Ajker Patrika

হাইড্রেশন বিরতি পর্যালোচনা করবে ফিফা

‘৪৮ দলের বিশ্বকাপে মান কমেনি’

রানা আব্বাস, নিউইয়র্ক-নিউজার্সি থেকে
আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৬, ১২: ৪৯
‘৪৮ দলের বিশ্বকাপে মান কমেনি’
স্পেনের জয়ে শেষ হলো ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ। ছবি: এএফপি

ফাইনালের আগের দিন শনিবার তুমুল বজ্রসহ বৃষ্টি নিউইয়র্ক-নিউজার্সিতে। বর্ষণমুখর দুপুরে নিউজার্সির মিডিয়া সেন্টারে এল আর্সেন ওয়েঙ্গারের নেতৃত্বে ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি কমিটি (টিএসজি)। এক ঘণ্টার আয়োজনের ৪০ মিনিটে ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমান-পাবলো জাবালেতাদের মতো ফুটবল পণ্ডিতরা ২০২৬ বিশ্বকাপের টেকনিক্যাল দিকগুলো পর্যালোচনা করলেন। বাকি ২০ মিনিট সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্ন নিলেন টেকনিক্যাল কমিটির সদস্যরা।

আশঙ্কা করা হচ্ছিল, ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের অংশগ্রহণে টুর্নামেন্টের মান কমে যাবে কি না। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ৮০ পেরিয়ে যাওয়া দলেরও যে সুযোগ হয়েছিল বিশ্বকাপ খেলার। অনেকের অনুমান ছিল, এ ধরনের দলগুলোকে গোলবন্যায় ভাসিয়ে দেবে শক্তিশালী দল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ভিন্ন ছবি। অধিকাংশ ম্যাচ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, বড় দলকে ছোট দলের চমকে দেওয়া গল্প আর নতুন সম্ভাবনার এক অনন্য মঞ্চ হিসেবেই দেখা দিয়েছে ২০২৬ বিশ্বকাপে।

ফিফার গ্লোবাল ফুটবল ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান আর্সেন ওয়েঙ্গার গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘টুর্নামেন্ট শুরুর আগে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু বিশ্বের আরও বেশি দেশকে ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দেওয়া নৈতিকভাবেই প্রয়োজন ছিল। সব দিক বিবেচনায় এটি ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত এবং নিঃসন্দেহে একটি বড় সাফল্য।’

ওয়েঙ্গার আরও যোগ করেন, ‘অনেকে মনে করেছিলেন কিছু দেশের মান বিশ্বকাপে খেলার মতো নয়। কিন্তু মাঠের পারফরম্যান্সেই তারা সেই সংশয়ের জবাব দিয়েছে। তারা শুধু নিজেদের যোগ্যতাই প্রমাণ করেনি, বরং দারুণ সব ম্যাচ উপহার দিয়ে দর্শকদেরও মুগ্ধ করেছে। কেপ ভার্দের কথা তো সবারই মনে আছে, তবে আরও অনেক দল অসাধারণ ফুটবল খেলেছে।’

ওয়েঙ্গারের মতে, উন্নত কোচিং পদ্ধতি এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে এখন বিভিন্ন দেশের মধ্যে ফুটবল দক্ষতার ব্যবধান আগের তুলনায় অনেকটাই কমে এসেছে।

১৯৯০ বিশ্বকাপজয়ী জার্মান দলের স্ট্রাইকার এবং সাবেক জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের কোচ ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমানও ৪৮ দলের বিশ্বকাপ নিয়ে তৃপ্ত, ‘জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, এমনকি ব্রাজিলের মতো দল অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে—যাদের আমরা শেষ আটে দেখব বলেই ধরে নিয়েছিলাম। অন্যদিকে কেপ ভার্দে, কঙ্গো ডিআর, সুইজারল্যান্ড ও নরওয়ের মতো দল দারুণ চমক উপহার দিয়েছে।’

তবে প্রশ্ন উঠেছে হাইড্রেশন বিরতি নিয়ে। এই বিরতি খেলার ফলে কতটা প্রভাব ফেলছে, সে আলোচনা শুরু থেকেই। বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া অনেক শীর্ষ কোচই এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। আবার ফিফার নিয়ম ভেঙে হাইড্রেশন বিরতিকে বাণিজ্যিক উদ্দেশে ব্যবহার করেছে অনেক সম্প্রচারকারী চ্যানেল। ওয়েঙ্গার হাইড্রেশন বিরতির পর শক্ত যুক্তি দেননি। তিনি বরং এই বিরতি পর্যালোচনার পক্ষে, ‘অনেকেই এই বিরতি পছন্দ করেননি। বিশ্বকাপ শেষে বিষয়টি আমরা বিশ্লেষণ করব। তবে আমার কাছে মনে হয়নি, এটি প্রতিযোগিতার ফলে কোনো প্রভাব ফেলেছে। আবার কিছু ম্যাচে এই বিরতি সত্যিই প্রয়োজন ছিল। যেসব স্টেডিয়াম ছাদে ঢাকা ছিল, সেখানে অনেকেই এই বিরতির পক্ষে ছিলেন না।’

ফাইনালের আগে ২০২৬ বিশ্বকাপ পর্যালোচনা করে টিএসজির পরিসংখ্যানে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে দূরপাল্লার শটে। পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া শটের হার ২০২২ বিশ্বকাপের মতোই থাকলেও সেখান থেকে গোলের হার দ্বিগুণ বেড়ে ৮ শতাংশ থেকে ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে। ক্লিন্সমান মনে করেন, এর অন্যতম কারণ অনেক দলের রক্ষণাত্মক কৌশল। তাঁর ব্যাখ্যা, ‘অনেক কোচই লো ব্লকে রক্ষণ সাজিয়েছেন। বক্সের বাইরে থেকে বেশি শট নেওয়া হয়েছে এবং সেখান থেকেই বেশি গোল এসেছে। ২০ থেকে ২২ গজ দূর থেকে অনেক খেলোয়াড়ের ভিড়ের মধ্য দিয়ে আসা শট গোলরক্ষকদের জন্য ঠেকানো খুব কঠিন হয়ে পড়ে।’

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল গোলরক্ষকদের বল ধরার পরিবর্তে ঘুষি (পাঞ্চ) মেরে দূরে সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি। বিশেষ করে কর্নার, ফ্রি-কিক এবং ক্রস থেকে আসা বলের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। বেড়েছে গোলরক্ষকদের এক্স-ব্লক (হাত-পা ছড়িয়ে ইংরেজি ‘এক্স’ অক্ষরের মতো পুরো শরীর দিয়ে শট ঠেকানো)। সাবেক সুইস গোলরক্ষক এবং টিএসজির গোলকিপিং বিশেষজ্ঞ পাসকাল জুবারবুহলার বলেন, ‘আমাদের সময়ে গোলরক্ষকেরা বেরিয়ে এসে বলটি লুফে নেওয়ার চেষ্টা করত। কিন্তু এখন এক বা দুই মুষ্টিতে শক্তভাবে বল ঘুষি মেরে বিপদমুক্ত করাকে অনেক বেশি নিরাপদ মনে করা হচ্ছে। এটা অনেক সাহসের ব্যাপার। এই বিশ্বকাপে গোলরক্ষকদের সেই দক্ষতা দেখতে পেরে খুবই খুশি।’

একেকটা বিশ্বকাপ মানেই তো নতুন নতুন গল্প, কৌশল-দক্ষতায় নতুন নতুন দিক উন্মোচন। নতুন ইতিহাস, রেকর্ড আর কীর্তি। এরপর আবার চার বছরের অধীর অপেক্ষা। ফের সে অপেক্ষার প্রহর গোনা শুরু হয়ে গেল আজ থেকে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত