Ajker Patrika

বিশ্বকাপের স্বচ্ছতা নিয়ে ফিফাকে ইউরোপের মানবাধিকার সংস্থার সতর্কবার্তা

ক্রীড়া ডেস্ক    
বিশ্বকাপের স্বচ্ছতা নিয়ে ফিফাকে ইউরোপের মানবাধিকার সংস্থার সতর্কবার্তা
১৫ জুলাই আটলান্টায় আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড সেমিফাইনাল শেষে ভক্ত-সমর্থকদের মধ্যে লেগেও গিয়েছিল। ছবি: সংগৃহীত

২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে ইউরোপের শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থা কাউন্সিল অব ইউরোপ (সিইও)। সংস্থাটির মহাসচিব অ্যালাঁ বেরসে ফিফার উদ্দেশে এক খোলাচিঠিতে বলেছেন, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সংকট এখন আর শুধু মাঠের লড়াই নয়, বরং ‘অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাব’। একই সঙ্গে ২০৩০ বিশ্বকাপকে আরও স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য করতে এখন থেকেই ফিফার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বেরসের চিঠির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানকে ঘিরে বিতর্ক। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে লাল কার্ড দেখে পরের ম্যাচে নিষিদ্ধ হওয়ার কথা ছিল বালোগানের। কিন্তু মাঝপথেই সেই নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে ফিফা। পরে জানা যায়, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। যদিও বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ পর্যন্ত ৪-১ গোলে হেরে যুক্তরাষ্ট্র বিদায় নেয়, তবু ফিফার এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

বেরসের মতে, এমন সিদ্ধান্ত ফুটবলের ন্যায়বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাঁর ভাষায়, ‘চাপের মুখে যদি নিয়ম বদলে যায়, তাহলে প্রতিটি ম্যাচের ফলই সন্দেহের মধ্যে পড়ে।’ তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপ্রধানের হস্তক্ষেপের পর টুর্নামেন্ট চলাকালীন শাস্তি স্থগিত হওয়া প্রমাণ করে, রাজনৈতিক প্রভাব এখন মাঠের ভেতরেও ঢুকে পড়েছে।

শুধু বালোগান ইস্যুই নয়, ফিফার নতুন বাণিজ্যিক নীতিও উদ্বেগের কারণ বলে মনে করছে কাউন্সিল অব ইউরোপ। চলতি বিশ্বকাপের আগে আবুধাবি-সমর্থিত প্রতিষ্ঠান এডিআই প্রেডিক্টস্ট্রিট-এর সঙ্গে প্রায় ১৫ কোটি ডলারের স্পনসরশিপ চুক্তি করে ফিফা। প্রতিষ্ঠানটি ‘প্রেডিকশন মার্কেট’ বা বিভিন্ন ঘটনার ওপর বাজির সুযোগ দেয়। এর পাশাপাশি ফিফার আরও কয়েকটি বাণিজ্যিক চুক্তিও রয়েছে জুয়াশিল্পের সঙ্গে।

বেরসের দাবি, ম্যাচের ফল নয়, বরং একটি পাস, কর্নার, হলুদ কার্ড কিংবা নির্দিষ্ট মুহূর্ত নিয়েও বাজি ধরার সুযোগ তৈরি হওয়ায় ম্যাচ কারসাজির ঝুঁকি বেড়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘এটি প্রতারণার জন্য উন্মুক্ত দরজা। আর এই বিশ্বকাপ সেই দরজাকে আরও বড় করে খুলে দিয়েছে।’

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কাউন্সিল অব ইউরোপ ও ফিফার মধ্যে ২০১৮ সাল থেকেই মানবাধিকার, সুশাসন ও ক্রীড়ার স্বচ্ছতা নিয়ে আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা চুক্তি রয়েছে। সেই সময় ইনফান্তিনো বলেছিলেন, দুই সংস্থাই স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, খেলাধুলার সততা এবং মানবাধিকারের মতো অভিন্ন মূল্যবোধে বিশ্বাস করে। অথচ আট বছর পর সেই সহযোগী সংস্থাই প্রকাশ্যে ফিফার কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

খোলাচিঠিতে বেরসে আরও কয়েকটি উদ্বেগের কথাও উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এবারের বিশ্বকাপে রেফারিদের কর্তৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বর্ণবাদী আচরণের ঘটনাও ঘটেছে, যার কিছু এসেছে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকেও। পাশাপাশি ম্যাচের প্রায় প্রতিটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাজির বাজার তৈরি হওয়ায় ফুটবলের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

এই প্রেক্ষাপটে ২০৩০ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বেরসে। স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হবে পরবর্তী বিশ্বকাপ। শতবর্ষ উপলক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচ হবে উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েতেও।

ফিফার প্রতি তাঁর আহ্বান, ‘এখন থেকেই একটি যৌথ সংলাপ শুরু হোক, যাতে ২০৩০ বিশ্বকাপ মাঠে গড়ানোর আগেই এর স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করার কাঠামো তৈরি করা যায়।’

২০২৬ বিশ্বকাপ মাঠের ফুটবলের জন্য যতটা প্রশংসা কুড়িয়েছে, মাঠের বাইরের কিছু সিদ্ধান্ত ততটাই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আর সেই বিতর্কের জের ধরেই এবার বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে একটাই প্রশ্ন—ভবিষ্যতের বিশ্বকাপ কতটা স্বচ্ছ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা সম্ভব?

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত