Ajker Patrika

৮ লাখ ৩৯ হাজার কোটির ছায়া বাজেট: পঞ্জিকাবর্ষের সঙ্গে মিলিয়ে অর্থবছর চায় জামায়াত

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
৮ লাখ ৩৯ হাজার কোটির ছায়া বাজেট: পঞ্জিকাবর্ষের সঙ্গে মিলিয়ে অর্থবছর চায় জামায়াত

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের একটি ছায়া বাজেট পেশ করেছে জাতীয় সংসদে বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তাদের বাজেটের আকার ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা।

রাজধানীর মগবাজারে আল ফালাহ মিলনায়তনে গতকাল মঙ্গলবার ‘জনমুখী বাজেট ২০২৬-২৭ প্রস্তাবনা’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে এই বাজেট উপস্থাপন করেন জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম খান মিলন। অনুষ্ঠানে দলের আমির শফিকুর রহমান জানান, জুলাই-জুনের বদলে পঞ্জিকাবর্ষ ধরে অর্থবছর হিসাব করার দাবি জানিয়ে জাতীয় সংসদে প্রস্তাব দেবে তাঁর দল।

প্রস্তাবিত ছায়া বাজেটে মোট রাজস্ব আয় ও বৈদেশিক অনুদান মিলিয়ে প্রাপ্তির পরিমাণ ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৭১ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা। এর ফলে সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২.৪৩ শতাংশ। অনুদান বাদ দিলে ঘাটতির পরিমাণ ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা বা জিডিপির ২.৫১ শতাংশ।

মোট রাজস্ব প্রাপ্তি ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে কর খাত থেকে আদায়ের লক্ষ্য ৫ লাখ ৯৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিয়ন্ত্রিত কর থেকে আদায়ের লক্ষ্য ৫ লাখ ৭৩ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা এবং এনবিআর বহির্ভূত কর থেকে ২২ হাজার কোটি টাকা। কর বহির্ভূত আয় ধরা হয়েছে ৭০ হাজার কোটি টাকা। বৈদেশিক অনুদানের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৫ হাজার ২৫০ কোটি টাকা।

জামায়াতের পেশ করা এই ছায়া বাজেটে ব্যয়ের মধ্যে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৮৯ হাজার ৭১২ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ। পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে আবর্তক ব্যয় ৫ লাখ ৫০ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা। সুদ পরিশোধে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। মূলধন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। খাদ্য হিসাব খাতে বরাদ্দ ঋণাত্মক ৩২০ কোটি টাকা এবং ঋণ ও অগ্রিম (নিট) খাতে বরাদ্দ ৯ হাজার ৬২ কোটি টাকা।

উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ৪১ হাজার ৫১ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এডিপি বহির্ভূত বিশেষ প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা। ক্ষুদ্র খাতে ৪ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা এবং কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি ও স্থানান্তর খাতে ২ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে।

খাতভিত্তিক বরাদ্দে জনপ্রশাসন খাতে সর্বোচ্চ ২ লাখ ২ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ২৪ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ সুদ পরিশোধ খাতে—১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বা মোট বাজেটের ১৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

এ ছাড়া পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৬৫ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা বা মোট বাজেটের ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। কৃষি খাতে বরাদ্দ ৫১ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাতে বরাদ্দ ৪৮ হাজার ১৫০ কোটি টাকা বা ৫.৭৪ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ৪৫ হাজার ২৮০ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৫.৩৯ শতাংশ। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৫ হাজার ২২০ কোটি টাকা বা ৫.৩৯ শতাংশ।

প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ ৪৩ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৫.১৮ শতাংশ। জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ ৩৪ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা বা ৪.১০ শতাংশ। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ ২৪ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ২.৯৭ শতাংশ। গৃহায়ণ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫ হাজার ৭৮ কোটি টাকা এবং শিল্প ও অর্থনৈতিক সার্ভিস খাতে ৫ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। বিনোদন, সংস্কৃতি ও ধর্ম খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থবছরকে পঞ্জিকাবর্ষের সঙ্গে মিলিয়ে করার প্রস্তাব দেবেন বলে জানিয়েছেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমাদের অর্থবছর হচ্ছে জুলাই থেকে জুন। জুন মাস বর্ষা, খরা, দুর্যোগ, সাইক্লোন—এগুলোতে সাধারণত আমাদের দেশ আক্রান্ত হয়। আমরা লক্ষ করি, এডিপির একটা বিশাল অংশ শেষের দুই মাসে তাড়াহুড়া করে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়। এটি বাস্তবায়ন নয়, এটি হচ্ছে গণলুটপাট। এর সুফল জনগণ পায় না। কিছু অসৎ সুবিধাভোগীর পকেটে সুফল চলে যায়।’

জামায়াত আমির আরও বলেন, ‘আমরা সংসদে প্রস্তাব দেব, আমাদের অর্থবছর ক্যালেন্ডার ইয়ারের সাথে মিলিয়ে করা হবে। তাহলে বর্ষার পানিতে আমাদের টাকাগুলো ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাবে না। এই টাকাগুলোর খবর পাওয়া যাবে।’

জামায়াতের আশঙ্কা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে মন্তব্য করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আর্থিক, রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক, সাংবিধানিক—সব জায়গায় নির্লজ্জ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ একেবারেই স্পষ্ট। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যাংক, বিমা করপোরেশন—সব কটিতে আজ সেই থাবা বিস্তৃত হচ্ছে। সমাজের অপরাধী লোকদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাদের বিরুদ্ধে অপরাধ বিভিন্নভাবে প্রমাণিত। এভাবে যদি দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর রাজনৈতিক অন্যায্য হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকে, তাহলে জাতির গন্তব্য কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটি নিশ্চিত নয়।’

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি লাগবে। যদি এগুলো না থাকে, তাহলে যে বাজেটই সরকার দিক, ওই বাজেট কার্যকর হবে না।’

দেশের কর আদায়ের পদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, জনগণ তিনটা কর দেয়—একটা ট্রেজারিতে জমা হয়; একটা যায় কিছু ব্যক্তির পকেটে, যারা কর আদায় করে; আরেকটা যায় চাঁদাবাজদের পকেটে।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম, নায়েবে আমির মজিবুর রহমান, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমাদ আলী কাসেমী, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, জাগপার সভাপতি তাসমিয়া প্রধান প্রমুখ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত