Ajker Patrika

স্রোতের বিপরীতে হেঁটে স্পেনের বিশ্বজয়ের নায়ক তোরেস

আনোয়ার সোহাগ, ঢাকা
আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ০৫: ০৪
স্রোতের বিপরীতে হেঁটে স্পেনের বিশ্বজয়ের নায়ক তোরেস
বিশ্বকাপে জয়সূচক গোলের পর তোরেসের উচ্ছ্বাস। ছবি: এএফপি

১০ বছর আগে অক্টোবরের সেই ম্যাচের কথা এখন আর কারও মনে থাকার কথা নয়। স্পেনের তৃতীয় স্তরের লিগে মায়োর্কা বির বিপক্ষে ২-০ গোলে হেরেছিল মেস্তায়া। সেই ম্যাচে ভ্যালেন্সিয়ার হয়ে অভিষেক হয়েছিল ১৬ বছর বয়সী এক লাজুক কিশোরের। বছরখানেক পর যখন সেই কিশোর বিশ্ব ফুটবলের চেনা মুখ, তখন তাঁর এক তৎকালীন সতীর্থ হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘সত্যি বলতে ও সেদিন কেমন খেলেছিল, আমার মনেই নেই। আমাদের সঙ্গে তো সে আলাদা করে কোনো নজরই কাড়েনি।’

ফুটবল রূপকথার চেনা ছক ভেঙে এভাবেই শুরু হয়েছিল ফেরান তোরেসের যাত্রা। অথচ এক দশক পর, ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই অবহেলিত কিশোরই স্পেনের সোনালি ট্রফি জয়ের মহানায়ক।

স্পেনের ফইওস শহরে জন্ম নেওয়া তোরেস মাত্র ছয় বছর বয়সে ভ্যালেন্সিয়ার একাডেমিতে যোগ দিয়েছিলেন। ২০০৮ সালে ভ্যালেন্সিয়ার কোপা দেল রে জয়ের রাতে গ্যালারিতে বসে পতাকা ওড়ানো সেই খুদে সমর্থকটিই যে একদিন ক্লাবের মূল দলের চালিকাশক্তি হবেন, তা অনেকেই ভাবেননি। ভ্যালেন্সিয়ার ঐতিহ্যবাহী একাডেমি থেকে জর্দি আলবা, ইসকো কিংবা তোরেসের শৈশবের আদর্শ ডেভিড সিলভাদের মতো তারকারা উঠে এসেছেন। তোরেসও দ্রুততম সময়ে ভ্যালেন্সিয়ার মূল দলে জায়গা করে নিয়েছিলেন, বনে গিয়েছিলেন এই শতাব্দীতে জন্ম নেওয়া লা লিগার প্রথম খেলোয়াড়। কিন্তু ঘরের ছেলের বিদায়টা মোটেও রূপকথার মতো সুখকর ছিল না। ক্লাবের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, তৎকালীন অধিনায়কের সঙ্গে দূরত্বের গুঞ্জন আর নিজেকে খলনায়ক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টার বিরুদ্ধে একাই লড়াই করতে হয়েছিল তাঁকে। মাত্র ২০ বছর বয়সে ৯৭টি ম্যাচ খেলে যখন ভ্যালেন্সিয়া ছাড়েন, তখন তাঁর মনে ছিল একরাশ ক্ষোভ ও অভিমান। তবে তোরেস ও তাঁর বোনের গোড়ালিতে আঁকা একটি ট্যাটু যেন তাঁর জীবনের মূল মন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল—‘আই রিফিউজ টু সিঙ্ক’ অর্থাৎ আমি ডুবে যেতে রাজি নই।

ভ্যালেন্সিয়া থেকে ম্যানচেস্টার সিটিতে পেপ গুয়ার্দিওলার জহুরি চোখ, আর পরবর্তী সময়ে বার্সেলোনায় ফেরা—প্রতিটি ধাপেই তোরেসকে প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রমাণ করতে হয়েছে। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা রূপান্তরটি ঘটেছে জাতীয় দলের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের জাদুকরি স্পর্শে। অনূর্ধ্ব-১৮ থেকে শুরু করে অনূর্ধ্ব-২১ দল পর্যন্ত তোরেসকে কোচিং করানো দে লা ফুয়েন্তে খুব ভালো করেই জানতেন এই ফরোয়ার্ডের অন্তর্নিহিত শক্তি। স্প্যানিশ ফুটবলের আলো যখন অন্য তারকাদের ওপর গিয়ে পড়ে, তখন তোরেস আড়ালে থেকে নিজের কাজটা করে যান। উইং ধরে গতিশীল দৌড় কিংবা বক্সের ভেতর নিখুঁত ফিনিশিং—সবখানেই তিনি অনন্য। মাঠের বাইরে সতীর্থদের জন্য নিঃস্বার্থ ফুটবল খেলা এই ফরোয়ার্ড ২০২০ সালে জার্মানির ম্যানুয়েল নয়্যারের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন।

কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল তোরেসকে এনে দিল অমরত্ব। বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে যখন পুরো স্টেডিয়াম স্নায়ুচাপে কাঁপছিল, ঠিক তখনই জ্বলে উঠলেন তিনি। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার মাত্র ৩৭ সেকেন্ডের মাথায় পেদ্রো পোরোর দূরপাল্লার ক্রস থেকে নিকো উইলিয়ামসের হেডে বল পেয়ে বক্সের ভেতর চিলের মতো ক্ষিপ্রতায় হাজির হন তোরেস। এক দুর্দান্ত ও জোরালো শটে বল জালে জড়িয়ে স্তব্ধ করে দেন পুরো আর্জেন্টাইন রক্ষণভাগকে। এই একটি গোলই স্পেনের ফুটবলে যোগ করল বিশ্বজয়ের নতুন মহাকাব্য। প্রতিকূলতা আর অবহেলার স্রোত ঠেলে উঠে আসা ২৬ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডের নাম স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে চিরকাল।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত