Ajker Patrika

শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি, লস অ্যাঞ্জেলেসে মেটা-গুগলকে ৬ মিলিয়ন ডলার জরিমানা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৬, ১৫: ৫৭
শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি, লস অ্যাঞ্জেলেসে মেটা-গুগলকে ৬ মিলিয়ন ডলার জরিমানা
ছবি: সংগৃহীত

শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি তৈরির অভিযোগে মেটা ও ইউটিউবকে ৬ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়েছে। এক তরুণীর করা মামলায় লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি আদালত এই রায় দিয়েছেন। আদালত বলছে, মেটা (ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের মালিক) এবং গুগল (ইউটিউবের মালিক) উদ্দেশ্যমূলকভাবে এমন আসক্তিকর প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যা ২০ বছর বয়সী ওই তরুণীর মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করেছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘কেলি’ নামের ওই তরুণীকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৬০ লাখ মার্কিন ডলার দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন একই ধরনের শত শত মামলার ক্ষেত্রে এই রায় বড় প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে পৃথক বিবৃতিতে মেটা ও গুগল জানিয়েছে, তারা এই রায়ের সঙ্গে একমত নয় এবং আপিল করবে।

মেটা বলেছে, ‘কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য অত্যন্ত জটিল বিষয়, যা কোনো একটি অ্যাপের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা যায় না। প্রতিটি মামলা ভিন্ন প্রকৃতির হওয়ায় আমরা জোরালোভাবে আইনি লড়াই চালিয়ে যাব। অনলাইন সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়ে আমাদের যে রেকর্ড, তাতে আমরা আত্মবিশ্বাসী।’

অন্যদিকে গুগলের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘এই মামলায় ইউটিউবকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ইউটিউব একটি দায়িত্বশীল স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়।’

জুরিরা রায়ে জানান, কেলিকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৩০ লাখ ডলার এবং শাস্তিমূলক ক্ষতিপূরণ (পিউনিটিভ ড্যামেজ) হিসেবে আরও ৩০ লাখ ডলার দিতে হবে। আদালত মনে করেন, মেটা ও গুগল তাদের প্ল্যাটফর্ম পরিচালনার ক্ষেত্রে ‘বিদ্বেষ, দমনমূলক মনোভাব বা জালিয়াতি’র আশ্রয় নিয়েছে। রায়ের মোট জরিমানার ৭০ শতাংশ মেটা এবং বাকি ৩০ শতাংশ গুগলকে পরিশোধ করতে হবে।

পাঁচ সপ্তাহ ধরে চলা এই বিচারের শেষ দিন গতকাল বুধবার আদালতের বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি করা শিশুদের অভিভাবকদের ভিড় দেখা যায়। কেলির মামলার অংশ না হলেও, রায় ঘোষণার পর অ্যামি নেভিলের মতো অনেক অভিভাবককে উল্লাস ও একে অপরকে জড়িয়ে ধরতে দেখা যায়।

এর এক দিন আগেই নিউ মেক্সিকোর একটি আদালত মেটাকে দোষী সাব্যস্ত করেন। সেখানে বলা হয়, মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো শিশুদের যৌন উত্তেজক বিষয়বস্তু এবং যৌন শিকারিদের (সেক্সুয়াল প্রিডেটর) সংস্পর্শে আসার সুযোগ করে দিয়ে তাদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছে।

ফরেস্টার-এর গবেষণা পরিচালক মাইক প্রুলক্স বলেন, পর পর দুটি রায় প্রমাণ করে যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর সঙ্গে জনগণের সম্পর্কের ‘সহ্যের সীমা’ ছাড়িয়ে গেছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা বা সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। যুক্তরাজ্যও ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালাচ্ছে। প্রুলক্স বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি নেতিবাচক ধারণা বছরের পর বছর ধরে বাড়ছিল, যা এখন শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরিত হয়েছে।’

গত ফেব্রুয়ারিতে শুনানির সময় মেটাপ্রধান মার্ক জাকারবার্গ দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের নীতি অনুযায়ী ১৩ বছরের কম বয়সীদের কোনো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের অনুমতি নেই। তবে মেটার অভ্যন্তরীণ নথিতে দেখা যায়, কম বয়সী শিশুরা অ্যাপগুলো ব্যবহার করছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জাকারবার্গ বলেন, তিনি সব সময়ই চেয়েছিলেন এই শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া যেন আরও দ্রুতগতির হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানি সঠিক অবস্থানে পৌঁছেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

এই মামলায় ইউটিউবের মালিক গুগল বিবাদী থাকলেও বিচারের বেশিরভাগ সময় ইনস্টাগ্রাম ও মেটার ওপর আলোকপাত করা হয়। শুরুতে স্ন্যাপচ্যাট ও টিকটকও বিবাদী ছিল, তবে বিচারের আগেই কেলির সঙ্গে তারা অপ্রকাশিত চুক্তিতে পৌঁছায়।

কেলির আইনজীবীরা যুক্তি দেখান, মেটা ও ইউটিউব ‘আসক্তির যন্ত্র’ তৈরি করেছে এবং শিশুদের প্রবেশ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। কেলি জানান, তিনি নয় বছর বয়সে ইনস্টাগ্রাম এবং ছয় বছর বয়সে ইউটিউব ব্যবহার শুরু করেন, কিন্তু বয়সজনিত কারণ দেখিয়ে কেউ তাঁকে বাধা দেয়নি।

নিজের সাক্ষ্যে কেলি আরও বলেন, ‘পরিবারের সঙ্গে আমার যোগাযোগ কমে গিয়েছিল, কারণ আমার বেশিরভাগ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই কাটত।’

কেলি বলতে থাকেন, ১০ বছর বয়স থেকেই তিনি বিষণ্নতা ও দুশ্চিন্তায় ভুগছিলেন, যা পরে চিকিৎসকের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়। এ ছাড়া তিনি নিজের শারীরিক গঠন নিয়েও হীনম্মন্যতায় ভুগতেন। ইনস্টাগ্রামের ফিল্টার ব্যবহার করে নিজের নাক ছোট করা বা চোখ বড় করার চেষ্টায় মত্ত থাকতেন তিনি।

পরবর্তীতে তাঁর শরীরে ‘বডি ডিসমরফিয়া’ ধরা পড়ে। এটি এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের শারীরিক ত্রুটি নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করেন এবং অন্যেরা তাঁকে যেভাবে দেখে, তিনি নিজেকে সেভাবে দেখতে পারেন না।

কেলির আইনজীবীরা বলেন, ইনস্টাগ্রামের ‘ইনফিনিট স্ক্রল’ (টানা স্ক্রল করার সুবিধা) আসক্তি তৈরির জন্যই নকশা করা হয়েছে। তাঁরা অভিযোগ করেন, মেটা তরুণ ব্যবহারকারীদের বেশি প্রাধান্য দেয় কারণ তারা দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে যুক্ত থাকে।

ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরিকে কেলির আইনজীবীরা যখন জানান যে কেলি এক দিনে সর্বোচ্চ ১৬ ঘণ্টা অ্যাপটি ব্যবহার করেছেন, তিনি একে আসক্তি বলতে নারাজ ছিলেন। তবে দিনভর কিশোর-কিশোরীদের ইনস্টাগ্রামে পড়ে থাকাকে ‘সমস্যাজনক’ বলে স্বীকার করেন তিনি।

কেলির আইনজীবীরা বলেন, এই রায় একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে শিশুদের সুরক্ষার প্রশ্নে কোনো কোম্পানিই জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়।

আগামী জুনে ক্যালিফোর্নিয়ার ফেডারেল আদালতে মেটা ও অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে একই ধরনের আরও একটি মামলার বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত