Ajker Patrika

হাকালুকির বিপন্নতা

সম্পাদকীয়
হাকালুকির বিপন্নতা

হাকালুকি হাওর শুধু প্রাকৃতিক মাছের আধার নয়, বরং পরিবেশ রক্ষারও কবচ। এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ এই মিঠাপানির জলাভূমি আজ বিপন্নের পথে। প্রতিদিন শত শত মানুষ এই হাওর ঘিরে তাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। হাওরটির পশ্চিমে আছে ভাটেরা পাহাড় ও পূর্বে আছে পাথারিয়া মাধব পাহাড়। সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার পাঁচটি উপজেলায় বিস্তৃত এ হাওরের বর্ষাকালে আয়তন বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর। জুড়ী নদীসহ হাওরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ ১০টি নদ-নদী এবং অসংখ্য পাহাড়ি ছড়া থেকে বর্জ্য ও বালু হাওরে গিয়ে সরাসরি পড়ছে। এ কারণেই ভরাট হয়ে যাচ্ছে হাওরের অধিকাংশ বিল, নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য এবং বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে হাওর। শুধু বর্জ্য নয়, কৃষি জমিতে ব্যবহৃত কীটনাশক সরাসরি চলে যাচ্ছে হাওরে। ফলে হারিয়ে যেতে বসেছে অনেক প্রজাতির দেশীয় মাছ। অবিলম্বে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সুস্পষ্ট, সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা ছাড়া হাকালুকি হাওরকে এই করুণ পরিণতি থেকে কোনোভাবে রক্ষা করা যাবে না।

এ জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সবার আগে হাকালুকির বিলুপ্তপ্রায় ও সংকটাপন্ন বিলগুলো পুনরুদ্ধারে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। কাগজে-কলমে থাকা ২৩৮টি বিলের মধ্যে যেগুলোর অস্তিত্ব বিলীন হতে বসেছে, সেগুলোর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণে অবিলম্বে সিএস নকশা অনুযায়ী ডিজিটাল জরিপ চালানো দরকার। একই সঙ্গে নদী ও পাহাড়ি ছড়াগুলোর মাধ্যমে পলি ও বালু আসা রোধ করতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে টেকসই খনন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে শুধু বালু উত্তোলন করলেই হবে না, উজান থেকে আসা পলি আটকানোর জন্য নদীগুলোর উৎসে বৈজ্ঞানিক উপায়ে পলি-ফাঁদ নির্মাণ করতে হবে। অপরিকল্পিত বাঁধ ও উজানমুখী সড়ক নির্মাণের যে রেওয়াজ হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহকে রুদ্ধ করছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো তৈরি করার নীতি অনুসরণ করতে হবে।

হাওরের দূষণ ও অবৈধ দখল প্রতিরোধ করতে আইনের কঠোর প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। প্রশাসনিক অবহেলার কারণে সৃষ্ট দায়সারা ভাব অতিক্রম করে হাওরের তদারকির জন্য স্বতন্ত্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তৈরি করা প্রয়োজন, যে সংস্থা শুধু হাওরের জন্যই দায়িত্ব পালন করবে। এ ছাড়া ক্ষতিকর কীটনাশক এবং ক্ষতিকর সেচ পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে স্থানীয় কৃষকদের পরিবেশবান্ধব, টেকসই কৃষি ও মৎস্য চাষে উৎসাহী করতে হবে। ২৬০ প্রজাতির দেশীয় মাছের প্রজনন নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট কিছু বিলকে স্থায়ী মৎস্য অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করা এবং জলজ উদ্ভিদের পুনরুৎপাদনে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। হাকালুকি হাওর কেবল মৌলভীবাজার বা সিলেটের কোনো আঞ্চলিক সম্পত্তি নয়, এটি বাংলাদেশের পরিবেশগত সুরক্ষার এক মহামূল্যবান অংশ। সময় পার হয়ে যাওয়ার আগেই এই জাতীয় সম্পদকে রক্ষায় রাষ্ট্রকে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে, অন্যথায় প্রকৃতির এই অনন্য উপহার চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার দায় ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করবে না।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত