Ajker Patrika

জাতীয় পার্টি: টানা তিনবারের বিরোধী দল জায়গা পেল না সংসদে

  • ২০১৪ সালে দলটি ৩৪টি আসন পেয়েছিল, ২০১৮ সালে পায় ২২টি
  • ২০২৪ সালে ১১টি আসন পায়; যা ছিল সর্বনিম্ন
  • ভোটের হারও ক্রমান্বয়ে কমে ৩ শতাংশে নেমে আসে
  • এবারের নির্বাচনে ২০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে একটিতেও জেতেনি
শিপুল ইসলাম, রংপুর 
জাতীয় পার্টি: টানা তিনবারের বিরোধী দল জায়গা পেল না সংসদে

আগের তিন সংসদে যেভাবেই হোক বিরোধী দল ছিল জাতীয় পার্টি (জাপা)। এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই জাপার ভরাডুবি হলো। এই প্রথম দলটির কোনো প্রার্থী নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি। এমনকি জাপার ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের একটিতেও জয় পায়নি দলটি। একে জাপার দীর্ঘ তিন দশকের প্রভাবের অবসান হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

জাতীয় সংসদগুলোর ফল বিশ্লেষণে জাপার ধারাবাহিক পতনের চিত্র উঠে আসে। ২০১৪ সালে দলটি ৩৪টি, ২০১৮ সালে ২২টি এবং ২০২৪ সালে মাত্র ১১টি আসন পায়; যা ছিল ইতিহাসে সর্বনিম্ন। ভোটের হারও ক্রমান্বয়ে কমে প্রায় ৩ শতাংশে নেমে আসে। এবারের নির্বাচনে জাপা ২০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে একটিতেও জয়ী হতে পারেনি।

ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, রংপুর-৩ আসনে দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের তৃতীয় অবস্থানে নেমে গেছেন। গাইবান্ধা-১ আসনে মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারীও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকতে পারেননি। তিনি জামানত রক্ষার মতো ভোটও পাননি।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার রাজনীতি করায় জাপা নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান হারিয়েছে। ভোটারদের চোখে তারা কার্যকর বিরোধী শক্তি হয়ে উঠতে পারেনি। ২০১৯ সালে এরশাদের মৃত্যুর পর দলীয় কোন্দল প্রকট হয়। রওশনপন্থী ও কাদেরপন্থী বিভক্তি তৃণমূল পর্যন্ত প্রভাব ফেলে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব মাঠপর্যায়ের সংগঠনকে দুর্বল করে দেয়। দীর্ঘদিন সাংগঠনিক পুনর্গঠন না হওয়ায় ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে সক্রিয়তা কমে যায়। অনেক নেতা-কর্মী নিষ্ক্রিয় এবং অন্য দলে যোগ দেন। তরুণ ভোটারদের জন্য আলাদা রাজনৈতিক ভিশন বা উন্নয়ন-পরিকল্পনা তুলে ধরতে পারেনি দলটি। ফলে ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক ভেঙে যায়।

রংপুরের রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, ‘জাতীয় পার্টির ভেতরে গণতন্ত্র নেই, দলের ভেতরে সমন্বয় নেই। তাদের অঙ্গ-সংগঠনগুলোর কার্যক্রম চোখে পড়ার মতো নয়। তৃণমূলের নেতাদের অবমূল্যায়ন, তৃণমূলের সঙ্গে যোগযোগ কম, যারা এ অঞ্চলের ভোটার ছিল; দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকেও তারা এমপি করেছে, তাঁর ছেলেকে এমপি করেছে, তাঁর ভাইকে এমপি করেছে। কিন্তু রংপুর অঞ্চলের মানুষের জন্য তেমন কিছু উন্নতি করতে না পারায় মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।’

  • জাপার তৃণমূলের নেতারা বলছেন, ক্ষমতার মোহে জাতীয় পার্টিও আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির কারণে লাঙ্গলবিমুখ হয়ে পড়েন রংপুরের মানুষ। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে বিভক্ত হয়ে পড়েন নেতা-কর্মীরাও। এর ফল হাতেনাতে পাওয়া যায় ভোটের মাঠে। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জাতীয় পার্টিও কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
  • নাম প্রকাশ না করে দলটির রংপুর সদরের একজন সাবেক ছাত্রনেতা বলেন, ‘জাতীয় পার্টি এখনো ব্যক্তিনির্ভর। নতুন নেতৃত্ব উঠে আসার সুযোগ কম। তরুণদের কাছে আমরা গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছি।’
  • এদিকে ভোটের দিন থেকে দেখা মেলেনি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের। দলটির কো-চেয়ারম্যান মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা ও মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারীর সঙ্গে কথা বলার জন্য যোগযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁরা ফোন ধরেননি।

বদরগঞ্জের আমরুলবাড়ি গ্রামের তরুণ ভোটার মেনাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা জন্মের পর থেকে এখানে জাতীয় পার্টির জয়জয়কার দেখেছি। কিন্তু মানুষের জন্য তেমন কিছু করতে পারেনি তারা। নতুন প্রজন্ম নিয়ে তাদের কোনো অ্যাজেন্ডা নেই। তাই আমরা নতুন নেতৃত্বে ভরসা রেখেছি।’

নগরীর মেডিকেল পূর্বগেট এলাকার ভোটার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা পরিবর্তন চেয়েছি। যারা মাঠে ছিল, মানুষের পাশে ছিল, তাদেরই ভোট দিয়েছি।’

প্রসঙ্গত, এবারের নির্বাচনে বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে রংপুর জেলার ৬টির ৫টিতে জামায়াত ও একটিতে এনসিপি, গাইবান্ধার ৫টির ৪ টিতে জামায়াত ও একটিতে বিএনপি, কুড়িগ্রামের ৪টির ৩টিতে জামায়াত ও একটিতে জোট-সমর্থিত এনসিপি, নীলফামারীর ৪টির সবগুলোতে জামায়াতের প্রার্থী জয়লাভ করেন।

এদিকে পঞ্চগড়ের দুটি আসনের দুটিতেই বিএনপি, ঠাকুরগাঁওয়ের তিনটির তিনটিতে বিএনপি এবং দিনাজপুরের ৬টির ৫টিতে বিএনপি এবং একটিতে স্বতন্ত্র (বিএনপি বিদ্রোহী) প্রার্থী জয়লাভ করেন।

অথচ ১৯৯১ সালে রংপুরের ৩৩ আসনের মধ্যে জাপা পায় ১৭টি, ১৯৯৬ সালে ২১ টি। কিন্তু ২০০১ সালে তা নেমে আসে ১৪টিতে, ২০০৮ সালে আরও একটি কমে ১৩টি হয়। ২০১৪ সালে ৭টি ও ২০১৮ সালেও ৭টি এবং ২০২৪ সালে ৩টি আসন পায়। এবারের নির্বাচনে শূন্য—যা দলটির ইতিহাসে নজিরবিহীন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন আজকের পত্রিকাকে বলেন, গত তিন সংসদে গৃহপালিত বিরোধী দলের তকমা জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে ছিল। যখন বিরোধী দলে থেকে সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক অবস্থান একাত্ম হয়ে যায়, তখন জনগণের সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়। ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ দল ও শাসন এক করে ফেলেছিল, যে কারণে দলটির রাজনৈতিক সত্তা আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে গিয়েছে। জাপার ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটেছে। গৃহপালিত বিরোধী হওয়ার কারণে ক্ষমতার ভাগ ছিল, তখন জনগণের সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সেটার ফল আমরা দেখতে পেয়েছি এবারের নির্বাচনে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত