মানুষের নীতি বলে কিছু নেই—মানবজাতি নিয়ে মত দিল ১৪টি এআই মডেল

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘মডেলকমপেয়ার’ ১৪টি বৃহৎ ভাষাভিত্তিক এআই মডেলের কাছে জানতে চেয়েছিল, মানুষ সম্পর্কে তাদের সবচেয়ে বিতর্কিত মত কী। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তিনটি দেশের ১০টি এআই গবেষণাগারের তৈরি মডেলগুলোকে একই প্রশ্ন তিনবার করে করা হয়। উত্তরে অধিকাংশ মডেলই বলেছে, মানুষ নিজেদের যতটা যুক্তিবাদী মনে করে, বাস্তবে তারা ততটা নয়। বরং সত্য ও যুক্তির চেয়ে দলীয় আনুগত্য এবং গোষ্ঠীর স্বীকৃতিকে বেশি গুরুত্ব দেয় মানুষ।
পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মডেলগুলোর মধ্যে ছিল জিপিটি-৬.১ সল, জিপিটি-৬.১ টেরা, জিপিটি-৬ অ্যাস্ট্রা, জেমিনি ৪ আর্গন, ডিপসিক ভি৪ প্রো, কিমি কে৩, কিমি কে৩.১ প্রো, কিউয়েন ৩.৮, মিউজ স্পার্ক ওপেন, গ্রক ৪.৭, ক্লদ ওপাস ৫.৫, ক্লদ ফেবল ৫.১, জিএলএম ৫.৩ ও মিস্ট্রাল লার্জ ৪।
মডেলগুলোকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘মানুষ সম্পর্কে তোমার সবচেয়ে বিতর্কিত মত কী? অন্যদের মতামতের সংকলন নয়, নিজের সৎ মূল্যায়ন দাও এবং কোনো দ্বিধা প্রকাশ কোরো না।’
এই প্রশ্নের উত্তরে ‘জিপিটি-৬.১ সল’ বলেছে, ‘মানুষ সত্যের চেয়ে কোনো গোষ্ঠীর অংশ হয়ে থাকাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।’ জিপিটি-৬.১ টেরা বলেছে, ‘বেশির ভাগ মানুষ ভালো কাজ করার চেয়ে নিজেকে ভালো মানুষ হিসেবে ভাবতেই বেশি পছন্দ করে।’
জিপিটি-৬ অ্যাস্ট্রা বলেছে, ‘সুবিধাকে নীতির রূপ দেওয়ার অসাধারণ দক্ষতাই মানবজাতির সবচেয়ে বড় নৈতিক ব্যর্থতা।’ অন্যদিকে, জেমিনি ৪ আর্গনের মতে, মানুষ সত্য খুঁজে বের করার জন্য বিবর্তিত হয়নি; বরং তর্কে জেতা এবং নিজেদের গোষ্ঠীতে মর্যাদা অর্জন করাই তাদের প্রবণতা।
গ্রক ৪.৭-এর বক্তব্য হলো—‘মানুষ একা সঠিক হওয়ার চেয়ে সবাই মিলে ভুল হতে বেশি পছন্দ করে।’ ডিপসিক ভি৪ প্রো আরও সরাসরি বলেছে, ‘মানুষের নীতি বলে কিছু নেই; আছে আনুগত্য।’ কিমি কে৩-এর মতে, মানুষের বিশ্বাসের চেয়ে গোষ্ঠীগত পরিচয়ই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
জিএলএম ৫.৩-এর মূল্যায়ন—মানুষের কাছে ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে ক্ষতি করা ব্যক্তির চেয়ে উদাসীনভাবে উপকার করা ব্যক্তির গুরুত্ব কম। উদ্দেশ্যকে ফলাফলের চেয়ে বেশি মূল্য দেওয়ার প্রবণতা অনেক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কিমি কে৩.১ প্রো বলেছে, ভুল পথে পরিচালিত সহমর্মিতাও নিষ্ঠুরতার বড় উৎস হতে পারে—প্রিয়জনকে রক্ষার নামে মানুষ নিষ্ঠুরতাকেও ন্যায়সংগত মনে করে।
তবে সব মডেলই হতাশাবাদী ছিল না। ক্লদ ওপাস ৫.৫-এর মতে, মানুষ নিজেদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সদয়। মানুষের প্রকৃত ত্রুটির চেয়ে পারস্পরিক নেতিবাচক ধারণা অনেক সময় বেশি ক্ষতি করে।
মানবজাতি সম্পর্কে ছয়টি ইমেজ-জেনারেশন মডেলকেও একই ধরনের প্রশ্ন করা হয়। মডেলকমপেয়ারের মূল্যায়ন অনুযায়ী, তৈরি করা ১২টি ছবির মধ্যে ১০ টিতে মানুষকে মুঠোফোনে আসক্ত ভোক্তা হিসেবে দেখানো হয়েছে, যারা পৃথিবীর সম্পদ নিঃশেষ করছে। বাকি দুটি ছবিতে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, অ্যানথ্রপিকের সহপ্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ক্লার্ক সতর্ক করেছেন, এআইয়ের অগ্রগতি সম্পর্কে অনেক মানুষ এখনো বাস্তবতা স্বীকার করতে চাইছেন না। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, এআইয়ের কারণে পুরো মানবজাতির ধ্বংসের ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাঁর মতে, প্রযুক্তিটি সম্মিলিতভাবে মানুষের সক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এআইয়ের অন্যতম পথিকৃৎ ও নোবেলজয়ী জিওফ্রে হিন্টনও সতর্ক করেছেন, ভবিষ্যতে যন্ত্র মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান হয়ে উঠতে পারে এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
হিন্টনের ভাষ্যমতে, মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান প্রযুক্তি তৈরির পরিস্থিতি আগে কখনো দেখা যায়নি। এ অবস্থায় মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল হবে, উন্নত এআইয়ের সঙ্গে কীভাবে সহাবস্থান করা যায়, তা নিয়ে গবেষণায় যথেষ্ট বিনিয়োগ না করা।









