Ajker Patrika

টমাস ডুলির সাক্ষাৎকার

‘বাংলাদেশ সমর্থকদের দেশ, ফুটবলার তৈরির নয়’

কদিন পর ঘরের মাঠে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। সাফের আগে এই মুহূর্তে দলকে নিয়ে টমাস ডুলি করছেন নানা পরিকল্পনা। পরশু বিকেলে গুলশানের এক রেস্তোরাঁয় বসে সেসব পরিকল্পনা, তাঁর খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স, কদিন আগে সমাপ্ত আসিয়ান কাপের ব্যর্থতা নিয়ে সবিস্তার বললেন বাংলাদেশ কোচ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রানা আব্বাস। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের প্রথমটি থাকল আজ—

রানা আব্বাস, ঢাকা 
আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৪: ১০
‘বাংলাদেশ সমর্থকদের দেশ, ফুটবলার তৈরির নয়’
বাংলাদেশ ফুটবল দলের প্রধান কোচ টমাস ডুলি। ছবি: বাফুফে

প্রশ্ন: কেমন আছেন। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত আপনার অভিজ্ঞতা কেমন।

টমাস ডুলি: আমার ভালোই লাগছে। এখানকার মানুষ খুব বন্ধুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ মানুষই আন্তরিক। আমি এরই মধ্যে তিন-চারটি আলাদা হোটেলে থেকেছি। এখানে একটা অ্যাপার্টমেন্ট নিয়ে থাকতে চাই, যেখানে হোটেলে থাকার বদলে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারব। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আরও মিশতে পারব, তাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হতে পারব। সে কারণে সাফ টুর্নামেন্টের পর এমন একটা ব্যবস্থা করার অপেক্ষায় আছি। সব মিলিয়ে দেশটি বেশ ইন্টারেস্টিং। বাংলাদেশ সত্যিই একটি ফুটবলপ্রেমী দেশ। এখানে ফুটবলের সমর্থকগোষ্ঠী বিশাল। বিষয়টি সত্যিই অসাধারণ। তবে অন্য অনেক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের একটা বড় পার্থক্য আছে। বাংলাদেশ মূলত ফুটবল-সমর্থকদের দেশ, ফুটবলার তৈরির নয়। এই দুইয়ের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।

প্রশ্ন: আপনি বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবল দেখছেন। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবল সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী।

ডুলি: আমার মতে, মান বেশ নিচু। বিষয়টা হলো, আপনি চাইলে সবকিছুই ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। সবকিছু ভালো, সবকিছু চমৎকার—এমন কথাও বলতে পারেন। কিন্তু তাতে কোনো উন্নতি হবে না। আমার পেশাগত জীবন ও ব্যক্তিগত জীবনে সব সময় সৎ থাকার চেষ্টা করেছি। আমি খোলামেলা কথা বলি। নিজের অভিজ্ঞতায় যেটা দেখেছি, সেটাই বলি। সব সময় কাউকে ‘তুমি অসাধারণ, তুমি নিখুঁত, সবকিছু ঠিক আছে’; এটা ভালো কিছু নয়। এতে উন্নতি হয় না। কারও কোথায় সমস্যা রয়েছে, সেটা সৎভাবে বলি। কারণ, তাকে সাহায্য করতে চাই। বাংলাদেশের ফুটবলেও আমি তা করতে চাই। ফুটবল এবং লিগের সবকিছুতেই গতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আপনি কত দ্রুত খেলতে পারেন। বল পেতে কত সময় লাগে। শুধু আপনি কতটা দ্রুত দৌড়াতে পারেন, সেটাই বিষয় নয়। অবশ্যই, একজন খেলোয়াড় যত দ্রুত হবেন, সাধারণভাবে তত ভালো। তবে এর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। কখন এগোতে হবে। কোথায় এগোতে হবে। কোথায় যেতে হবে। বাঁ দিকে যাব, নাকি ডান দিকে—এসব সিদ্ধান্ত নিতে তিনটি বিষয় বিবেচনা করতে হয়—বল কোথায়, প্রতিপক্ষ কোথায় এবং আমার সতীর্থ কোথায়। বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নয়নে এসব বিষয় অনুপস্থিত। এখানে বয়সভিত্তিক পর্যায়ে প্রকৃত অর্থে খেলোয়াড় তৈরির ব্যবস্থা নেই। যথাযথ ফুটবল ক্লাব নেই, যেখানে ছোটবেলা থেকে খেলোয়াড়েরা ধারাবাহিকভাবে প্রশিক্ষণ ও উন্নতির সুযোগ পাবে। তবে পেশাদার লিগে খেলার মতো একটি প্রথম দল আছে, এটা অবশ্যই ভালো ব্যাপার। যদি অন্য কোনো দেশের উন্নত ফুটবলকাঠামোর মধ্যে গড়ে ওঠা ক্লাবের বিপক্ষে খেলেন, তাহলে বড় ব্যবধানে হারবেন। এ কারণে মাঝেমধ্যে এমন পরিস্থিতির প্রয়োজন, যা আমাদের চোখ খুলে দেবে। তখন বুঝতে পারব, আসল সমস্যাটা কোথায় এবং কোন জায়গায় উন্নতি করতে হবে।

প্রশ্ন: সামনে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। বাংলাদেশ অনেক দিন ধরে বড় কোনো শিরোপা জেতেনি। এবার সম্ভাবনা নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী।

ডুলি: জীবনে আপনি অনেক কিছু অর্জন করতে পারেন, যদি কিছু মৌলিক নিয়ম মেনে চলেন। সফল হওয়ার জন্য পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। এগুলোর মধ্যে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—লক্ষ্যটি বাস্তবসম্মত হতে হবে।

যেমন বাংলাদেশ সাফ জিততে পারবে কি না—এটিকে কি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য বলা যায়? হ্যাঁ, যায়। কিন্তু আমি যদি চাঁদে উড়ে যেতে চাই, সেটা বাস্তবসম্মত নয়। তাই সেটাকে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা যায় না। সাফ টুর্নামেন্ট জেতা বাস্তবসম্মত লক্ষ্য। সেখানে আমাদের সমমানের প্রতিপক্ষ রয়েছে। তারা ভালো দল কি না। হ্যাঁ, ভালো। তারা আমাদের চেয়ে ভালো কি না। হতে পারে। সেটা আমরা মাঠেই দেখতে পাব। কিন্তু এবার আমাদের ঘরের মাঠে টুর্নামেন্ট। গ্যালারিতে ২৫ হাজার দর্শক আমাদের সমর্থন দেবেন। আর আমরা ২৩ বছর ধরে কোনো শিরোপা জিতিনি। এই বিষয়টি প্রত্যেক খেলোয়াড়ের জন্য অনুপ্রেরণা হওয়া উচিত।

আমি খেলোয়াড়দের মধ্যে এই মানসিকতা তৈরি করতে চাই। দেশের জন্য লড়তে হবে, সমর্থকদের জন্য লড়তে হবে, পরিবারের জন্য লড়তে হবে, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) জন্য লড়তে হবে এবং দেশের ফুটবলের উন্নয়নের জন্য লড়তে হবে। এই মুহূর্তে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সাফ জেতা বাস্তবসম্মত লক্ষ্য। খেলোয়াড়েরা যদি আমার কথা অনুসরণ করে, তাহলে বিশ্বাস করি, আমরা টুর্নামেন্টটি জিততে পারব।

প্রশ্ন: হামজাসহ বেশির ভাগ প্রবাসী বা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের শুরু থেকে পাওয়া যাবে না। দলের ভারসাম্যে এর প্রভাব কতটা পড়বে? এতে কি দল কিছুটা দুর্বল হয়ে যাবে না?

ডুলি: অবশ্যই। দেখুন, হামজা ইজ এভরিথিং। আমার মনে হয়, সে চাইলে গোলরক্ষক হিসেবেও খেলতে পারবে! সে এমন একজন খেলোয়াড়, যে সব জায়গায় সাহায্য করতে চায়। যেখানে তাকে প্রয়োজন, সেখানেই সে থাকতে চায়। সে নিঃসন্দেহে আমাদের দলের মূল খেলোয়াড়। আমাদের অন্য যেসব খেলোয়াড় দেশের বাইরে খেলছে, তারাও তুলনামূলক ভালো লিগে খেলে। তবে আমরা তাদের এমন একটি লিগে খেলতে দেখতে চাই, যেখান থেকে তারা আরও উচ্চপর্যায়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। কিন্তু ভুটানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচটি আমাদের জিততেই হবে।

আমি খেলোয়াড়দের মধ্যে যে মানসিকতা তৈরি করতে চাই, তা হলো—আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে নামতে হবে; সন্দেহ বা অবিশ্বাস নিয়ে নয়। মাঠে নেমে ভাবতে হবে, ‘আমি তোমার চেয়ে ভালো এবং মাঠেই সেটা প্রমাণ করব। তোমার এখানে কিছু করার নেই।’ আপনি যদি ১-০ গোলে জেতেন, সেটাও যথেষ্ট। যেভাবেই হোক, ম্যাচটি জিততে হবে। স্থানীয় খেলোয়াড়দের নিয়ে হলেও আমাদের জিততেই হবে। এরপর দ্বিতীয় ম্যাচে হামজা, ফারহানসহ কয়েকজন ফুটবলার দলে যোগ দেবে। তখন আমাদের শক্তি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে। প্রতিটি ম্যাচই গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রথম ম্যাচে আমাদের প্রধান মনোযোগ থাকবে ভুটানের বিপক্ষে জয়ের দিকে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের ফুটবলে দীর্ঘদিন ধরে স্ট্রাইকার-সংকট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। দলে প্রকৃত ফিনিশার নেই, আদর্শ নাম্বার নাইনের অভাব রয়েছে। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আগে এই সমস্যা সমাধানে আপনার পরিকল্পনা কী।

ডুলি: মানুষকে একটা বিষয় বুঝতে হবে। আমাদের বিপুল সমর্থক আছেন। তাঁরা দলকে ভালোবাসেন, সমর্থন করেন—এটা আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু ফুটবল শুধু খেলা দেখা আর নিজের দলকে বিশ্বের সেরা মনে করার বিষয় নয়।

ঠিকই বলেছেন, আমাদের প্রকৃত অর্থে একজন ‘নাম্বার নাইন’ নেই। এটা একটা সমস্যা। ফিফা আসিয়ান কাপেও সেই সমস্যাটা দেখেছি। অন্য দলগুলোর স্ট্রাইকারদের দেখুন। আক্রমণভাগে বল পেলে তাদের এক টাচই যথেষ্ট। একবার ফাঁকা জায়গায় বল দিয়ে ছেড়ে দিলেই তারা গোল করে ফেলবে। আমাদের দলে সেই ধরনের স্ট্রাইকার নেই। আমরা অনেক কিছু চেষ্টা করেছি। আমাদের দু-একজন খেলোয়াড় আছে। তারা প্রকৃত স্ট্রাইকার নয়; মূলত উইংয়ে খেলে। একজন প্রকৃত স্ট্রাইকার জানে, প্রতিপক্ষের বক্সের কোথায় থাকতে হবে, কোন জায়গায় যেতে হবে, কীভাবে গোল করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। এটাই একজন আদর্শ স্ট্রাইকারের বৈশিষ্ট্য। আমাদের সেই ধরনের খেলোয়াড় নেই। আমরা একজন তরুণ খেলোয়াড় নিতে যাচ্ছি—মাহি খান (ইংল্যান্ডে বেড়ে ওঠা)। তাকে ক্যাম্পে দেখব। কিন্তু ক্যাম্প শুরুর আগেই ২৮ জনের চূড়ান্ত তালিকা ঘোষণা করতে হবে। তাকে ক্যাম্পে দেখে যাচাই করার সুযোগ নেই। এখন তাকে দলে নেওয়ার সিদ্ধান্তটা অনেকটা ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়ার মতো। আমাদের বিশ্বাস, সে হয়তো প্রয়োজনীয় কাজটি করতে পারবে। এটাই বর্তমান পরিস্থিতি।

আজকের পত্রিকার হেড অব স্পোর্টস রানা আব্বাসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কোচ টমাস ডুলি তুলে ধরেছেন তাঁর পরিকল্পনা ও লক্ষ্যের কথা। ছবি: সারওয়ার সেতু
আজকের পত্রিকার হেড অব স্পোর্টস রানা আব্বাসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কোচ টমাস ডুলি তুলে ধরেছেন তাঁর পরিকল্পনা ও লক্ষ্যের কথা। ছবি: সারওয়ার সেতু

প্রশ্ন: আসিয়ান কাপে ফিরে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশ দল ভালো করতে পারেনি।

ডুলি: বিষয়টা হতাশাজনক—আপনি কীভাবে দেখছেন, তার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। ইন্দোনেশিয়ার হয়ে কারা খেলেছে, জানেন? তাদের খেলোয়াড়েরা বছরে ১০ লাখ থেকে ৩০ লাখ ডলার (১২ থেকে ৩৬ কোটি টাকা) পর্যন্ত আয় করে। বাংলাদেশের স্থানীয় খেলোয়াড়েরা কত আয় করে। আপনি জানেন? তাদের কেউ কেউ তো কোনো টাকাই পায় না। আমাদের খেলোয়াড়েরা মাসে কয়েক হাজার ডলার আয় করে, আর ওদের খেলোয়াড়েরা বছরে ১০ লাখ থেকে ৩০ লাখ ডলার আয় করে। দুই পক্ষের মধ্যে পার্থক্যটা দেখেন। ওরা সারা বছর প্রশিক্ষণ নেয়। মৌসুম শুরুর আগে ছয় সপ্তাহের প্রস্তুতিপর্ব থাকে। প্রথম সপ্তাহে দিনে তিনবার অনুশীলন করে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহে হয়তো দিনে দুবার করে। এরপর আরও তিন-চার সপ্তাহ সপ্তাহে এক দিন বা দুদিন করে অনুশীলন চলে। ছয় সপ্তাহের সেই প্রস্তুতিপর্ব শেষ হওয়ার পরও তারা শতভাগ ফিট থাকে না। এরপর প্রতি সপ্তাহান্তে তাদের লিগের ম্যাচ থাকে। কখনো আবার বুধবারেও লিগ বা কাপের ম্যাচ খেলতে হয়। ফলে তারা সব সময় শারীরিক ও মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। অন্যদিকে, আমাদের দল কতবার অনুশীলন করেছে? সান মারিনোর বিপক্ষে ম্যাচের পর তারা অনুশীলনই করেনি। কয়েকজন তো কিছুই করেনি। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত লিগ ছিল না, অনুশীলন ছিল না, ম্যাচও ছিল না। আপনি কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন। কীভাবে এমন একটি দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, যারা ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ১১৬তম, আর আমরা ১৮১তম? ওদের খেলোয়াড়েরা প্রকৃত অর্থেই অ্যাথলেট, আর আমাদের খেলোয়াড়দের সেই পর্যায়ের অ্যাথলেটিক প্রস্তুতি নেই।

প্রশ্ন: কিন্তু চার বছর আগে ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষেই দল ভালো খেলেছিল।

ডুলি: হ্যাঁ, কিন্তু তখন বুন্দেসলিগা, নেদারল্যান্ডস বা ইউরোপের অন্য লিগে খেলা তাদের কতজন খেলোয়াড় দলে ছিল? কেউ ছিল না। এখন তাদের দলে এ ধরনের খেলোয়াড় অনেক। হামজা আমাদের হয়ে কত দিন ধরে খেলছে? বড়জোর দেড় বছর। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে যদি আমরা হামজার মতো আরও চার-পাঁচজন খেলোয়াড় পাই, তাহলে এখনকার ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ার সঙ্গে ব্যবধান কমে যাবে।

টমাস ডুলি। ফাইল ছবি
টমাস ডুলি। ফাইল ছবি

প্রশ্ন: ইন্দোনেশিয়া ম্যাচে ৩-১ ব্যবধানে হারের পর আপনার কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে আপনি কেন ওপেন প্লেতে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলাতে চেয়েছিলেন? কেন লো-ব্লক বা আরও বেশি রক্ষণনির্ভর কৌশল বেছে নেননি?

