Ajker Patrika

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মায়াজাল: এআই কি আমাদের অলস করে দিচ্ছে

ব্যবহারকারী যদি বুঝতে না পারেন, এআইয়ের দেওয়া উত্তর সঠিক নাকি ভুল, সেখানেই আসল বিপদ।

হ্যাঙ্ক লি, কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক

পল্লব শাহরিয়ার
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মায়াজাল: এআই কি আমাদের অলস করে দিচ্ছে
প্রতীকী ছবি

কয়েক বছর ধরে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। চ্যাটজিপিটি, ক্লড কিংবা জেমিনির মতো প্রযুক্তি এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। প্রযুক্তির এই জোয়ারে গা ভাসিয়ে দেওয়া যত সহজ, এর আড়ালের বিপদটা থেকে সচেতন থাকাটা ততটাই কঠিন। অতিরিক্ত এআই-নির্ভরতা অজান্তেই আমাদের মগজ অকেজো করে দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে সাম্প্রতিক একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রশ্ন তুলেছে।

এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মানুষের সৃজনশীলতা, মনোযোগ এবং যুক্তি দিয়ে ভাবার ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে—এমনটাই জানাচ্ছে সাম্প্রতিক এক গবেষণা।

তবে টেক্সাস ইউনিভার্সিটির নিউরোসাইকোলজিস্ট জ্যারেড বেঞ্জের মতে, বিষয়টি পুরোপুরি নেতিবাচক নয়। এআই যদি আমাদের বাড়তি কাজের চাপ কমিয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গভীর মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ করে দেয়, তবে তা মস্তিষ্কের জন্য ভালো। মস্তিষ্ক অতীতেও বহু প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে।

■ আমাদের মূল দুশ্চিন্তাটা কী নিয়ে

আজ থেকে ২০ বছর আগে একটা ধারণা ছিল, প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা একধরনের ডিজিটাল ডিমেনশিয়া তৈরি করতে পারে। এর ফলে মানুষের স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিশক্তি এবং অন্যান্য মানসিক কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সম্প্রতি জ্যারেড বেঞ্জ একটি যৌথ গবেষণার (মেটা-অ্যানালাইসিস) সহ-লেখক হিসেবে কাজ করেছেন, যেখানে ৪ লাখ ১১ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর করা ৫৭টি গবেষণা পর্যালোচনা করা হয়। সব মিলিয়ে তিনি ও তাঁর সহ-লেখকেরা ‘ডিজিটাল ডিমেনশিয়া’র পক্ষে কোনো প্রমাণ পাননি। উল্টো দেখা গেছে, প্রযুক্তির ব্যবহার মানুষের মানসিক কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি কিছুটা কমিয়ে এনেছে।

■ তারপরেও ভয় পাওয়ার আছে অনেক কিছু

গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা পথ চেনার জন্য জিপিএসের মতো স্যাটেলাইট নেভিগেশনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করেন, তাঁরা ধীরে ধীরে চারপাশের এলাকার মানচিত্র মাথায় গেঁথে রাখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের স্থানিক স্মৃতিশক্তি কমতে থাকে। সার্চ ইঞ্জিনগুলো যখন আমাদের জীবন দখল করে নিল, তখন ‘গুগল ইফেক্ট’ নামে ঠিক একই ধরনের একটি সমস্যা দেখা দিয়েছিল। কোনো কাজ অন্য কাউকে দিয়ে করিয়ে নেওয়া হলে আমাদের মস্তিষ্ক সেই কাজে দুর্বল হয়ে পড়ে।

তাহলে এআই ব্যবহার করে নিজের মস্তিষ্কের ব্যায়ামও সচল রাখবেন?

■ এআইয়ের কথা বিশ্বাস করবেন না

সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত এআই যাঁরা ব্যবহার করেন, তাঁরা সাধারণ যুক্তিনির্ভর চিন্তার পরীক্ষায় বেশ কম নম্বর পেয়েছেন। মানুষ এমনকি নিজের বুদ্ধিমত্তা এবং সহজাত ধারণার চেয়ে এআই-কে বেশি বিশ্বাস করে—এমনকি যখন এআই ভুল উত্তর দেয়, সেই সময়ও! পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা একে বলছেন ‘কগনিটিভ সারেন্ডার’ বা ‘মানসিক আত্মসমর্পণ’। মাইক্রোসফট রিসার্চের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আপনি যে বিষয়টি ভালো করে জানেন না, সে বিষয়েই আপনার ক্ষতির ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক হ্যাঙ্ক লির মতে, আপনি যদি কোনো অজানা মানুষের কথায় অন্ধবিশ্বাস না করেন, তবে এআইয়ের কথায়ও বিশ্বাস করা উচিত নয়। যেসব বিষয়ে আপনার নিজের বিচারবুদ্ধি খাটানো প্রয়োজন, সেসব ক্ষেত্রে আগে নিজে একটা খসড়া ধারণা তৈরি করুন। এরপর এআই ব্যবহার করুন আপনার সেই ধারণাকে যাচাই বা চ্যালেঞ্জ করার জন্য, তার আগে নয়।

■ সাদা কাগজকে আরও কিছুক্ষণ সাদাই থাকতে দিন

এআই নতুন নতুন আইডিয়া তৈরিতে পারদর্শী। আর এটাই হলো আসল সমস্যা। গবেষণা বলছে, যাঁরা সৃজনশীল কাজের জন্য এআই ব্যবহার করেন, তাঁদের আইডিয়াগুলো বেশ অনুমানযোগ্য এবং খুব একটা মৌলিক নয়। এটি মানুষের সৃজনশীল ক্ষমতা দুর্বল করে দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক অ্যাডাম গ্রিন বলেন, ‘আমাদের মস্তিষ্ক বিভিন্ন অপ্রত্যাশিত বিষয়ের মাঝে সংযোগ তৈরি করে সৃজনশীলতা বাড়ায়।

এই কাজ এআইয়ের হাতে তুলে দিলে মস্তিষ্কের ব্যায়াম মাঠে মারা যায়।’

এই সমস্যা কাটানোর আসল উপায় হলো, আইডিয়াগুলো যতই কাঁচা হোক না কেন, প্রথমে সেগুলো কাগজে লিখে ফেলুন। ফাঁকা কাগজের সামনে কিছুটা সময় কাটান এবং মাথায় যা আসে, তা-ই লিখুন। লেখাটি ভালো হচ্ছে কি না, তা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, আপনার মস্তিষ্ক নিজেই নিজের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি এবং জ্ঞান কাজে লাগিয়ে এমন কিছু তৈরি করছে, যা শুধু আপনার পক্ষেই সম্ভব। এটাই হলো মস্তিষ্কের আসল ব্যায়াম।

■ মনোযোগ দিন

কিছু গবেষণা বলছে, প্রযুক্তির এই জয়জয়কার আমাদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। এআই এই সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ, যেকোনো কঠিন বা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি এড়িয়ে খুব সহজে এখন এক ক্লিকে উত্তর পাওয়া যায়।

তবে এখানেও আগের নিয়মটি খাটাতে পারেন—রোবট ডাকার আগে নিজে একটু কঠিন সমস্যা নিয়ে মাথা খাটান।

■ মানুষের মস্তিষ্কই আসল

অধ্যাপক গ্রিন বলেন, ভবিষ্যতে মানুষের চিন্তাভাবনার ভিন্নতা এবং বৈচিত্র্যই হবে আমাদের বড় সম্পদ। গ্রিনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সমাজে টিকে থাকার তাগিদেই ‘বটের গণ্ডি পেরিয়ে’ অথবা যান্ত্রিকতার বাইরে গিয়ে নিজে চিন্তা করাটা আমাদের একধরনের স্বাভাবিক জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে পরিণত হবে। আর জ্যারেড বেঞ্জ মনে করিয়ে দিয়েছেন, মানুষের মস্তিষ্ক সব সময় নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। এটিই মানবজাতির সবচেয়ে বড় শক্তি। তাঁর প্রশ্ন, গাড়ি আবিষ্কৃত হয়েছে বলে কি মানুষ ম্যারাথনে দৌড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে?

দিনের শেষে প্রযুক্তির হাতিয়ারগুলো হয়তো বদলে যাবে। কিন্তু মানুষের নিজের উদ্যোগে চিন্তা করা, নতুন কিছু সৃষ্টি করা এবং নিজে থেকে কোনো সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার যে তাড়না কিংবা ইচ্ছা, তা রোবট দিয়ে প্রতিস্থাপন করা বা স্বয়ংক্রিয় করা সহজ নয়।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত