
ছাত্র–জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনার পতনের পর প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। আন্দোলন দমনে দীর্ঘদিনের শাসক, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কঠোর ও সহিংস দমন-পীড়ন করেছেন বলে আদালতের রায় আছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে, শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ মানুষ। একে এ বছরের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক অনুশীলন বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। এই প্রথমবারের মতো বিদেশে বসবাসরত প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। দেশের অর্থনীতির জন্য তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি বর্তমানে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনাধীন। বাংলাদেশের নির্বাচন ঐতিহাসিকভাবে ব্যাপক রাজনৈতিক প্রচার, বর্জন এবং কারচুপির অভিযোগে ভরা। দীর্ঘদিন দেশের রাজনীতি মূলত দুটি দলের দখলে ছিল। একটি শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ। অন্যটি প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–বিএনপি। তবে বর্তমানে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ। দলের নেত্রী শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনে নির্মম সহিংসতার অভিযোগে ফৌজদারি মামলা চলছে।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে অনুপস্থিতিতেই বিচার হয়েছে। সেই বিচারে তাঁর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিনি ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন এবং ভারত সরকার এখনো তাঁকে প্রত্যর্পণে সম্মত হয়নি।
বাংলাদেশে বর্তমানে এক কক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা চালু। জাতীয় সংসদে মোট আসন ৩৫০ টি। এবারের নির্বাচনে ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামি দুটি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল। উভয় দলই একাধিক দল নিয়ে গঠিত জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশে সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর পরপর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১১টি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসেছে। তবে এই সময়ের মধ্যে কয়েক দফা সামরিক শাসনের অধ্যায়ও ছিল। নিচে বাংলাদেশের অতীত নির্বাচনের একটি সময়রেখা তুলে ধরা হলো।
বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানের অংশ ছিল, তখন ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দুটি অঞ্চল ভারতের কারণে ভৌগোলিকভাবে আলাদা ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠী তখন জোরালোভাবে স্বাধীনতার দাবি তুলছিল।
সে সময় বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ১৬২টি আসনের প্রায় সবকটিতেই জয় পায়। সে সময় পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের মোট আসন ছিল ৩১৩টি। এই ফলাফলের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ পুরো পাকিস্তানেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। সংবিধান অনুযায়ী এতে শেখ মুজিবুর রহমানের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক সরকার তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়নি। প্রতিবাদে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান এক উত্তাল ভাষণ দেন। এরপর পাকিস্তান সেনাবাহিনী রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষের ওপর ভয়াবহ হামলা চালায়। এর মধ্য দিয়েই ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়। এই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালিদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন চালানো হয়। জাতিসংঘের হিসাবে, প্রায় ৩০ লাখ মানুষ নিহত হন। প্রায় ২ লাখ নারী ধর্ষণের শিকার হন।
যুদ্ধ শুরুতেই শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে তাঁর অনুপস্থিতিতে একটি অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। এই সরকার ভারতের কলকাতা থেকে নির্বাসনে পরিচালিত হয়। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি পান। এরপর তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭৩ সালের মার্চে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনটি ছিল বিতর্কিত। পরে এটি শেখ মুজিবুর রহমানের কর্তৃত্ববাদী শাসনের একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়। এই নির্বাচনে মোট ১৪টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয় অর্জন করে। দলটি মোট ভোটের প্রায় ৭৩ শতাংশ পায়। ৩০০টি নির্বাচিত আসনের মধ্যে ২৯৩টিই তারা দখল করে।
যদিও আওয়ামী লীগ তখন এমনিতেই জনপ্রিয় ছিল, তবু অভিযোগ ওঠে যে—শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে অতিরিক্ত পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিল ব্যালট ভর্তি করে ভোট কারচুপি করা, বিরোধী নেতাদের ভয় দেখানো এবং গ্রেপ্তার করা।
বিরোধী দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল এবং জাতীয় লীগ মাত্র একটি করে আসন পায়। ১৯৭৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সব বিরোধী দল নিষিদ্ধ করেন। এর মাধ্যমে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু হয়। একই সঙ্গে সংসদে সাংবাদিকদের প্রবেশ ও তথ্য সংগ্রহের সুযোগও সীমিত করে দেওয়া হয়।
১৯৭৫ সালের আগস্টে রক্তক্ষয়ী এক সামরিক অভ্যুত্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হন। এই অভ্যুত্থান সংগঠিত করেন সেনাবাহিনীর মধ্যম স্তরের কিছু কর্মকর্তা। তাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন কর্নেল ফারুক রহমান। এর পরপরই তৎকালীন অর্থমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ সেনাবাহিনীর সমর্থনে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন।
খন্দকার মোশতাক আহমদ একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাতিল করেন। বিরোধী দল গঠনের সুযোগ দেন। তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসে পাল্টা অভ্যুত্থানে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন জেনারেল খালেদ মোশাররফ। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
এরপর প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি সেনাবাহিনীর সমর্থনে দেশ পরিচালনা করেন। তবে শারীরিক অসুস্থতার কারণে ১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসে তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হন। তিনি সাধারণভাবে জিয়া নামে পরিচিত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সে সময় তিনিই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা বেতারে পাঠ করেছিলেন।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমান অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেন। তিনি অর্থনীতি উদারীকরণ করেন। এতে সংকটে থাকা দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা গতি আসে। তিনি বাঙালি পরিচয়ের বদলে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ধারণা সামনে আনেন। এর ফলে আগে যেসব সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী নিজেদের বাদ পড়া মনে করত, তারা কিছুটা অন্তর্ভুক্তির সুযোগ পায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি আবার বহুদলীয় নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করেন।
১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জিয়াউর রহমানের সরকার ১৯৭৩ সালের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করে। এই নির্বাচনে তাঁর গঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) অংশ নেয়। নির্বাচনে বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জয় পায়। আওয়ামী লীগ তখন প্রধান বিরোধী দল হিসেবে ৩৯টি আসন পায়। তবে দলটি অভিযোগ তোলে, এই নির্বাচন কারচুপির মাধ্যমে করা হয়েছিল।
১৯৮১ সালের ৩০ মে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। এরপর তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন। একই বছরের নভেম্বর মাসে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজন করেন। এতে বিএনপি আবারও জয় পায়। দলটি প্রায় ৬৫ শতাংশ ভোট পায়।
কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালের মার্চ মাসে বিনা রক্তপাতে ক্ষমতা দখল করেন। তিনি সামরিক আইন জারি করেন। এরশাদ চার বছর দেশ শাসনের ১৯৮৬ সালের মে মাসে তিনি জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করেন। এতে তাঁর দল জাতীয় পার্টি ১৮৩টি আসন পায় এবং সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার কথা দিলেও, শেষ মুহূর্তে গিয়ে অংশ নেয়, এবং প্রধান বিরোধী দল হয়। তবে বিএনপিসহ অন্যা বিরোধী দলগুলো এই নির্বাচন বর্জন করে। তারা একে প্রহসন বলে দাবি করে।
১৯৮৮ সালের মার্চ মাসে আবার নির্বাচন হয়। এতে জাতীয় পার্টি ২৫৯টি আসনে জয় পায়। বিরোধী দলগুলো এই নির্বাচনকেও অনিয়ম ও কারচুপিতে ভরা বলে অভিযোগ তোলে। এরশাদের পদত্যাগ দাবিতে দেশজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়।
১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ একসঙ্গে গণআন্দোলন গড়ে তোলে। বিএনপির নেতৃত্ব দেন খালেদা জিয়া। তিনি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ছিলেন শেখ হাসিনা। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের দুই কন্যার মধ্যে বড়। এই আন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
এরপর সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। এই সরকার ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করে। এই নির্বাচনকে ব্যাপকভাবে বৈধ, মুক্ত ও সুষ্ঠু হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
এই নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসনে জয় পায়। আওয়ামী লীগ পায় ৮৮টি আসন। জাতীয় পার্টি পায় ৩৫টি আসন। এর মাধ্যমে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।
মাগুরা-২ আসনের একটি উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী জয়ী হলেও আওয়ামী লীগ অভিযোগ করে, ভোটে কারচুপি হয়েছে। এরপর তারা দাবি তোলে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের জন্য খালেদা জিয়াকে ক্ষমতা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে তুলে দিতে হবে।
এই দাবির পরও ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলো এই নির্বাচন বর্জন করে। ফলে সংসদের প্রায় সব আসনেই বিএনপি জয়ী হয়। এই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল দেশের ইতিহাসে অন্যতম সর্বনিম্ন। ভোট পড়ে মাত্র ২১ শতাংশ।
তবে সারা দেশে টানা হরতাল ও আন্দোলনের মুখে বিএনপি সরকার অল্প কয়েক দিনের মাথায় ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়। এরপর একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসে সংবিধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনা হয়। এতে বলা হয়, ভবিষ্যতে সব জাতীয় নির্বাচন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে।
এরপর ১২ জুন আবার জাতীয় নির্বাচন হয়। এই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি বেড়ে দাঁড়ায় ৭৫ শতাংশে। এই ভোটকে ব্যাপকভাবে মুক্ত ও সুষ্ঠু বলা হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসনে জয় পায়। বিএনপি পায় ১১৬টি আসন। এর মাধ্যমে শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন।
২০০১ সালের অক্টোবরে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচন তদারকি করে আরেকটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এবার বিরোধী দল বিএনপি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। দলটি সংসদে ১৯৩টি আসনে জয়ী হয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ পায় ৬২টি আসন। নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে দেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কিছু সহিংসতার খবর পাওয়া যায়। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেন।
২০০৭ সালের জানুয়ারিতে নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচনের আগে কে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হবেন, তা নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি, বিরোধী আওয়ামী লীগ ও অন্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে তীব্র বিরোধ দেখা দেয়। বিএনপি তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এক সাবেক প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার ঘোষণা দিলে সারা দেশে দাঙ্গা শুরু হয়।
শেষ পর্যন্ত বিএনপি মনোনীত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ঘোষণা করেন, কারণ কোনো ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ডিসেম্বরে প্রকাশ পায়, ভোটার তালিকায় ভুয়া নাম যুক্ত করা হয়েছে। এই তথ্য সামনে আসার পর সারা দেশে সহিংস আন্দোলন শুরু হয়। হাজার হাজার মানুষ পরিবহন ব্যবস্থা অবরোধ করে। স্কুল, কলেজ ও অফিস বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশ দীর্ঘ কয়েক মাসের রাজনৈতিক সংকটে পড়ে।
ইয়াজউদ্দিন আহমেদ জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করেন। এর ফলে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপের সুযোগ পায়। এর প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ আসন্ন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন আর অনুষ্ঠিতই হয়নি।
দীর্ঘ বিলম্বের পর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর। এই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮০ শতাংশ। এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। নির্বাচনটি মোটামুটি সুষ্ঠু বলেও মনে করা হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ একাধিক বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে ‘মহাজোট’ গঠন করে। এই জোট সংসদে ২৩০টি আসনে জয় পায়। বিএনপি পায় মাত্র ৩০টি আসন। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে নতুন সরকার গঠিত হয়। শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় ফেরেন।
২০০৯ সালের নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ার পেছনে সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি নিয়ে শেখ হাসিনার সরকার খুবই সমালোচনামুখর ছিল। ক্ষমতায় ফিরে তিনি সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেন। উদ্দেশ্য ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা। তবে ২০১১ সালের জুনে সংসদের যে অধিবেশনে এই সংশোধনী নিয়ে ভোট হয়, তা বিএনপি বর্জন করে। সংসদে ২৯১ ভোটের বিপরীতে মাত্র ১ ভোটে সংশোধনীটি পাস হয়।
এ সময় সরকার বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্ধারিত নির্বাচনের আগে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দী করা হয়। অন্যান্য বিরোধী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও সহিংসতার বহু অভিযোগ ওঠে। নির্বাচন দিনে বিএনপি ও তাদের সমর্থকেরা ভোটে অংশ নেয়নি। ফলে আওয়ামী লীগ সহজেই আবার ক্ষমতায় আসে। দলটি সংসদে ২৩৪টি আসনে জয় পায়। বাংলাদেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে এই নির্বাচনকে ব্যাপকভাবে অবৈধ বলে সমালোচনা করা হয়।
পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন হয় ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর। এই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থা চালু হয়। তবে বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দল অভিযোগ তোলে, আওয়ামী লীগ–জাতীয় পার্টি জোট নির্বাচন কারচুপি করেছে। উন্নত প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর সহিংসতা হয়। ভোট জালিয়াতির অভিযোগও ওঠে।
এই সময় আওয়ামী লীগ সরকার জামায়াতে ইসলামিকে নিষিদ্ধ করে। দলটি তখন বিএনপির মিত্র ছিল। ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনার সরকার গঠিত ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিচার হয় এবং তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
ভোটের আগে সরকার মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। সরকারের দাবি ছিল, ভুয়া খবর ছড়ানো ঠেকানোর জন্য এই সিদ্ধান্ত। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর ফলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। বিএনপির দাবি ছিল, এই মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। পরে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর খালেদা জিয়া খালাস পান।
এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ–জাতীয় পার্টি জোট সংসদের ৯০ শতাংশের বেশি আসনে জয় পায়। এই নির্বাচনও ব্যাপকভাবে প্রহসন হিসেবে বিবেচিত হয়।
শেখ হাসিনার শাসনামলে সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি। এই সময় পর্যন্ত তিনি বিরোধী রাজনীতিকদের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রাখেন। ১৯৭২ সালে গঠিত নির্বাচন কমিশনের ওপর তাঁর প্রায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে মনে করা হতো।
বিরোধী বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে। জামায়াতে ইসলামী তখনও নিষিদ্ধ ছিল। এর ফলে শেখ হাসিনা পঞ্চমবারের মতো ক্ষমতায় আসেন। তাঁর সরকার বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা সরকারে পরিণত হয়। দেশ কার্যত আবার একদলীয় ব্যবস্থার দিকে চলে যায়।
জুলাই মাসে সুপ্রিম কোর্ট সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহাল করলে দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। এই কোটা মুক্তিযোদ্ধাদের বংশধরদের অগ্রাধিকার দিত। ৪৬ বছর পুরোনো এই আইনটি ২০১৮ সালে ছাত্র আন্দোলনের পর বাতিল হয়েছিল। পুনর্বহালের ফলে আবারও হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাস্তায় নামে। এই আন্দোলনই পরে ‘জুলাই বিপ্লব’ নামে পরিচিত হয়।
কিন্তু সরকার আন্দোলন দমন করতে সহিংস পথে যায়। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে রাস্তায় বিক্ষোভকারীদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়। এতে অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান।
এরপর, ৮ আগস্ট বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও ২০০৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন।

‘সবার আগে দেশ’—এই নীতিতে অটল থেকে যেকোনো মূল্যে দেশকে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন ও জননিরাপত্তায় সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি। তারেক রহমান বলেছেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে জনগণের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সবার আগে ঠিক করা হবে। দুর্নীতির ব
১ ঘণ্টা আগে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী প্রচারাভিযানে ঢাকায় পথসভা শুরু করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আজ রোববার বিকেলে রাজধানীর ইসিবি চত্বরে পথসভা করার মধ্য দিয়ে এই কার্যক্রম শুরু করেন তিনি। ঢাকাসহ সারা দেশকে বাসযোগ্য ও নিরাপদ করার প্রতিশ্রুতি দেন এই পথসভায়।
২ ঘণ্টা আগে
ঢাকা-১৫ আসনে মিরপুর-১০ গোলচত্বর-সংলগ্ন সেনপাড়া আদর্শ সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে সাড়ে ৩টায়, ঢাকা-১৪ আসনে ন্যাশনাল বাংলা উচ্চবিদ্যালয় গেটে বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে, ঢাকা-১৩ আসনে শ্যামলী সিনেমা হলের পশ্চিম পাশে শ্যামলী ক্লাব মাঠে ৫টা ১০ মিনিটে এবং ঢাকা-১১ আসনে বাড্ডা সাঁতারকুলের সানভ্যালি মাঠে সন্ধ্যা ৬টায় জন
৩ ঘণ্টা আগে
বিগত সরকারের সমালোচনা করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, খারাপ লোকেরা পুরো ব্যবস্থাটাকে ভেঙে দিয়েছে। আমরা চাই দেশে এক ব্যক্তির শাসন লোপ পাক, দেশ যেন আর আগের মতো ফ্যাসিস্ট না হয়। সরকারে জবাবদিহি থাকতে হবে।
৩ ঘণ্টা আগে