ডুলি: প্রথমার্ধে সমস্যায় পড়ার পর আমরা যদি আরও খোলামেলা খেলতাম এবং রক্ষণভাগকে আরও ওপরে তুলে দিতাম...শেষের সেই সুযোগটার কথা ভাবুন। ফারহানের যে গোল করা উচিত ছিল, সেই পায়ের ভেতরের অংশ দিয়ে শট না নিয়ে ব্যাকহিল পাস দিতে চেয়েছিল। সেটি গোল হলে আমরা ৭-৩ করতে পারতাম। ওই ভুলের পর কী হয়েছিল—প্রতিপক্ষ পাল্টা আক্রমণে গোল করেছিল। কেন? কারণ, তখন আমাদের রক্ষণ উন্মুক্ত ছিল। এ ধরনের দলের বিপক্ষে আপনি অতিরিক্ত খোলামেলা ফুটবল খেললে প্রতিপক্ষ বারবার গোল করবে। এ কারণেই রক্ষণভাগ ও মাঝমাঠের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনতে হয়, যাতে অন্তত তাদের আক্রমণ ঠেকানোর একটা সুযোগ থাকে। কয়েকজন খেলোয়াড়কে নিয়ে আমি হতাশ হয়েছি। তারা কেউ কেউ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব নেয়নি, লড়াই করেনি। তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছিল। এটা করা যায় না। আপনি দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। মাঠে নেমে আপনাকে সর্বস্ব দিয়ে লড়তে হবে। একই সঙ্গে এ-ও মনে রাখতে হবে, দু-তিন মাস অনুশীলন না করার পর এক সপ্তাহে তিনটি ম্যাচ খেলতে হয়েছে। প্রতিপক্ষের সঙ্গে আমাদের শারীরিক সক্ষমতার পার্থক্যও ছিল অনেক।

শুরুতেই বলেছিলাম, ওই টুর্নামেন্ট সাফের প্রস্তুতি হিসেবে কাজে লাগাতে চাই। আমরা চাইলে ফল পাওয়ার জন্য শুধু লম্বা করে বল সামনে পাঠাতে পারতাম, তারপর রক্ষণ সামলাতে পারতাম। কিন্তু আমি সেটা চাইনি। চেয়েছি, আমরা প্রকৃত ফুটবল খেলি। কারণ, ভারতের বিপক্ষে খেলতে হবে, পাকিস্তানের বিপক্ষেও খেলতে হবে। তখন প্রতিপক্ষের চাপে পড়ে বল হারালে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সাফ টুর্নামেন্ট আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই শক্তিশালী দলের বিপক্ষে খেলতে হবে, যাতে নিজেদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে পারি।

বুন্দেসলিগা, নেদারল্যান্ডসের প্রথম বিভাগ বা বেলজিয়ামের প্রথম বিভাগে খেলা ফুটবলারদের খেলার জ্ঞান কতটা উন্নত। একটু আগেই বলেছি, ফুটবলের সবকিছুতে গতি গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি সিদ্ধান্ত নিতে বেশি সময় নেন, তাহলে অন্য খেলোয়াড়ের তুলনায় পিছিয়ে পড়বেন। উচ্চপর্যায়ের দলগুলো যখন দ্রুতগতিতে একের পর এক সিদ্ধান্ত নিয়ে খেলে, তখন আমাদের খেলোয়াড়দের চিন্তা করতে এবং সিদ্ধান্ত নিতে বেশি সময় লাগে। এই পার্থক্য মাঠে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার তুলনায় আমরা কতটা পিছিয়ে, ওই টুর্নামেন্ট আমাদের সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। তাদের লিগও আমাদের লিগের চেয়ে অনেক উন্নত। তাদের দলে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের খেলোয়াড়ও রয়েছে। মালয়েশিয়ার ফুটবলের মানের সঙ্গে আমাদের পার্থক্যের এটিও কারণ। আমাদের ওই ধরনের ফরোয়ার্ড নেই। মানুষকে বিষয়টি বুঝতে হবে। তাই আমার মতে, এটাকে হতাশা হিসেবে দেখার কারণ নেই। বরং আমরা বুঝতে পেরেছি, ওই মানের খেলোয়াড় ও দলের তুলনায় আমরা কতটা পিছিয়ে।

প্রশ্ন: আসিয়ান কাপের সময় আমরা কয়েকটি ঘটনা দেখেছি, সেগুলো থেকেও শেখার আছে। সাদ উদ্দিন ও সোহেল রানার যে ছবি ছড়িয়ে পড়েছে, এ নিয়ে বাফুফে সভাপতি ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী পর্যন্ত কথা বলেছেন। শৃঙ্খলার জায়গায় আপনি ছাড় দিচ্ছেন, এ রকম কথা উঠছে।

ডুলি: সবাই এসব নিয়ে কথা বলেছে। আমাকে নিয়েও তো কত কথা বলা হয়েছে! বলা হয়েছে, ফারহানের বাবার সঙ্গে আমার হোটেলে ঝগড়া হয়েছে, আরও কত কী। এসব মিথ্যা খবর।

প্রশ্ন: কিন্তু সংবাদমাধ্যমে তো আপনার মন্তব্য প্রকাশিত হয়েছে ফারহানকে নিয়ে।

ডুলি: হ্যাঁ, ফারহানকে নিয়ে মন্তব্য করেছিলাম। একজন সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেছিলেন, ফারহান সম্পর্কে আমার কী ধারণা। তিনি প্রথমে বলেছিলেন, ফুলহামের খেলোয়াড় ফারহান। আমি তখন জিজ্ঞেস করেছিলাম, সে কি ফুলহামে খেলে? তিনি বললেন, না, সে সেখানে যুব পর্যায়ে ছিল। আমি জানতে চেয়েছিলাম, তাহলে সে এখন কোথায় খেলে? ফুলহামে কি চুক্তি হয়েছে? তিনি বলেছিলেন, না, সে চুক্তি পায়নি। তখন আমি বলেছিলাম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপনারা কোনো কোনো খেলোয়াড়কে এত বেশি প্রচার করেন, তাদের এমনভাবে তুলে ধরেন, যেন তারা অসাধারণ কিছু। কিন্তু তারা প্রত্যাশা অনুযায়ী খেলতে না পারলে আবার একেবারে নিচে নামিয়ে দেন। আমি শুধু ওই সাংবাদিককে বলিনি; সাধারণভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই প্রবণতার কথাই বলেছি। কোনো খেলোয়াড়কে ‘মেসিয়াস’ বা ত্রাণকর্তা কিংবা বিস্ময়বালক হিসেবে তুলে ধরার আগে দেখতে হবে, সে মাঠে আসলে কী করেছে। ফারহানকে আমি তুলে নিয়েছিলাম (প্রথম ম্যাচে); কারণ, তখন আমাদের দল কার্যত ১০ জন নিয়ে খেলছিল। আমার ১১ জন খেলোয়াড় প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে এমনভাবে বিষয়টি প্রকাশ করা হয়েছে, যেন ফারহানের বাবার সঙ্গে ঝগড়া করেছি, তিনি ছেলেকে নিয়ে দেশে ফিরে যেতে চেয়েছেন—এমন আরও কত কথা। এগুলো মিথ্যা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে। জাতীয় দলকে সমর্থন করতে চাইলে খেলোয়াড়দের প্রতি ঘৃণা ছড়ানো বন্ধ করুন। কোচদের প্রতি ঘৃণা ছড়ানোও বন্ধ করুন। সৎভাবে সংবাদ পরিবেশন করুন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিটিও গত বছরের হতে পারে, কিংবা অন্য কোনো সময়ের। দেখুন, আমি নিজেও জাতীয় দলে খেলেছি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খেলেছি। সারা পৃথিবীতেই আমার বন্ধু আছে। বিদেশে গেলে কোনো বন্ধু হয়তো বলবে, ‘তুমি এখানে এসেছ, দেখা করতে পারি?’ আমি বলব, ‘এখন পারব না। আমাদের তিনটি ম্যাচ আছে। টুর্নামেন্ট শেষ হলে দেখা করব।’ টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার আগে কোনো খেলোয়াড় যদি বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে যায়, সেটা সমস্যা হতে পারে। কিন্তু টুর্নামেন্ট শেষ হয়ে গেলে সে নিজের মতো সময় কাটাতে পারে। অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন, এত বড় ব্যবধানে হারের পর সমর্থকদের সঙ্গে ছবি তোলা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাওয়াটা ভালো দেখাবে না। সেটাও একটা বিবেচনা হতে পারে। কিন্তু সাধারণভাবে, বিদেশে জাতীয় দলের সঙ্গে থাকার সময় কোনো খেলোয়াড় কখন বাইরে যেতে পারবে, সে বিষয়ে নিয়ম থাকতে পারে। ম্যাচের আগে বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ থাকতে পারে। কিন্তু টুর্নামেন্ট শেষ হয়ে গেলে, পরদিন দেশে ফেরার আগে, বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে বসে সময় কাটানো কিংবা এক গ্লাস পানীয় পান করার ক্ষেত্রে বাধা কোথায়।

বাংলাদেশ ফুটবল দলের স্ট্রাইকার খুঁজছেন টমাস ডুলি। ছবি: বাফুফে
বাংলাদেশ ফুটবল দলের স্ট্রাইকার খুঁজছেন টমাস ডুলি। ছবি: বাফুফে

প্রশ্ন: বাংলাদেশ ৯-১ গোলে হারার পর পরিস্থিতি তো মোটেও অনুকূল ছিল না।

ডুলি: হ্যাঁ, আমি বুঝি। এ কারণেই বলছি, যদি ঘটনাটি সত্যিও হয়ে থাকে, তাহলে খেলোয়াড়ের নিজেরই ভাবা উচিত ছিল, এখন এটা না করাই ভালো। এত বড় হারের পর হয়তো হোটেলেই থাকা উচিত ছিল, লবিতে বসে ম্যাচ নিয়ে আলোচনা করা উচিত ছিল। কিন্তু টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পর বাইরে গিয়ে কিছু পান করার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে—এমন কোনো নিয়ম আমি দেখিনি।

প্রশ্ন: বাংলাদেশ যদি ঘরের মাঠে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জিততে ব্যর্থ হয়, তাহলে বাংলাদেশে আপনার ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। ফেডারেশনের নীতিনির্ধারকদের ওপরও চাপ তৈরি হবে। এই চ্যালেঞ্জকে কীভাবে দেখছেন?

ডুলি: একটা উদাহরণ দিই। আপনার বুকে ব্যথা হলে আপনি কি ডাক্তারের কাছে যাবেন, নাকি প্লাম্বারের কাছে? অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে। ঠিক ফুটবলে আমি ৪৩ বছর ধরে কাজ করছি। সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবলে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই পেশায় কীভাবে সবকিছু চলে, আমি জানি। আমার অনেক সাফল্যের গল্প আছে। সেই সাফল্য নেহাতই ঘটনাচক্রে ছিল না। স্বল্প সময়ে সাফল্য পাওয়া খুবই বিরল। খেলোয়াড়দের জানতে হয়, তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে হয়, বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। দল গড়ে তুলতে সময় লাগে। আসিয়ান কাপের মতো টুর্নামেন্টে যদি আমরা অংশ না নিতাম, বরং এখানে নিজেদের সমমানের দলগুলোর বিপক্ষে খেলতাম এবং কয়েকটি ম্যাচ জিতে আত্মবিশ্বাস অর্জন করতাম, তাহলে হয়তো আজ এত প্রশ্ন উঠত না। সবাই বলত, দল উন্নতি করছে। কিন্তু আমি কঠিন পথ বেছে নিয়েছি। আমি চেয়েছি, ভারত যেমন শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছে, আমরাও তেমন পরিস্থিতিতে নিজেদের পরীক্ষা করি। আমাদের সমস্যাগুলো কোথায়, সেসব বুঝতে হবে। তারপর সেই সমস্যার সমাধান করে এগোতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে, কোন খেলোয়াড় কোন পজিশনের জন্য উপযুক্ত নয় এবং তার পরিবর্তে কাকে নেওয়া উচিত। উদাহরণ হিসেবে ফিলিপাইনের কথা বলতে পারি। সেখানে দলকে এশিয়ান কাপের পর্যায়ে নিয়ে যেতে এবং ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি করতে চার বছর লেগেছিল। প্রতিবছর দল এগিয়েছে। আমরা কোনো ম্যাচ না হেরেই বাছাইপর্ব পেরিয়ে এশিয়ান কাপে জায়গা করে নিয়েছিলাম। কিন্তু যোগ্যতা অর্জনের পর আমার চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। তারা নতুন কোচ নিয়োগ দেয়। তখন ফেডারেশনকে বলেছিলাম, যদি কোচ পরিবর্তন করতেই হয়, তাহলে টুর্নামেন্টের ঠিক আগে সেটা করবেন না। নতুন কোচ এসে দু-তিনটি ম্যাচের বেশি খেলার সুযোগ পাবেন না। তিনি খেলোয়াড়দের ভালোভাবে চিনবেন না। আমি সেখানে চার বছর ছিলাম। র‍্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি হয়েছিল। দল এমন জায়গায় পৌঁছেছিল, যেখানে আমরা প্রায় যেকোনো প্রতিপক্ষকে হারানোর আত্মবিশ্বাস পেতাম। প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপে খেলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ঠিক সেই সময়ে নতুন কোচ আনা হলো। জানেন, সেই নতুন কোচ কে ছিলেন? সভেন-গোরান এরিকসন। তিনি ছিলেন বড় মাপের কোচ। কিন্তু তিনি দলের হয়ে কত পয়েন্ট পেয়েছিলেন? শূন্য। একটি পয়েন্টও নয়। কেন এমন হয়েছিল? কারণ, তিনি খেলোয়াড়দের চিনতেন না। খেলোয়াড়দের জানতে সময় লাগে। দুই, তিন, চার বছর ধরে ধীরে ধীরে অনেক ধাঁধার উত্তর মেলাতে হয়। উন্নতির জন্য সময় লাগে। বাংলাদেশে সর্বশেষ কোচ কত বছর ছিলেন? চার বছর, তাই তো? ওই চার বছরে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে কতটা উন্নতি হয়েছিল? আমাকে চার বছর সময় দিন। আমি বাংলাদেশকে র‍্যাঙ্কিংয়ের ১৫০ থেকে ১২০, এমনকি ১০০-এর কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারব। আমি শতভাগ আত্মবিশ্বাসী। এটাই উন্নয়নের পথ। এমন মানুষ প্রয়োজন, যাদের ওপর আস্থা রাখা যায় এবং যাঁরা বোঝেন, ফুটবলীয় জ্ঞান রাতারাতি তৈরি হয় না। নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এটি গড়তে হয়। আমাদের দলে এমন তরুণ খেলোয়াড় আছে, যারা শিখতে চায়। তাদের নিয়েই কাজ করতে হবে। এটাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। আশা করি, আমরা সাফ টুর্নামেন্ট জিতব।

(আগামীকাল ডুলির সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় পর্বে থাকছে প্রবাসী ও স্থানীয় ফুটবলারদের নিয়ে বিস্তারিত)

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত