ বছর বয়সী চন্দ্রমণি কেরকেট্টা দিনে চাষের কাজ করেন এবং রাতে বসেন কম্পিউটারের সামনে। তাঁর কাজ ডেটা লেবেলিং। অর্থাৎ ছবি, ভিডিও বা নথিতে চিহ্ন দিয়ে এআই সিস্টেমকে শেখানো কোনটি কী। শুনতে সাধারণ মনে হলেও আধুনিক মেশিন লার্নিংয়ের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বয়ং-চালিত গাড়ি থেকে শুরু করে ভাষা অনুবাদ সফটওয়্যার—সবকিছুর পেছনে রয়েছে মানুষের হাতে লেবেল করা বিপুল ডেটা।

কেরকেট্টা বলেন, ‘এ কাজ আমাকে পড়াশোনা শেষ করতে সাহায্য করছে। আবার বাড়িতে থেকে খামারের দেখভালও করতে পারছি।’

বর্তমানে ভারতের গ্রাম ও ছোট শহরে বসবাসকারী দুই লাখের বেশি মানুষ ডেটা লেবেলিং কাজের সঙ্গে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্ক্রাই এআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, এটি বিশ্বের মোট ডেটা লেবেলিং কর্মীর প্রায় অর্ধেক। তবে এই সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

ক্লাউড ফার্মিং: নতুন ডিজিটাল কৃষি

প্রত্যেক কর্মী প্রতিদিন শত শত ছবি, ভিডিও ও ডকুমেন্ট লেবেল করেন। কখনো বাড়িতে বসে, কখনো স্থানীয় ডেটা সেন্টারে। এটিকে বলা হচ্ছে ক্লাউড ফার্মিং, অর্থাৎ দূরবর্তী এলাকা থেকে ডিজিটাল শ্রম দিয়ে বৈশ্বিক প্রযুক্তিশিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

তামিলনাড়ুর টিএন পলাইয়ম শহরের বাসিন্দা মোহন কুমার এমনই একজন কর্মী। তিনি বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করি, লেবেল দিই এবং এআই মডেলকে শেখাই কোন বস্তু কীভাবে চিনতে হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মডেল নিজে থেকে বিশ্লেষণ করতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গ্রাম বা শহর—কাজের মানে কোনো পার্থক্য নেই। আমরা দূরবর্তী এলাকায় বসেও যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কাজ করছি। দক্ষতা একই, শুধু অবস্থান আলাদা।’

কুমার কাজ করেন চেন্নাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডেসিক্রু-এ। ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান দূরবর্তী এলাকায় ডিজিটাল কর্মসংস্থান তৈরির পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত।

ডেসিক্রুর কাজের মধ্যে রয়েছে সফটওয়্যার টেস্টিং, এআই ট্রেনিং ডেটা তৈরি এবং কনটেন্ট ব্যবস্থাপনা। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ৩০-৪০ শতাংশ অর্ডারই এআই-সম্পর্কিত। ভবিষ্যতে এই হার ৭৫-১০০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

ছোট শহরে বড় প্রযুক্তি

বেঙ্গালুরু ও চেন্নাইয়ের মতো বড় প্রযুক্তি কেন্দ্র ছাড়াও এখন প্রত্যন্ত অঞ্চলে গড়ে উঠছে ডিজিটাল কর্মসংস্থানের নেটওয়ার্ক। ইন্দু নাদারাজন প্রতিদিন গ্রামের আঁকাবাঁকা রাস্তা পেরিয়ে কাছের একটি ছোট শহরে অফিসে যান। সেখানে তিনি সড়কের চিহ্ন, লাইটপোস্ট বা পশুর ছবি লেবেল করেন, যা স্বয়ং-চালিত গাড়ির এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়। তিনি বলেন, ‘অনেকে এআই শিখতে বড় শহরে যায়। কিন্তু আমি গর্বিত, নিজের শহরেই এ কাজ করতে পারছি।’

নাদারাজন কাজ করেন নেক্সওয়েলথ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে। ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান বর্তমানে ভারতের ছোট শহরগুলোতে পাঁচ হাজারের বেশি কর্মী নিয়ে ১১টি অফিস পরিচালনা করছে।

তাদের প্রায় ৭০ শতাংশ অর্ডার আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। তিনি বলেন, ‘চ্যাটজিপিটি থেকে শুরু করে মুখ শনাক্তকরণ সফটওয়্যারসহ সব ধরনের এআই মডেলে মানুষের হাতে লেবেল করা বিপুল ডেটা প্রয়োজন। এটিই ডিজিটাল শ্রমের মূল ভিত্তি।’

এআই বিপ্লবের আলোচনায় আমরা সাধারণত সফটওয়্যার, অ্যালগরিদম বা ডেটা সেন্টারের কথা বলি। কিন্তু বাস্তবে এই বিপ্লবের ভিত্তি তৈরি হচ্ছে মানুষের হাতে। এর বেশির ভাগই শহরের বাইরে, গ্রামাঞ্চলে।

সূত্র: বিবিসি ও এএফপি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত