Ajker Patrika

গণভোটে এক পক্ষ সরব, আরেক পক্ষ নীরব

  • এবারই প্রথম সাধারণ নির্বাচনের সঙ্গে হচ্ছে গণভোট।
  • সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে, চায় দলগুলোও করুক
  • ‘না’ ভোট জিতলে জাতি মাশুল দেবে: সুজন সম্পাদক
তানিম আহমেদ, ঢাকা 
গণভোটে এক পক্ষ সরব, আরেক পক্ষ নীরব

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হচ্ছে অনেকটা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। এবারই প্রথম কোনো সাধারণ নির্বাচনের সঙ্গে পৃথক ব্যালটে হচ্ছে গণভোট। জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সংক্রান্ত সুপারিশকে আইনি ভিত্তি দেওয়া নিয়েই এই গণভোট। ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার।

দলের প্রতীকে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তবে আনুষ্ঠানিক প্রচারের তিন দিনেও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব গণভোট নিয়ে বক্তব্য দেননি। বিএনপির তৃণমূলের কিছু জায়গায় ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচার দেখা গেলেও দলের নীতিনির্ধারকেরা জানিয়েছেন, দলের অবস্থান ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষেই।

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এক বছরের বেশি সময় আলোচনা করে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এটিকে চূড়ান্ত বৈধতা দেওয়া তথা বাস্তবায়নের জন্য গণভোটের সুপারিশ করেছিল কমিশন। তাদের সুপারিশের আলোকে সরকার জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে। এতে বলা হয়েছে, নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। কোনো কোনো মহলের পক্ষ থেকে আগেই গণভোট করার দাবি থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা একই দিনে হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়।

সংস্কার বিষয়ে গণভোট-সংক্রান্ত সরকারি জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজকে। এরই মধ্যে সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে দেশজুড়ে প্রচার শুরু করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও প্রচার করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তী সরকারের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালানো নিরপেক্ষতা ভঙ্গের শামিল বলে কোনো কোনো মহল থেকে অভিযোগ করা হলেও সরকার এর পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেছে।

২২ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয়েছে। সেদিন সিলেটে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সিলেটের জনসভা শেষে সড়কপথে ঢাকায় ফেরার সময় আরও ছয়টি নির্বাচনী জনসভা করেন তিনি। এসব সভায় বিএনপির পক্ষ থেকে গণভোটের বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

একই দিন রাজধানীর মিরপুরে জামায়াত ও এনসিপির নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচনী জনসভা করে। সেখানে নেতারা জোটের প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতেও জনগণকে অনুরোধ করেন। ওই দিন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এবারের নির্বাচন কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন নয়; একটি গণভোটও আছে। আমরা সবাই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেব।’

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার করতে অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা লক্ষ রাখছি অনেক রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে, এমনকি স্থানীয়

পর্যায়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে গণভোটের পক্ষে প্রচার করছে বলে আমরা দেখতে পাচ্ছি। কিছু দল তো সুস্পষ্টভাবে অবস্থান নিয়ে গণভোটের পক্ষে প্রচার করছে। সামনে রাজনৈতিক দলগুলো আরও শক্তিশালী প্রচারে অংশ নেবে বলে আমরা আশা করছি।’

‘হ্যাঁ ভোটের বিষয়ে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। ...নেগেটিভ ক্যাম্পেইন করছে না। কেউ করলে আমরা তা জানি না। সেলিমা রহমান স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিএনপি

শুক্রবার পর্যন্ত বড় দুটি রাজনৈতিক জোটের প্রচারের বিষয়ে জানতে চাইলে আলী রীয়াজ বলেন, ‘প্রথম দিনের প্রচারে গণভোটের কথা অনেক ক্ষেত্রে এসেছে, অনেক ক্ষেত্রে হয়তো আসেনি। তবে আমরা অতটা ঘনিষ্ঠভাবে লক্ষ করেছি দাবি করা সঠিক হবে না।’

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে গণভোটে বিএনপির অবস্থান নিয়ে দলটির নেতা-কর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য দিচ্ছিলেন। তাঁদের কেউ ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে, আবার কেউ ‘না’ ভোটের পক্ষে ছিলেন। শুরু থেকে দলটির নেতারা বলছেন, গণভোটের প্রচারের দায়িত্ব সরকারের। জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘জনগণের দায়িত্ব ভোট দেওয়া—‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়া। জনগণ যা করে, তা-ই হবে।’ তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটি সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান স্পষ্টভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষেই বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা সংস্কারের পক্ষে। আমরা গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেব, এটাই আমাদের সিদ্ধান্ত।’

সার্বিকভাবে দলটির নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, গণভোটে বিএনপির অবস্থান ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে এবং এ বিষয়ে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ। এ বিষয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান গতকাল শনিবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘হ্যাঁ ভোটের বিষয়ে আমরা তো অঙ্গীকারবদ্ধ।’

বিএনপির নির্বাচনী প্রচারের দায়িত্বে থাকা একাধিক ব্যক্তি আজকের পত্রিকাকে বলেছেন, গণভোটের প্রচার নিয়ে দলের পক্ষ থেকে তেমন নির্দেশনা নেই। এখন দলীয় মার্কার পক্ষে প্রচারকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে গণভোট নিয়ে প্রচার করলে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষেই করা হবে।

গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘না’ ভোটের পক্ষে বিএনপির এক তৃণমূলের নেতার প্রচারের ভিডিও ছড়ায়। তবে ওই নেতা দাবি করেছেন, মুখ ফসকে এ কথা বলে ফেলেছেন তিনি।

বিএনপির নির্বাচনী প্রচারে গণভোটের বিষয়টি এখনো দৃশ্যমান নয় এবং তৃণমূলের কোথাও কোথাও ‘না’-এর পক্ষে প্রচার চলছে—এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জ্যেষ্ঠ নেতা সেলিমা রহমান বলেন, ‘নেগেটিভ ক্যাম্পেইন করছে না। কেউ করলে আমরা তা জানি না।...সরকার তো প্রচারণা করছে...ভালোই তো প্রচার হচ্ছে। প্রচারের সময় অনেকে অনেক কথা বলে। এখন যে যার মতো কথা বলছে। এখানে বাধা দেওয়ারও কিছু নাই, কিছু বলারও নাই।’

‘হ্যাঁ’ ভোট মানে হলো—আমূল সংস্কার, হাদিসহ সব গণহত্যার বিচার করা, দেশে আর ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে দেওয়া হবে না। শফিকুর রহমান আমির, জামায়াতে ইসলামী

অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘প্রথম দু-এক দিনের প্রচারে দল তো নিজেদের বিষয়ে প্রাধান্য দেবেই; বিশেষ করে কেন্দ্রীয় নেতারা দলের অবস্থান ব্যাখ্যা করছেন। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বেশ কয়েকটি জনসভা করেছেন, দীর্ঘদিন পরে তিনি সরাসরি উপস্থিত হয়ে মানুষের সামনে বক্তব্য দিচ্ছেন। ফলে দলের অনেকগুলো বিবেচনা তাঁর কাছে থাকছে।’

গণভোট প্রসঙ্গে আলী রীয়াজ আরও বলেন, ‘শফিকুর রহমান সাহেব ও নাহিদ ইসলামের প্রচারে কিছু কিছু উল্লেখিত হয়েছে বলে আমরা জানি। দলগুলোর প্রচারণা এগিয়ে গেলেই আমরা তাঁদের সঙ্গে আরেক দফা প্রকাশ্যে আলোচনা করব এবং বিভিন্নভাবে তাঁদের প্রচারে উৎসাহিত করতে যোগাযোগ করব।’

এদিকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার পক্ষে নির্বাচনী জনসভায় নানা বক্তব্য দিচ্ছে জামায়াত ও এনসিপি। তাদের কর্মী-সমর্থকেরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার করছেন। গতকাল সিরাজগঞ্জের নির্বাচনী জনসভায় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে হলো—আমূল সংস্কার, হাদিসহ সকল গণহত্যার বিচার করা, দেশে আর ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে দেওয়া হবে না, আর কোনো আধিপত্যবাদের দালালকে বাংলার জনগণ বরদাশত করবে না, কোনো চাঁদাবাজের অস্তিত্ব বাংলার জমিনে বরদাশত করা হবে না।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারের জন্য শুক্রবার ২৩৮টি আসনে দলীয় প্রতিনিধি ঘোষণা করেছে এনসিপি। এ প্রচারণার কাজে আজ রোববার রাত থেকে দেশজুড়ে নির্বাচনী পদযাত্রা করবে দলটি।

অন্যদিকে গত তিন জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচার করবে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে।

গণভোটের প্রচারের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও সক্রিয় হওয়া দরকার বলে মনে করেন নাগরিক অধিকার ও গণতন্ত্র নিয়ে কাজ করা সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘দলগুলো ‘হ্যাঁ’ নাকি ‘না’-এর পক্ষে, সে বিষয়ে তাদের সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। গণভোটের বিষয়ে দলগুলো সুস্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করেছে। গণভোটে ‘না’ ভোট বিজয়ী হলে তার জন্য জাতিকে মাশুল দিতে হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে কী ব্যাখ্যা দিল আইসিসি

প্যারোলে মুক্তি মেলেনি ছাত্রলীগ নেতার, কারাফটকে দেখলেন মৃত স্ত্রী-সন্তানের মুখ

৫০ পর্যন্ত গুনতে না পারায় ৪ বছরের কন্যাকে পিটিয়ে হত্যা করল বাবা

অনুমতি ছাড়া বাংলাদেশ ছাড়ল রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৯ ভারতীয় কর্মকর্তা

যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কৌশলে বড় পরিবর্তন, চীন আর প্রধান হুমকি নয়

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত