ভালো নেই বাংলাদেশের সাফজয়ী অধিনায়ক রজনীকান্ত

গাজীপুরের মাওনা চৌরাস্তা বাসস্ট্যান্ড থেকে বাঁয়ে মোড় নিলেই মাওনা-কালিয়াকৈর সড়ক। গাঢ় সবুজ শালবনের বুক চিরে চলে যাওয়া এই সড়ক নিয়ে আজকের পত্রিকার শ্রীপুর প্রতিনিধি রাতুল মন্ডল দিলেন আঁতকে ওঠার মতো খবর। জানালেন, এই সড়কে রাতে হয় ডাকাতি, দিনে নিয়মিত দুর্ঘটনা! গত শুক্রবার বৃষ্টিস্নাত দুপুরে এই ‘বিপজ্জনক’ সড়ক ধরে যাচ্ছি গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের পিঙ্গাবহ গ্রামে। যে গ্রামে নিভৃত বাস ২০০৩ সাফজয়ী বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক রজনীকান্ত বর্মনের।
বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্জন ২০০৩ সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জয়। প্রয়াত অস্ট্রিয়ান কোচ জর্জ কোটানের অধীনে ‘দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বকাপ’ জিতেছিল বাংলাদেশ। এরপর ২৩টি বছর কেটে গেছে, বাংলাদেশের আর জেতা হয়নি মর্যাদাপূর্ণ শিরোপাটি। সাফ এলেই দেশের ফুটবল-সমর্থকদের স্মৃতিতে দোলা দেয় ২০০৩ সাফ। আর মনে পড়ে সেই দলের দুর্দান্ত খেলা ফুটবলারদের। সবার আগে যাঁর নাম আসবে, তিনি অধিনায়ক রজনীকান্ত বর্মন। পুরো টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ দলের রক্ষণ বুক পেতে সামলেছিলেন রজনী। দুই হলুদ কার্ডের খড়্গে ফাইনালে না খেলা হলেও টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছিলেন তিনিই। ১৯৯৯ সালে নেপালের কাঠমান্ডুতে সাফ গেমস চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ, সে দলের সদস্যও ছিলেন তিনি।
দেশের মাঠে কদিন পর শুরু হচ্ছে আরেকটি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। সেই টুর্নামেন্টের আগে গাজীপুরের নিভৃত এক গ্রামে রজনীকে খুঁজতে গিয়ে করুণ এক ছবি চোখে পড়ল। পিঙ্গাবহ গ্রামে ঢুকতেই পাড়া-প্রতিবেশীরা বড় আগ্রহ নিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছিলেন, ‘ওই যে রজনীদার বাড়ি।’ ভরদুপুরে বারান্দায় দেয়ালে হেলান দিয়ে খালি গায়ে মাদুরে বসে থাকা রজনী হঠাৎ আগত অতিথি দেখে কষ্টেসৃষ্টে উঠে দাঁড়ালেন। উঠানের ছাউনিতে বসতে বলে ভেতরে গেলেন পোশাক বদলাতে। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এলেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।
কেমন আছেন—প্রশ্নটা শুনে মুখে তাঁর মৃদু, কৃত্রিম হাসি। হাসিতে আড়াল হচ্ছে না যন্ত্রণাক্লিষ্ট চেহারাটা। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলেন, ‘আছি। জীবনটা শুয়ে-বসে কাটে আরকি। হাঁটতে পারি না। বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারি না। কোথাও যেতে পারি না। কোথাও যেতে না পারলে কিছু করব কী করে? আর না করলে আয়ের উৎস তৈরি হবে কী করে? আয়ের উৎস যদি না থাকে, বাড়িতে বসে বসে কি খাওয়া যায়? অথচ সেটাই করতে হচ্ছে!’ একটু থেমে রজনী যোগ করেন, ‘বুকভরা যন্ত্রণা, যা মানুষকে বলতে পারি না। নিজের কষ্ট নিজের মনেই রাখি।’

সংক্ষেপে তুলে ধরলেন তাঁর যাপিত জীবনের সারমর্ম। খেলোয়াড়ি জীবন থেকে রজনীকান্ত অন্তর্মুখী স্বভাবের। এখন যেন আরও নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। বছর পাঁচেক আগে তাঁর জীবনে যে ট্র্যাজেডি নেমে আসে, সেটি থেকে এখনো বের হতে পারেননি। ভারতের হুগলি জেলায় শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে গিয়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন। দীর্ঘ চিকিৎসায় পা কেটে না ফেলতে হলেও অনেকটা পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে তাঁকে। দুর্ঘটনার কিছুদিন পর হারিয়েছেন স্ত্রীকেও। তাঁর দুই মেয়ে থাকেন ভারতেই, নানাবাড়িতে। চাকরি কিংবা পড়াশোনার ফাঁকে ছুটিতে মাঝেমধ্যে মেয়েরা বাংলাদেশে এসে দেখে যান বাবাকে।
২০২৩ সালের শুরুর দিকে রজনীর এই করুণ পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ৩০ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র তুলে দেয়। সঞ্চয়পত্র থেকে প্রতি মাসে পাওয়া মুনাফা দিয়েই চলছে রজনীর সংসার। টাকাটা কিছুটা সহায়ক হলেও তাতে যে পাঁচজনের সংসার ভালোভাবে চলা কঠিন। কঠিন হলেও রজনী কারও কাছে মন খুলে নিজের যাতনার কথা বলতে চান না। জানালেন, তাঁর কঠিন পরিস্থিতি নিয়ে অবগত সাবেক দুই ফুটবলার ইমতিয়াজ আহমেদ নকীব ও মঞ্জুরুল করিম মঞ্জুর সহায়তায় কদিন আগে ফোনে কথা হয়েছে একসময়ের সতীর্থ-বন্ধু বর্তমানে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের সঙ্গে।
কুশলাদি জিজ্ঞেস করে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী নাকি রজনীর কাছে জানতে চেয়েছেন, কীভাবে তাঁকে সহায়তা করতে পারেন। কী ধরনের সহায়তা দরকার, সংকোচে রজনী তাৎক্ষণিকভাবে কিছু বলতে পারেননি। কিছুটা সময় নিয়েছেন। নকীব-মঞ্জু চেষ্টা করছেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে রজনীকে আর্থিক সহায়তা করা যায় কি না। কিন্তু ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) কি কখনো দাঁড়িয়েছে পাশে? কিংবা যে ক্লাবগুলোর হয়ে খেলেছেন, তারা কি কোনো সহায়তা করেছে? রজনীর সংক্ষিপ্ত উত্তর, ‘না।’
জীবনে এতটাই অসহায়ত্ব পেয়ে বসেছে, রজনী দেশের ফুটবলের সঙ্গে প্রায় বিচ্ছিন্ন। বললেন, ‘নিজেকে সব সময় আড়াল করে রেখেছি। দুর্ঘটনার পর তো আরও বেশি আড়াল হয়ে গেছি।’ তবে ফুটবল নিয়ে এখনো আগ্রহ তাঁর যথেষ্ট। বললেন, ‘ফুটবল নিয়ে আগ্রহ থাকবে না কেন? এই ফুটবল আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। ফুটবল নিয়ে আমার আক্ষেপ নেই, অভিমান নেই। অভিমান যা আছে নিজেকে নিয়ে।’
২৩ বছর আগের সাফ নিয়ে স্মৃতি রোমন্থন করতেই চিকচিক করে ওঠে তাঁর চোখ। কার্ড খড়্গে যখন ফাইনাল খেলতে পারলেন না, অশ্রুসিক্ত হয়ে বন্ধু হাসান আল মামুনের (বর্তমানে জাতীয় দলের সহকারী কোচ) হাতে আর্মব্যান্ড দিয়ে কী বলেছিলেন, রজনীর কাছ থেকেই শোনা যাক, ‘দল ঘোষণার পরে জর্জ কোটান বললেন আর্মব্যান্ড হাসান আল মামুনকে তুলে দিতে। তুলে দিয়ে বলেছিলাম, দেশের ভার কিন্তু তোর ওপরে দিলাম। বলতে গিয়ে কেঁদেই দিয়েছিলাম।’
রজনীকে না পেয়ে বড় ধাক্কা খেলেও বাংলাদেশ দল যেন তাতে আরও বেশি উজ্জীবিত হয়ে চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞায় সর্বোচ্চটা উজাড় করে দিয়েছিল। ফাইনাল না খেলতে পারার দুঃখ থাকলেও টুর্নামেন্টসেরার পুরস্কার জয় এখনো তাঁকে আপ্লুত করে, ‘খেলতে পারিনি, তবু টুর্নামেন্টের সেরা হয়েছিলাম। অথচ আমি স্ট্রাইকার বা গোল করার খেলোয়াড় না।’
ঘরের মাঠে হতে যাচ্ছে আরেকটি সাফ। এখনকার দলে স্থানীয় অভিজ্ঞ খেলোয়াড়েরা যেমন আছেন, যুক্ত হয়েছেন হামজা চৌধুরী-শমিত সোমদের মতো প্রবাসী ফুটবলার। দলকে নিয়ে যথেষ্ট আশাবাদী রজনী, ‘অবশ্যই আশাবাদী যে এবার চ্যাম্পিয়ন হতে পারি। এবার চ্যাম্পিয়ন হওয়া উচিত। এবারে যেহেতু নিজের মাঠে খেলা, নিজের দর্শক, সাপোর্ট—সবই পাবে। কিন্তু সাহস রাখতে হবে। একটা শিরোপা দরকার আমাদের। শিরোপা না জিতলে যতই চিল্লাচিল্লি করেন, মানুষ তা বুঝবে না। মানুষ চায় সাফল্য। যদি চ্যাম্পিয়ন হয়, দর্শকদের আবার ফুটবলে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে। নতুন প্রজন্ম অনুপ্রাণিত হবে। ভালো ভালো খেলোয়াড় তৈরি হবে।’
দুর্ঘটনার পর বাফুফে সেভাবে খোঁজ নেয়নি রজনীর। বিশেষ কোনো আয়োজনে সম্মানিতও করেনি। যদি সাফে এবার টিকিট দেওয়া হয়, মাঠে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, যাবেন? অভিমান ভুলে সংশয় মাখা কণ্ঠে রজনী বলেন, ‘হাঁটতে পারি না, কোথাও দীর্ঘক্ষণ বসেও থাকতে পারি না। তবু যদি টিকিট পাই...।’
রজনী উঠে দাঁড়ান। আমাদের একটু অপেক্ষা করতে বলে পা টেনে টেনে ঘরের ভেতরে যান। কিছুক্ষণ পর ২০০৩ সাফের সেরা হওয়ার পুরস্কারটা নিয়ে বারান্দায় আসেন। পুরস্কারে জমে যাওয়া ধুলো পরিষ্কার করেন গামছা দিয়ে। রোদেলা দুপুরে চকচক করতে থাকা ওজনদার পুরস্কারটা দুই হাতে তুলে ধরেন। সাফল্যের স্মারক দেখিয়ে জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে পড়া রজনীকান্ত বর্মনের মুখে ক্ষণিকের জন্য খেলে যায় গর্বের হাসি।
রজনীর বিবর্ণ জীবন দেখে তাঁর বাড়ি থেকে বের হতেই প্রতিবেশীদের একটা অনুরোধ কানে আসে, ‘বাড়ির সামনের এই রাস্তাটা নিয়েও একটু লেইখেন। বৃষ্টি হলে সুস্থ মানুষই এখানে হাঁটতে পারে না, জরুরি পরিস্থিতিতে দাদার কী অবস্থা হয়, ভাইবা লন!’
কালিয়াকৈরের পিঙ্গাবহ গ্রাম থেকে ঢাকায় ফেরার পথে রজনীকান্ত বর্মনকে নিয়ে একটা কথাই যেন মনে হতে থাকে—আহা রে জীবন!









