
শেষবার যখন মনুমেন্তালের ঘাস ছুঁয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন লিওনেল মেসি, মনে হচ্ছিল আর্জেন্টিনার দুই দশকের এক সোনালি বিকেল মাঠ ছেড়ে যাচ্ছে। গ্যালারি তখনো তাঁর নামে কাঁপছে, চোখে পানি নিয়ে তিনি হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছেন, আর ১০ নম্বর জার্সির আকাশি-সাদা রংটি যেন সেই মুহূর্তে আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। ম্যাচ শেষ হয়েছে, কিন্তু মেসির চলে যাওয়ার দৃশ্যটি মনুমেন্তালের ঘাসে পড়ে রইল একটি যুগের শেষ স্মৃতি হয়ে।
ফুটবলের বলা সম্ভবত সবচেয়ে বড় গল্পটির সমাপ্তি হলো। এক বৃত্ত-পূরণের গল্প, যার শুরুটা রোসারিওর এক অমিত প্রতিভাধর খুদে ফুটবলারের হাত ধরে, যে ছুটে গিয়েছিল বার্সেলোনায়। বার্সেলোনা থেকে পৌঁছেছিল আর্জেন্টিনার সবচেয়ে কঠিন সময়ের কেন্দ্রে; আর সেই নরকযন্ত্রণা পেরিয়েই শেষ পর্যন্ত আলবিসেলেস্তের হয়ে শিরোপা জিতেছে মারাকানা, লন্ডন, কাতার ও মায়ামিতে।
গ্যালারিভর্তি মানুষ পরশু বসন্তের রাতে এসেছিল নিজেদের জীবনের একটি অংশকে শেষবারের মতো চোখের সামনে দেখতে। যে মানুষটি তাদের শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য পেরিয়ে প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন।
মেসি হয়তো জানতেন, এই রাতের পরে আর কোনো দিন তাঁকে এই জার্সিতে দেখা যাবে না। এসেইসা থেকে মনুমেন্তালের পথে বাসের জানালার ওপাশে দাঁড়িয়ে যখন হাজারো মানুষকে দেখছিলেন, চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারেননি। সড়কের দুই পাশে পতাকা হাতে মানুষ, কারও গায়ে ১০ নম্বর জার্সি, কারও হাতে মেসির ছবি; সবাই যেন এক মানুষকে থামিয়ে রাখতে চাইছে।
সময়ের নিজস্ব গতি আছে। সে কারও জন্য থামে না, কিংবদন্তির জন্যও না। মনুমেন্তালে ঢোকার পরও সেই আবেগ মেসিকে ছেড়ে যায়নি। তিন সন্তানের সঙ্গে আলিঙ্গন, সতীর্থদের সঙ্গে শেষবারের মতো টানেলে দাঁড়ানো, মাঠে পা রাখার আগে চারপাশের গ্যালারির দিকে দুই হাত তুলে তাকানো, প্রতিটি মুহূর্ত যেন মেসি নিজের চোখে ধরে রাখতে চাইছিলেন।
জাতীয় সংগীতের সময় মেসির ঠোঁট নড়েনি। গলায় আটকে ছিল চাপা কান্না। মাথার ভেতর নিশ্চয় কত ছবি তখন একসঙ্গে ছুটে বেড়াচ্ছিল। সেই ২০০৫-এর তরুণ মেসি, যাঁর সামনে তখনো পড়ে ছিল অনেক বছর। টানা ফাইনাল হারের হতাশা, আর্জেন্টিনার জার্সি খুলে রাখার ঘোষণা, আবার ফিরে আসা। কোপা আমেরিকার কান্না, মারাকানার জয়, ওয়েম্বলির উল্লাস, আর শেষে কাতারের সেই মায়াবী রাত। যেখানে অপূর্ণতা ঘুচিয়ে বিশ্বকাপটা উঠেছিল তাঁর দুই হাতে।
জীবনের এত ছবি যখন একসঙ্গে ফিরে আসে, তখন একটি জাতীয় সংগীতও কখনো কখনো গলার কাছে এসে থেমে যায়। গতকাল ম্যাচ শুরু হওয়ার পর অবশ্য আবেগকে নিজের খেলায় ঢুকতে দেননি মেসি। ৩৯ সেকেন্ডের মধ্যেই বল তাঁর পায়ে। যেন শেষ রাতেও ফুটবল তাঁকে খুঁজে নিয়েছে।
ঠিক ১০ মিনিটে ম্যাচ থামিয়ে যখন পুরো মনুমেন্তাল তাঁর নামে গর্জে উঠল, মেসি কিছুটা হকচকিত। নাম্বার টেনের সম্মানে এই ব্যতিক্রম উদ্যোগ। গভীর কৃতজ্ঞতায় দুই হাত তুলে ভালোবাসার জবাব দিলেন। প্রতিপক্ষ বেনিনের খেলোয়াড়েরা এগিয়ে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। দৃশ্যটি তখন আর আর্জেন্টিনা বনাম বেনিনের ছিল না।
গোলের জন্য মেসি অপেক্ষা করছিলেন। প্রথমার্ধে পারেননি। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই তাঁর কর্নার থেকে নিকোলাস ওতামেন্দির গোল এল। শেষ ম্যাচেও মেসি নিজে গোল করার আগে সতীর্থের সামনে দরজা খুলে দিতে চাইলেন। কিছুক্ষণ পর নিকো পাসের গোলের পেছনেও তাঁরই পা। নিকোকে দেওয়া সেই পাসে যেন আরও একটি গল্প লুকিয়ে ছিল। আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিটি কখনো তো কারও কাছে যেতে হবে। হয়তো সেদিন মেসি শুধু একটি গোল বানিয়ে দেননি, ভবিষ্যতের দিকে একটি ছোট্ট ইশারাও দিলেন।
তবু রাতটা পূর্ণতা পাচ্ছিল না। এমন এক দিনে গোল না পেলে ছোট্ট হলেও আফসোস কাজ করত। ফুটবল বিধাতা সেটারও খামতি রাখলেন না। আগুস্তিন গিয়াইর ফাউলের শিকার হওয়ায় ৭১ মিনিটে পেনাল্টি পেল আর্জেন্টিনা। বল হাতে নিলেন মেসি। মনুমেন্তাল তখন কয়েক সেকেন্ডের জন্য অদ্ভুত নীরব। ১১ মিটার দূরে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ, যিনি আর্জেন্টিনাকে এত কিছু দিয়েছেন, তিনি যেন শেষবারের মতো নিজের কাছেও কিছু পাওনা ছিলেন। তারপর শট। বল উঁচু কোনা দিয়ে জড়াল জালে। বেনিন গোলকিপারের তা ঠেকানোর সাধ্য ছিল না।
গোলের পর সতীর্থরা তাঁকে ঘিরে ধরলেন। কেউ তাঁকে ছাড়তে চাইছিলেন না। এই আলিঙ্গনে যেন একসঙ্গে মিশে ছিল ২০ বছরের বন্ধুত্ব, পরাজয়ের যন্ত্রণা, শিরোপার আনন্দ আর হাজারো স্মৃতি। পরে তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে ইশারা করলেন। হয়তো বাবা হোর্হের জন্য, হয়তো তাঁর জীবনের সেই মানুষগুলোর জন্য, যাঁরা শুরুটা দেখেছিলেন কিন্তু শেষটা দেখতে পাশে নেই। মাঠের গর্জনের মধ্যেও সেই মুহূর্তে মেসি যেন একা হয়ে গেলেন।
ম্যাচ শেষে যখন কথা বলতে মাইক্রোফোন হাতে নিলেন, তখন কথা বলছিলেন একজন ছেলে, একজন বাবা, একজন মানুষ হিসেবে। মনুমেন্তালের সেই বিশাল গ্যালারি তখনো বিশ্বাস করতে চেয়েছিল মেসি আসলে কোথাও যাচ্ছেন না। তাঁর গল্প তো এখন আর্জেন্টিনার প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে, দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতিতে, পুরোনো ভিডিওতে, বাবার সঙ্গে সন্তানের আলাপে, পাড়ার মাঠে বাঁ পায়ে বল নেওয়া কোনো শিশুর ভঙ্গিতে।
মেসির কীর্তি গুনতে গেলে সংখ্যার শেষ নেই। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা, অলিম্পিক সোনা, অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ, ২০৮ ম্যাচ, ১২৬ গোল। কিন্তু তাঁর বাঁ পায়ের একেকটি ছোঁয়া মনে করিয়ে দিয়েছে ফুটবল আসলে অনুভূতির নাম, যেখানে কৌশল থেকে শুরু করে ব্যবসা, বাকি সবই তুচ্ছ হয়ে ওঠে।
মেসির বিদায়ের রাতকে শুধু ৩-০ গোলের একটি ম্যাচ দিয়ে বোঝা যাবে না। ম্যাচের শেষে ড্রোনের মাধ্যমে আকাশের ক্যানভাসে রঙিন আলোর ঝরনাধারায় যখন ভেসে উঠেছিল মেসির মুখ, মনে হচ্ছিল ওপরে কেউ একজন শেষবারের মতো তাঁকে ধরে রাখতে চাইছে। কিন্তু আলো মিলিয়ে গেল, গান থেমে গেল, গ্যালারি একসময় খালি হয়ে গেল। মাঠও আবার তার স্বাভাবিক নীরবতায় ফিরে গেল। শুধু থেকে গেলেন একজন, যাঁর প্রতি চিরকাল কৃতজ্ঞ হয়ে থাকবে ফুটবল।


আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নেমেছেন লিওনেল মেসি। বেনিনের বিপক্ষে ৩–০ গোলের জয়ে শেষ হয়েছে জাতীয় দলের হয়ে তাঁর দীর্ঘ পথচলা। শেষ ম্যাচে গোলও করেছেন ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা। তবে ফুটবল থেকে এখনই বিদায় নিচ্ছেন না তিনি। আর্জেন্টিনার অধ্যায় শেষ হলেও ইন্টার মায়ামির হয়ে চালিয়ে যাবেন খেলা।
৭ ঘণ্টা আগে
এশিয়ান গেমস শেষ হয়েছে মাত্র দুই দিন আগে। ২২ ডিসিপ্লিনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ ফিরেছে একটি ব্রোঞ্জ পদক নিয়ে। মাঠের ফল নিয়ে হতাশার সঙ্গে গেমস চলাকালে খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। সেই প্রসঙ্গেই এবার কঠোর বার্তা দিলেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। তাঁর মতে, হার-জিত খেলারই অংশ, কিন্তু প্রতিযো
৮ ঘণ্টা আগে
আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির অধ্যায় শেষ হয়েছে মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে। ৩৭ দিন আগে সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা দিলেও আজ ঘরের মাঠে দর্শকদের সামনে থেকে বিদায় নিয়েছেন আর্জেন্টাইন তারকা ফুটবলার। বাংলাদেশ সময় ভোরে অনুষ্ঠিত আর্জেন্টিনা-বেনিন ম্যাচটার তাৎপর্য তাই বলে শেষ করা যাবে না। প্রতিপক্ষ দলের কাছ থেকে
১৩ ঘণ্টা আগে