
প্রতিদিনের মতো আজও পূর্বাকাশে সূর্য উঠবে। প্রাতরাশ সেরে আজও অফিসমুখী হবে আর্জেন্টিনার মানুষ। বুয়েনস এইরেস, কর্দোবা, মেন্দোসা, লা প্লাতা কিংবা রোজারিওর মানুষ নিত্যদিনের মতো নিয়ম মেনে দিন শেষে ঘুমাতে যাবে। তবে অন্য সব দিনের চেয়ে এদিনের প্রার্থক্য—মেসি আর আর্জেন্টিনা দলে নেই, এমন একটা হতাশা নিয়ে ঘুমাতে যাবেন আর্জেন্টাইনরা।
একটা সময় ছিল, আর্জেন্টিনা জানতই না যে তার সবচেয়ে বড় প্রেমিক কত দূরে বসে জাতীয় দলের স্বপ্ন দেখছে। বার্সেলোনার লা মাসিয়ায় তখন ছোট্ট এক আর্জেন্টাইন ছেলের পায়ে ফুটবল কথা বলে। স্পেন তাকে নিজেদের করে নিতে চায়। কিন্তু ছেলেটির স্বপ্নে স্পেন ছিল না। ছিল আকাশি-সাদা জার্সি। ছিল আর্জেন্টিনা।
সেই ছেলেটি লিওনেল মেসি। সেই গল্পের শেষ অধ্যায় শেষ হয়ে যাবে পাঠকেরা যখন এই লেখা পড়বেন, তার আগেই। তিনি ২০ বছরের সম্পর্কের ইতি টেনে আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নেমেছেন। আর্জেন্টিনা দলের সঙ্গে তাঁর এমন এক সম্পর্ক, যার শুরুটা ছিল একতরফা ভালোবাসার মতো। মাঝে ছিল অভিমান, অপমান, কান্না ও বিচ্ছেদ। আর শেষ পর্যন্ত সেটিই হয়ে উঠেছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর ভালোবাসার গল্পগুলোর একটি।
স্পেন যখন মেসিকে নিজেদের যুব দলে পাওয়ার চেষ্টা করছিল, তখন মেসির বাবা হোর্হে দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন ছেলের দুটি স্বপ্নের কথা—এক. বার্সেলোনার মূল দলে খেলা; দুই. আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের জার্সি পরা। তখনো আর্জেন্টিনা জানত না, তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে।
২০০৩ সালে লা মাসিয়ার এক প্রতিভাবান ছোট্ট ছেলের কথা আর্জেন্টিনার যুব দলের কোচিং স্টাফের কানে পৌঁছেছিল। ভিডিওতে তার খেলা দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন অনেকেই—এত দ্রুত ড্রিবল করা যায়! কীভাবে সম্ভব! কিন্তু আর্জেন্টিনার বয়সভিত্তিক দলে তবু ডাক আসেনি। সুযোগ হয়নি। এমনকি ২০০৩ সালের অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে স্পেনের কাছে ৩-২ গোলে হারের পর কেউ একজন আর্জেন্টাইন কোচকে বলেছিলেন, ‘ওই ছেলেটা যদি তোমাদের দলে থাকত, গল্পটা অন্যরকম হতে পারত।’
ছেলেটার নাম? মেসি। তারপর শুরু হলো খোঁজ। মন্টে গ্রান্দের একটি ফোনের দোকান থেকে টেলিফোন ডিরেক্টরি নিয়ে একে একে ‘মেসি’ পরিবারের নম্বরে ফোন করা হলো। তখনো তাঁরা জানতেন না, ছেলেটির নাম লিওনেল নাকি লিওনার্দো। অবশেষে পাওয়া গেল হোর্হে মেসিকে।
‘অবশেষে!’—বাবার মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিল স্বস্তির সেই শব্দ। কারণ, তাঁর ছেলে অপেক্ষা করছিল আর্জেন্টিনার জন্য।
২০০৪ সালের এক ভিডিওতে কিশোর মেসিকে বলতে শোনা যায়, বার্সেলোনার রিজার্ভ দলে দ্রুত উঠতে চান তিনি। আর আরেকটি স্বপ্ন—আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে খেলা। তাঁর সেই অপেক্ষা আর বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
২৯ জুন ২০০৪। বুয়েনস এইরেসের আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স স্টেডিয়াম। মেসির বয়স তখন সবে ১৭। প্যারাগুয়ের অনূর্ধ্ব-২৩ দলের বিপক্ষে সেই প্রীতি ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধে নামলেন ১৭ নম্বর জার্সি গায়ে। দুটি গোলে সহায়তা করার পর নিজেও করলেন একটি গোল। আর্জেন্টিনা জিতল ৮-০।
সেদিনই শুরু হয়েছিল একটি কিংবদন্তির পথচলা। কিন্তু জাতীয় দলের সঙ্গে মেসির সম্পর্কটা তখনো মসৃণ ছিল না।

বার্সেলোনায় তিনি একের পর এক শিরোপা জিতছেন, বিশ্বের সেরা ফুটবলার হয়ে উঠছেন। অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জিতেছেন, অলিম্পিক সোনা জিতেছেন। অথচ আর্জেন্টিনার মূল জাতীয় দলে এলেই প্রশ্ন। জাতীয় সংগীত গান না কেন? বিদেশে যেমন খেলেন, দেশের হয়ে তেমন খেলেন না কেন? চরিত্রে ঘাটতি আছে? ম্যারাডোনার মতো জাতীয় দলের জার্সির প্রতি আবেগ নেই?
অদ্ভুত এক সময়। যে ছেলেটি স্পেনের প্রলোভন সরিয়ে আর্জেন্টিনাকে বেছে নিয়েছিল, তাকেই বছরের পর বছর প্রমাণ করতে হয়েছে—সে যথেষ্ট আর্জেন্টাইন কি না।
তারপর একের পর এক হার। ২০০৬ বিশ্বকাপ—জার্মানির কাছে। ২০০৭ কোপা আমেরিকার ফাইনাল—ব্রাজিলের কাছে। ২০১০ বিশ্বকাপ—আবার জার্মানির কাছে। ২০১১ কোপা আমেরিকা—উরুগুয়ের কাছে। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল—আবারও সেই জার্মানির কাছে হার। তারপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার দুই ফাইনাল—দুবারই চিলির কাছে পরাজয়। দ্বিতীয়বার পেনাল্টিতে নিজেই মিস করলেন মেসি।
এবার যেন ভেঙে পড়লেন মেসি—‘জাতীয় দল আমার জন্য শেষ।’ মাত্র ২৯ বছর বয়সে জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলেন তিনি। যে দলকে এত ভালোবেসেছিলেন, সেই দলই তখন তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার নাম।

কিন্তু ভালোবাসা কি এত সহজে শেষ হয়? শেষ হয়নিও। ফিরে এলেন মেসি। ২০১৮ বিশ্বকাপের বাছাইয়ে ইকুয়েডরের বিপক্ষে সেই রাত—তিন গোল করে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপে তুললেন। রাশিয়াতেও গেলেন। কিন্তু সেখানে ফ্রান্সের কাছে শেষ ষোলোয় বিদায়। বয়স তখন ৩১। চারটি বিশ্বকাপ খেলা হয়ে গেছে। বার্সেলোনায় অর্জনের পাহাড়, আর জাতীয় দলের সঙ্গে শুধুই অপূর্ণতার গল্প।
তারপর এলেন লিওনেল স্কালোনি। আর বদলে গেল সবকিছু। একটি দল তৈরি হলো মেসিকে ঘিরে, কিন্তু শুধু মেসির ওপর নির্ভর করে নয়। সতীর্থরা তাঁকে আগলে রাখলেন, তাঁর জন্য লড়লেন। আর মেসিও হয়ে উঠলেন সেই দলের প্রাণ। ঘরে উঠল ২০২১ কোপা আমেরিকার শিরোপা। জাতীয় দলের হয়ে মেসির প্রথম বড় শিরোপা। তারপর ফিনালিসিমা। আর তারপর কাতার। ২০২২ বিশ্বকাপ যেন মেসির সঙ্গে আর্জেন্টিনার ভালোবাসার গল্পের পূর্ণতা। পাঁচটি বিশ্বকাপের পর সেই ট্রফি, যার জন্য এত বছর অপেক্ষা। সাত গোল, অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত, ফাইনালে দুই গোল, টাইব্রেকারে জয়—শেষ পর্যন্ত মেসির হাতে বিশ্বকাপ।
সেদিন আর কাউকে কিছু প্রমাণ করতে হয়নি। যে আর্জেন্টিনার কাছে একসময় তাঁকে বারবার নিজের ভালোবাসার প্রমাণ দিতে হয়েছিল, সেই আর্জেন্টিনা সেদিন তাকে কাঁধে তুলে নিল। অবশেষে ভালোবাসা দুই দিক থেকেই সমান হলো।
২০২৪-এ আরও একটি কোপা আমেরিকা। এরপর ২০২৬ বিশ্বকাপ। বয়স তখন ৩৯—যে বয়সে অধিকাংশ ফুটবলার অনেক আগেই অবসর নিয়েছেন। তবু মেসি আবারও মাঠে। আবারও আর্জেন্টিনার জার্সিতে। আবারও স্বপ্নের পথে। বিশ্বকাপের শেষটা হয়তো তাঁর চাওয়ামতো হয়নি। কিন্তু এবার হারেও কোনো অভিমান ছিল না। কারণ, মেসির আর কিছু প্রমাণ করার ছিল না। তাঁর অর্জনই তাঁর হয়ে কথা বলছিল।
জাতীয় দলের হয়ে চারটি বড় শিরোপা। অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ। অলিম্পিক সোনা। অসংখ্য গোল, অসংখ্য ম্যাচ, ছয়টি বিশ্বকাপের সাক্ষী হয়ে থাকা এক ক্যারিয়ার। তবু মেসির গল্প শুধু পরিসংখ্যানের নয়।
এটা সেই ছেলের গল্প, যে অন্য দেশের হয়ে খেলার সুযোগ পেয়েও আর্জেন্টিনাকেই বেছে নিয়েছিল। এটা সেই তরুণের গল্প, যিনি বারবার হেরেও ফিরে এসেছিলেন। এটা সেই মানুষের গল্প, যিনি একসময় বলেছিলেন, ‘জাতীয় দল আমার জন্য শেষ’; কিন্তু ভালোবাসার টানে আবার ফিরে এসেছিলেন। আর এটা সেই দেশের গল্প, যে দেশ একদিন তাঁকে প্রশ্ন করেছিল—তুমি কি সত্যিই আমাদের?
এখন সেই প্রশ্নের আর কোনো অর্থ নেই। কারণ, মেসি প্রমাণ করেছেন, ভালোবাসা সব সময় জয়ের হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। কখনো কখনো ভালোবাসা মানে, হেরে গিয়েও ফিরে আসা। আবার চেষ্টা করা। একই জার্সি গায়ে তুলে নেওয়া। আর একদিন সেই জার্সি পরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ট্রফি হাতে তুলে ধরা।
শেষবারের মতো আজ ১০ নম্বর জার্সি পরে ফেলেছেন মেসি। বেনিনের বিপক্ষে দুই গোল ও এক অ্যাসিস্ট করেছেন। বিদায়ী ভাষণ দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। আবেগ সামলে দীর্ঘ বক্তব্য দিয়েছেন। এনসো ফের্নান্দেসকেও কাঁদতে দেখা গেছে। কিন্তু কিছু সম্পর্কের শেষ নেই। শেষ হয় না ভালোবাসা। মেসি আর আর্জেন্টিনার গল্পও তেমনই।
একসময় যে ভালোবাসা ছিল একতরফা, দুই দশকের কান্না-হাসি, হার-পরাজয় আর অপেক্ষার পর সেটিই আজ চিরন্তন। এখন বলাই যায় ধন্যবাদ মেসি।

তুমি কেন বোঝো না, তোমাকে ছাড়া আমি অসহায়—বাংলাদেশের প্রয়াত সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর এই গানটাই যেন আজ লিওনেল স্কালোনির কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে। বেনিন ম্যাচ খেলে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছেন লিওনেল মেসি। যে স্কালোনি-মেসি জুটি আর্জেন্টিনাকে মনে রাখার মতো অনেক মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন, আজকের পর আর কখনো ত
২০ মিনিট আগে
যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে—মনুমেন্তালে আজ আর্জেন্টিনা-বেনিন ম্যাচ শেষে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গান মনে পড়াটাই স্বাভাবিক। গানটা মনে পড়ার উপলক্ষ অবশ্যই লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনার জার্সিতে ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ খেলে ফেলেছেন মেসি। বিদায়টাও আর্জেন্টিনার তারকা ফুটবলার রাঙিয়েছেন নিজের মতো ক
১ ঘণ্টা আগে
লেজেন্ডস ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে আজ দুটি ম্যাচ রয়েছে। বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে শুরু হবে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ। রাত ৯টা ৩০ মিনিটে মাঠে গড়াবে ইংল্যান্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচ। দুটি ম্যাচই সরাসরি সম্প্রচার করবে টি-স্পোর্টস।
২ ঘণ্টা আগে
আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়। মনুমেন্তালে আজ বাংলাদেশ সময় সকালে অনুষ্ঠিত আর্জেন্টিনা-বেনিন ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতেই ঘটল মেসি গল্পের সমাপ্তি। লিওনেল স্কালোনিও যেন তাঁকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন।
৩ ঘণ্টা আগে