Ajker Patrika

সমন্বয়কদের অর্ধেক এনসিপিতে

  • ২৬ জন এনসিপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনে।
  • ১ জন বিএনপিতে।
  • ১০ জন অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও প্ল্যাটফর্মে।
  • ১৩ জন রাজনীতির বাইরে রয়েছেন।
অর্চি হক, ঢাকা 
সমন্বয়কদের অর্ধেক এনসিপিতে
সরকার পতন এবং শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে আসেন জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সমন্বয়কেরা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁওয়ে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের কার্যালয়ে হয় এই সংবাদ সম্মেলন। ফাইল ছবি

চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সময়ের প্রয়োজনে আন্দোলনের মাঠে গড়ে ওঠা এই সংগঠনের নেতাদের পরিচয় ছিল ‘সমন্বয়ক’ ও ‘সহসমন্বয়ক’। সফল আন্দোলন শেষে তাঁদের বেশির ভাগ এখন সক্রিয় হয়েছেন রাজনীতিতে।

অভ্যুত্থানের পর সমন্বয়কদের নেতৃত্বেই জন্ম হয়েছে নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। স্বাভাবিকভাবে সমন্বয়কদের বেশির ভাগ তাই এখন আছেন দলটিতে। কেউ কেউ অন্য রাজনৈতিক দল বা প্ল্যাটফর্মে যোগ দিয়েছেন। আবার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সমন্বয়ক সক্রিয় রাজনীতির বাইরে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত জীবনে মনোযোগ দিয়েছেন। কেউ বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে না পেরে আনুষ্ঠানিক রাজনীতি থেকে বিরতি নিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, রাজনীতির পথচলা কঠিন। গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া সবাই রাজনৈতিক দল গঠন বা দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে মাঠে নামেননি। অনেকের লক্ষ্য ছিল একটি কর্তৃত্ববাদী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা এবং গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পরিবর্তন আনা। তাই আন্দোলনের পর কেউ কেউ রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন, আবার কেউ কেউ রাজনীতির বাইরে থেকেছেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ৮ জুলাই প্রথম সমন্বয়ক কমিটি গঠন করা হয়। ওই দিন এই প্ল্যাটফর্মের ৬৫ সদস্যের প্রথম কেন্দ্রীয় কমিটির তালিকা প্রকাশ করা হয়। এই কমিটিতে সমন্বয়ক পদে ছিলেন ২৩ জন। আর সহসমন্বয়ক ছিলেন ৪২ জন। এরপর ৩ আগস্ট ‘সমন্বয়ক টিমের’ নতুন তালিকা প্রকাশ করা হয়। ১৫৮ সদস্যের সেই তালিকায় সমন্বয়ক পদে ছিলেন ৪৯ জন। আর সহসমন্বয়কের দায়িত্ব পান ১০৯ জন। আন্দোলন চলাকালে প্রকাশিত এই দুই তালিকা মিলিয়ে ‘সমন্বয়ক’ পদে ছিলেন মোট ৫০ জন।

বড় অংশ এনসিপিতে

জুলাই অভ্যুত্থানের পর দুই বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। ৫০ সমন্বয়কের বর্তমান অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২৬ জন বা ৫২ শতাংশ এনসিপি বা এনসিপির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনে রয়েছেন। মাত্র ১ জন অর্থাৎ মোট সমন্বয়কের ২ শতাংশ আছেন বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপিতে। ১০ জন বা ২০ শতাংশ অন্যান্য রাজনৈতিক দল, সংগঠন বা প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়েছেন। আর ১৩ জন বা ২৬ শতাংশ বর্তমানে আনুষ্ঠানিক রাজনীতির বাইরে আছেন।

সমন্বয়কদের একটি অংশ আনুষ্ঠানিক রাজনীতির বাইরে থাকার বিষয়টিকে স্বাভাবিক বলছেন জুলাইয়ের অন্যতম সমন্বয়ক ও বর্তমানে এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব মাহিন সরকার। তিনি বলেন, আন্দোলনে বিভিন্ন মত ও আদর্শের মানুষ ছিল। তাই কেউ নিজের জায়গা থেকে কাজ করবে, কেউ আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে যাবে, কেউ যাবে না—এটাই স্বাভাবিক।

সমন্বয়কদের মধ্যে যাঁরা এনসিপিতে আছেন, তাঁরা হলেন নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, মাহিন সরকার, আবদুল হান্নান মাসউদ, আদনান আবির (আকরাম হোসেন), প্রীতম সোহাগ, নুসরাত তাবাসসুম, রাসেল আহমেদ, আসাদুল্লাহ আল গালিব, হাসিব আল ইসলাম, লুৎফর রহমান, আহনাফ সাঈদ খান, ওয়াহিদুজ্জামান ও তারেক রেজা।

আর এনসিপির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তিতে রয়েছেন আবু বাকের মজুমদার, রাফিয়া রেহনুমা হৃদি, তৌহিদ আহমেদ আশিক, তাহমিদ আল মুদ্দাসসির চৌধুরী ও আবু সাঈদ।

এ ছাড়া এনসিপির যুব সংগঠন জাতীয় যুবশক্তিতে রয়েছেন রিফাত রশিদ, হামজা মাহবুব, তরিকুল ইসলাম ও আসাদ বিন রনি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এনসিপিপন্থী ধারায় রয়েছেন সিনথিয়া জাহিন আয়েশা।

বিএনপিতে ১ জন

৫০ সমন্বয়কের মধ্যে একজনই যোগ দিয়েছেন বিএনপিতে। তিনি হলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) আবদুর রশিদ জিতু। গত বছরের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত জাকসু নির্বাচনে ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন’ প্যানেলের প্রার্থী হিসেবে জিতু ভিপি নির্বাচিত হন। এরপর চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন।

১০ জন অন্য রাজনৈতিক দল ও প্ল্যাটফর্মে

সমন্বয়কদের মধ্যে বর্তমানে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গণবিপ্লবী উদ্যোগে রয়েছেন আরিফ সোহেল, আবদুল্লাহ সালেহীন অয়ন, সানজানা আফিফা অদিতি ও তানজিনা তাম্মিম হাপসা।

জুলাই অভ্যুত্থানের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে পরিচিত মাজফুজ আলমের গড়ে তোলা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম অলটারনেটিভস বলয়ে রয়েছেন আনিকা তাহসিনা ও রেজোয়ান রিফাত। তাঁরা দুজনই অলটারনেটিভসের ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রসভায় যুক্ত আছেন।

এ ছাড়া ছাত্র অধিকার পরিষদে আছেন নাজমুল হাসান এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টে শাহিনুর সুমী। জুলাই রাজবন্দী অ্যালায়েন্স নামের প্ল্যাটফর্মে রয়েছেন ইব্রাহীম নিরব এবং রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনে’ (এনপিএ) রয়েছেন নাজিফা জান্নাত।

রাজনীতির বাইরে ১৩ জন

জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেও বর্তমানে রাজনীতির বাইরে রয়েছেন আব্দুল কাদের ও উমামা ফাতেমা। এ ছাড়া জামান মৃধা (মোবাশ্বির), মুমতাহীনা মাহজাবিন মোহনা, আলিফ হোসাইন, কাউসার মিয়া, মোয়াজ্জেম হোসেন, নিশিতা জামান নিহা, মেহেদী হাসান, সাইফুল ইসলাম, স্বর্ণা রিয়া, গোলাম কিবরিয়া চৌধুরী মিশু ও সাবিনা ইয়াসমিন এখন রাজনীতিতে সক্রিয় নন।

আন্দোলনের সময় পরিস্থিতির প্রয়োজনেই তিনি মাঠে ছিলেন বলে জানান চব্বিশের অন্যতম সমন্বয়ক উমামা ফাতেমা। তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের পরপরই কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়ে সেটাকেই ক্যারিয়ার বানানোর মানসিকতা আমার ছিল না। আগে নিজেকে প্রস্তুত করতে চেয়েছি। পড়াশোনা, চিন্তাভাবনা—সব গুছিয়ে তারপর সিদ্ধান্ত নিতে চাই।’

আর আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ এবং ৯ দফার ঘোষক আব্দুল কাদের জানান, বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে তিনি নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছেন না। তাই আপাতত আনুষ্ঠানিক রাজনীতি থেকে বিরতি নিয়েছেন।

কাদের বলেন, ‘রাজনীতি ছেড়ে দিচ্ছি, এমন নয়। তবে যে ধরনের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি আছে, সেখানে আমি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছি না। আপাতত ক্যারিয়ার ও পরিবারে সময় দিচ্ছি।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা এই ৫০ সমন্বয়কের বর্তমান অবস্থান দেখলে স্পষ্ট হয়, আন্দোলনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখন পর্যন্ত এনসিপির দিকেই সবচেয়ে বেশি কেন্দ্রীভূত হয়েছে। আবার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সমন্বয়কের এখনো কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নেই। এ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, জুলাইয়ের নেতৃত্বের একটি অংশ ভবিষ্যতের রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে এখনো অপেক্ষার পথেই রয়েছেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, পরিবর্তন আনার লক্ষ্য থেকেই সমন্বয়কেরা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। আর পরিবর্তনের একটি মাধ্যম হলো রাজনীতি। তাই স্বাভাবিকভাবেই অভ্যুত্থানের পরে সমন্বয়কেরা রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন।

তবে যাঁরা এখনো কোনো রাজনৈতিক দল বা প্ল্যাটফর্মে যোগ দেননি, তাঁরা রাজনীতির বাইরে আছেন—এমনটি বলা ঠিক হবে না বলে মনে করেন বদিউল আলম। তিনি বলেন, হয়তো এখনো কোনো দল তাঁদের পছন্দ হয়নি, কিংবা তাঁরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত