
ফুটবলে কিছু বিদায় থাকে, যা কেবল একজন কোচ বা খেলোয়াড়ের প্রস্থান নয়—একটি সময়ের সমাপ্তি। পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটি অধ্যায়ের শেষটাও তেমনই। দশ বছর আগে তিনি যখন ইংল্যান্ডে পা রেখেছিলেন, তখন ম্যানচেস্টার সিটির ছিল ধনী, উচ্চাভিলাষী একটি ক্লাব; সাফল্য ছিল, সামর্থ্যও ছিল। কিন্তু ছিল না কোনো চিরস্থায়ী ফুটবল পরিচয়।
গার্দিওলা এসে সেই পরিচয় গড়ে দিলেন ম্যানসিটিকে। শুধু একটি দল নয়, তিনি গড়ে তুললেন একটি দর্শন, একটি সংস্কৃতি, একটি আধিপত্যের যুগ। অবশেষে সেই যুগের সমাপ্তি হলো। দশ বছরের অবিশ্বাস্য সাফল্য, অসংখ্য ট্রফি, আধিপত্য, নান্দনিক ফুটবল আর বিপ্লবী কৌশলের গল্প শেষে গার্দিওলা সরে দাঁড়ালেন ম্যানসিটির কোচের পদ থেকে। শুক্রবার ইংলিশ ক্লাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, চলতি মৌসুমের শেষ ম্যাচের পরই বিদায় নিচ্ছেন গার্দিওলা। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার এক বছর আগেই ইতিহাদ ছাড়ছেন তিনি।
২০১৬ সালে গার্দিওলা ইংল্যান্ডে পা রাখার সময়ই পরিষ্কার ছিল—এটি কেবল আরেকজন কোচের আগমন নয়। বার্সেলোনা ও বায়ার্ন মিউনিখে সফল দুটি অধ্যায় শেষে তিনি এসেছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত কোচ হিসেবে। কিন্তু কেউ হয়তো তখনো ভাবেনি, পরবর্তী এক দশকে তিনি শুধু ম্যানসিটিকেই বদলে দেবেন না, বদলে দেবেন পুরো ইংলিশ ফুটবলের ভাষা।
সাফল্যের এমন সাম্রাজ্য আগে দেখেনি সিটি
গার্দিওলার অধীনে সিটি হয়ে ওঠে এক দুর্দান্ত জয়যন্ত্র। তাঁর ১০ বছরের কোচিংয়ে ২০টি শিরোপা জিতেছে সিটিজেনরা। এর মধ্যে রয়েছে ছয়টি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা। ২০২১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত টানা চারবার লিগ জিতে গড়েছে নজিরবিহীন ইতিহাস। তবে ম্যানসিটিতে গার্দিওলার সেরা সময় নিঃসন্দেহে ২০২৩ সাল। সেই বছর তিনি ম্যানসিটিকে এনে দেন ক্লাব ইতিহাসের প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা। একই মৌসুমে জেতেন প্রিমিয়ার লিগ ও এফএ কাপও। বার্সেলোনার পর সিটিতেও পূর্ণ করেন ঐতিহাসিক ট্রেবল। ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসে দ্বিতীয় দল হিসেবে ট্রেবল জিতেছে ম্যানসিটি। প্রথম দল হিসেবে ১৯৯৯ সালে ট্রেবল জিতেছিল ম্যানসিটির নগর প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড।

কীভাবে বদলে দিলেন ম্যানচেস্টার সিটিকে?
গার্দিওলার সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর দর্শন। বল দখলে রেখে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে ফেলা, রক্ষণভাগ থেকে ধৈর্য ধরে আক্রমণ তৈরি করা, প্রতিটি খেলোয়াড়কে নির্দিষ্ট কৌশলগত দায়িত্বে ব্যবহার করা—এসব ছিল তাঁর ফুটবলের মূল ভিত্তি। ইংল্যান্ডের দ্রুতগতির, শারীরিক ফুটবলের সংস্কৃতিতে তিনি নিয়ে আসেন নিয়ন্ত্রিত, ছন্দময়, বুদ্ধিদীপ্ত এক খেলার ধরণ। গার্দিওলার সবচেয়ে বড় বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল ২০২২ মৌসুমে কোনো স্বীকৃত সেন্টার-ফরোয়ার্ড ছাড়াই প্রিমিয়ার লিগ জয়। প্রচলিত ধারণা ভেঙে তিনি দেখিয়ে দেন কৌশল এবং পজিশনাল ফুটবল দিয়েও আধিপত্য তৈরি করা যায়।
শুধু তাই নয়, খেলোয়াড়দের অচেনা ভূমিকায় ব্যবহারেও গার্দিওলা ছিলেন অসাধারণ। ডিফেন্ডারকে মিডফিল্ডে, মিডফিল্ডারকে ফলস নাইন হিসেবে কিংবা ফুলব্যাককে ইনভার্টেড মিডফিল্ডারের ভূমিকায় খেলানো—এসব এখন আধুনিক ফুটবলের স্বাভাবিক অংশ। এর বড় পথপ্রদর্শক ছিলেন গার্দিওলাই।
ক্লপের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা: প্রিমিয়ার লিগের সোনালি অধ্যায়
ইয়ুর্গেন ক্লপের লিভারপুলের সঙ্গে গার্দিওলার সিটির লড়াই ছিল আধুনিক প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম সেরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ক্লপের ‘হেভি-মেটাল ফুটবল’ এবং গার্দিওলার পজিশনাল আধিপত্য—দুটি বিপরীত দর্শনের সংঘর্ষ ফুটবলপ্রেমীদের উপহার দিয়েছে অসংখ্য স্মরণীয় ম্যাচ। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাই সিটিকে আরও নিখুঁত হতে সাহায্য করেছে। সম্ভবত এ কারণেই গার্দিওলার ম্যানসিটিকে অনেকেই প্রিমিয়ার লিগ ইতিহাসের সেরা দলগুলোর একটি মনে করেন।
শুধু ট্রফি নয়, তৈরি করেছেন নতুন প্রজন্মও
গার্দিওলার প্রভাব কেবল মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। মিকেল আর্তেতা ম্যানসিটিতে তাঁর সহকারী হিসেবেই প্রথম সিনিয়র কোচিংয়ের সুযোগ পান। আর্তেতার হাত ধরে এবার প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জিতেছে আর্সেনাল। এনজো মারেসকাকে গার্দিওলার সম্ভাব্য উত্তরসূরি ভাবা হচ্ছে। মারেসকাও ছিলেন তাঁর কোচিং স্টাফের সদস্য। সাবেক সিটি অধিনায়ক ভিনসেন্ট কোম্পানি এখন সফলভাবে বায়ার্নের প্রধান কোচের ভূমিকায় আছেন। এ ছাড়া নামকরা কোচদের মধ্যে জাবি আলোনসোও গার্দিওলার অধীনে কাজ করেছেন; বায়ার্নে। অর্থাৎ গার্দিওলা শুধু দল তৈরি করেননি—তৈরি করেছেন নতুন এক কোচিং প্রজন্মও।

মাঠের বাইরের গার্দিওলা
টাচলাইনে গার্দিওলা ছিলেন আবেগী, উচ্ছ্বসিত, কখনো অস্থির এক চরিত্র। প্রতিটি ম্যাচ যেন তিনি নিজের শরীর দিয়ে খেলতেন। মাঠের বাইরেও গার্দিওলা ছিলেন স্পষ্টভাষী। কাতালান স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে গাজা যুদ্ধ—বিভিন্ন রাজনৈতিক ও মানবিক ইস্যুতে সরব হয়েছেন তিনি। এই কোচের ভাষায়, ‘একটি ভালো সমাজ গঠনের জন্য কথা বলা জরুরি।’ ২০১৮ সালে কাতালান স্বাধীনতাকামী নেতাদের সমর্থনে হলুদ ফিতা পরায় জরিমানাও গুনতে হয়েছিল তাকে। চলতি বছরের শুরুতে বার্সেলোনায় ফিলিস্তিনপন্থী এক অনুষ্ঠানে কেফিয়েহ পরে আবেগঘন বক্তৃতাও দেন গার্দিওলা।
ক্রুইফের ছায়া, কিন্তু নিজস্ব আলো
গার্দিওলার সবচেয়ে বড় প্রেরণা ছিলেন প্রয়াত ডাচ কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুইফ। তিনি যেমন আয়াক্স ও বার্সেলোনার ফুটবল দর্শন বদলে দিয়েছিলেন, তেমনি গার্দিওলাও বদলে দিয়েছেন ম্যানচেস্টার সিটি এবং পুরো ইংলিশ ফুটবলের চিন্তাভাবনা। তবে নিজেকে কখনো ক্রুইফের সমকক্ষ ভাবেন না তিনি। গার্দিওলা বলেছিলেন, ‘ক্রুইফের মতো কেউ নেই। আপনি এমন তুলনা করায় এটা অবশ্যই বড় প্রশংসা, কিন্তু তার মতো কেউ হতে পারে না—তার ক্যারিশমা, ব্যক্তিত্ব ছিল অনন্য। একজন খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে তিনি দুটি ক্লাবের মানসিকতা বদলে দিয়েছেন—অ্যাজাক্স এবং বার্সেলোনা। এমন ক্যারিশমা অনুকরণ করা অসম্ভব।’
বিদায়, কিন্তু শেষ নয়
গার্দিওলা যখন ইতিহাদ ছাড়ছেন, তখনো ম্যানসিটির বিরুদ্ধে প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক নিয়ম ভঙ্গের শতাধিক অভিযোগের রায় বাকি। এই ইস্যুতে ক্লাব মালিকদের সব সময় জোরালোভাবে সমর্থন করেছেন তিনি। তবে চূড়ান্ত রায় ঘোষণার সময় আর দায়িত্বে থাকবেন না। চলতি মৌসুমে আর্সনালের কাছে শিরোপা হারিয়ে বিদায় হলেও গার্দিওলার উত্তরাধিকার অমলিন। কারণ তিনি শুধু ট্রফি জেতেননি। তিনি ফুটবলকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছেন। এ জন্যই গার্দিওলা শুধু ম্যানসিটির ইতিহাসের সেরা কোচ নন—আধুনিক ফুটবলেরই এক নতুন স্থপতি।

বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের দায়িত্ব নিয়ে নিজের ফুটবল দর্শন, লক্ষ্য ও খেলোয়াড়দের মানসিকতা পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন প্রধান কোচ টমাস ডুলি। আজ ঢাকায় রাজধানীর এক পাঁচ তারকা হোটেলে কুল-বিএসপিএ পুরস্কারের মঞ্চে কোচকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।
২ ঘণ্টা আগে
ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলে নেইমারের নাম ঘোষণার পর থেকেই উচ্ছ্বাসে ভাসছিলেন সমর্থকেরা। দীর্ঘদিন চোটের কারণে মাঠের বাইরে থাকার পর আবারও জাতীয় দলের জার্সিতে এই ফরোয়ার্ডকে দেখার অপেক্ষায় ছিলেন ভক্তরা। বিশেষ করে, বিশ্বকাপকে সামনে রেখে নেইমারের ফেরাটা ব্রাজিলের জন্য বড় সুখবর হিসেবেই দেখা হচ্ছিল।
৩ ঘণ্টা আগে
২০২৫-২৬ মৌসুম শেষে পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটি ছাড়ার আলোচনা শোনা যাচ্ছিল অনেক দিন ধরেই। অবশেষে ক্লাব আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিল তাঁর ক্লাব ছাড়ার দিনক্ষণ। চলতি মৌসুম শেষেই সিটি ছাড়ছেন এই কিংবদন্তি।
৩ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকোতে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপকে সামনে রেখে দল ঘোষণা করেছেন ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেল। শুক্রবার ঘোষিত এই দলে জায়গা হয়নি কোল পালমার, ফিল ফোডেন ও ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার-আর্নল্ডের মতো তারকাদের। অন্যদিকে চমক হিসেবে দলে ফিরেছেন সৌদি আরবের ক্লাব আল আহলিতে খেলা স্ট্রাইকার ইভান টনি।
৪ ঘণ্টা আগে