Ajker Patrika

পরিবেশগত বিপর্যয়ের প্রশ্নের মুখে ভারতে গুগলের ১৫ বিলিয়ন ডলারের ডেটাসেন্টার প্রকল্প

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২৬, ১৬: ৪৮
পরিবেশগত বিপর্যয়ের প্রশ্নের মুখে ভারতে গুগলের ১৫ বিলিয়ন ডলারের ডেটাসেন্টার প্রকল্প
ছবি: পায়মিন্টস ডট কম

ভারতে গুগলের পরিকল্পিত ডেটাসেন্টার হাব নির্মাণের কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। প্রকল্পস্থলে পাহাড়ের ঢাল ইতিমধ্যে খুঁড়ে লাল মাটির বিস্তীর্ণ অংশ উন্মুক্ত করা হয়েছে এবং সেটিকে ধাপে ধাপে টেরেসের মতো করে সাজানো হয়েছে। তবে পরিবেশবাদীদের ক্রমবর্ধমান বিরোধিতা মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টের ১৫ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের সামনে নানা বাধা তৈরি করছে।

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য অন্ধ্র প্রদেশের সরকারের নেতৃত্বে আছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক মিত্র। তিনি এই প্রকল্পকে ঐতিহাসিক ও রূপান্তরমূলক উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে রাজ্য সরকার, পানির সরবরাহ ও বন্য প্রাণীর ওপর সম্ভাব্য ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করেই প্রকল্পটির অনুমোদন ও বাস্তবায়ন দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

তবে বিরোধিতা ক্রমেই বাড়তে থাকায় ভারতে গুগলের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বিনিয়োগের জন্য প্রাথমিক পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। প্রকল্পের পানি সরবরাহের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব এবং চিতাবাঘ ও বনরুইয়ের আবাসস্থল একটি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যের কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে ইতিমধ্যে একাধিক আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে প্রকল্পটি।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিশাখাপট্টনম শহরে পরিবেশকর্মী ও শিশুরা মিছিল করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত পোস্টে দেখা যায়, তাদের হাতে ছিল ‘আমরা ডেটা (DATA) পান করতে পারি না’ লেখা ব্যানার। কেউ কেউ গুগলের লোগোর ওপর হাতকড়ার ছবি এঁকেছে।

গত রোববার রয়টার্স এক জনসমাবেশে উপস্থিত ছিল। সেখানে পরিবেশকর্মীরা আগামী দিনগুলোতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতা প্রচার এবং সমুদ্রসৈকতে বিক্ষোভ কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা করেন। অলাভজনক সংগঠন গ্রিন বিশাখার প্রতিষ্ঠাতা রাজা রামা মোহন রায় বলেন, ‘মানুষের জীবিকা বিসর্জন দিয়ে উন্নয়ন হওয়া উচিত নয়।’ এ সময় তিনি বিশাখাপট্টনমের চাপে থাকা পানি সরবরাহ ও চাহিদা নিয়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।

সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শহরটি তার জলাধার ও নদীগুলো থেকে প্রতিদিন ৪১০ মিলিয়ন লিটার পানি পায়। বিপরীতে শহরটির দৈনিক প্রয়োজন ৪৮০ মিলিয়ন লিটার। ২৫ লাখ মানুষের এই শহরে পানি সরবরাহে রেশনিং বা নিয়ন্ত্রিত সরবরাহ নিয়মিত ঘটনা।

বিশ্বজুড়েই দ্রুত ডেটাসেন্টার নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বাড়ছে। কারণ সার্ভার ঠান্ডা রাখতে এসব কেন্দ্রে বিপুল পরিমাণ পানি এবং বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে এর সম্ভাব্য প্রভাব আরও প্রকট হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে একই ধরনের উদ্বেগকে কেন্দ্র করে জুলাই মাসে ৪২টি অঙ্গরাজ্যে ১৪২টি বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

রাজ্যের আত্মপক্ষ সমর্থন, অভিযোগ নিষ্পত্তিতে আগ্রহী

গত সোমবার অন্ধ্র প্রদেশের শীর্ষ আদালত পরিবেশবাদী সংগঠন জল বিরাদারি বা ‘ওয়াটার কমিউনিটি’র উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে রাজ্য সরকারকে জবাব দিতে বলেছে। সংগঠনটির অভিযোগ, কাছাকাছি একটি জলাধারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে প্রকল্পটি পানি সরবরাহের ওপর চাপ বাড়াবে।

অন্ধ্র প্রদেশ হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলাটির পরবর্তী শুনানি হবে ২৪ আগস্ট। রয়টার্সকে দেওয়া বিবৃতিতে রাজ্য সরকার বলেছে, প্রকল্পটি নিয়ে পরিবেশকর্মীদের উদ্বেগ ‘ভুল ও বিভ্রান্তিকর’। তবে একই সঙ্গে সরকার জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে মতামত শুনতে প্রস্তুত। রাজ্য সরকার বলেছে, ‘এ ধরনের প্রতিবাদ করা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। এসব দাবির কোনোটি বৈধ হলে সরকার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা এবং উপযুক্ত প্রতিকার দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে গুগল জানিয়েছে, প্রকল্পটি প্রযোজ্য সব আইন মেনে নির্মাণ করা হবে। স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ পানিসম্পদ সুরক্ষিত রাখতে তারা ‘উন্নত এয়ার কুলিং’ প্রযুক্তি ব্যবহার করবে।

সোমবার রয়টার্স যখন প্রকল্পস্থল পরিদর্শন করে, তখন নির্মাণকাজ বেশ জোরেশোরেই চলছিল। উন্মুক্ত করে ফেলা মাটির ওপর তখনো ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ চলছিল।

প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগল এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি নির্মাণের জন্য ভারতীয় ধনকুবের গৌতম আদানির গ্রুপের সঙ্গে অংশীদারত্ব করেছে। প্রকল্পটি সর্বোচ্চ ১ লাখ ৮৮ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি আদানি গ্রুপ।

বন্য প্রাণী ও শব্দদূষণ নিয়ে উদ্বেগ

অন্ধ্র প্রদেশ হাইকোর্টে দায়ের করা জনস্বার্থ মামলায় আরও বলা হয়েছে, ভারী নির্মাণকাজ এবং এর ফলে সৃষ্ট শব্দ মাত্র ৮৬০ মিটার দূরে অবস্থিত কাম্বালাকোন্ডা বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

অভয়ারণ্যের এত কাছাকাছি প্রকল্পের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজ্য সরকার বলেছে, প্রকল্পস্থল আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ন্যূনতম দূরত্বের চেয়েও বেশি দূরে অবস্থিত। গুগল জানিয়েছে, তারা শব্দ কমানোর ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করবে, যাতে ‘আমরা একজন শান্ত ও অনাক্রমণকারী প্রতিবেশী’ হিসেবে থাকতে পারি।

প্রকল্পটি নিয়ে ভারতের পরিবেশবিষয়ক আদালতেও আরও তিনটি মামলা হয়েছে। এসব মামলা করেছে হিউম্যান রাইটস ফোরাম। সংগঠনটি প্রকল্পের কাজ বন্ধের দাবি জানিয়েছে। আদালতের নথি অনুযায়ী তাদের অভিযোগ হলো, একটি গ্রামীণ সুপেয় পানির প্রকল্প থেকে পানি নেওয়ার ফলে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করেই রাজ্য সরকার প্রকল্পটির অনুমোদন দিয়েছে। রাজ্য সরকার অবশ্য জানিয়েছে, আসন্ন ডেটাসেন্টারগুলোর জন্য গ্রামীণ বা আবাসিক ব্যবহারের পানি নেওয়া হবে না। কাছাকাছি থাকা জলাধারটিও ব্যবহার করা হবে না বলে জানিয়েছে তারা।

রোববারের সমাবেশে গ্রিন বিশাখা আরও বলেছে, প্রকল্পটির জন্য ২০ বছর ধরে ‘নিশ্চিত’ পানি সরবরাহের সরকারি প্রতিশ্রুতি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। কারণ শহরটি ইতিমধ্যেই পানির সংকটে ভুগছে। ‘ভুক্তভোগী কারা হবে? মানুষ’—বলেন রাজা রামা মোহন রায়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত