
দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশেই জেন-জিদের নেতৃত্বে শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে অনেকাংশে সফল আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু আন্দোলন হওয়া শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের তুলনায় পাকিস্তান অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও অন্যান্য মানব উন্নয়ন সূচকে অনেক পিছিয়ে থাকলেও দেশটির তরুণেরা এখনো সংগঠিত হয়ে শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেনি।
পাকিস্তানে তরুণদের অসন্তোষের অভাব নেই, কিন্তু সেই অসন্তোষ এখনো অভিন্ন জাতীয় রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়নি। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক দমন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সামরিক বাহিনীর প্রভাব, ইমরান খানকে ঘিরে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাত এবং মতপ্রকাশের সংকুচিত পরিসর পাকিস্তানের তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করছে। কিন্তু সেই ক্ষোভ একই জায়গায় এসে মিলছে না। এটাই দেশটির বর্তমান রাজনীতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য।
একদিকে এমন এক প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে, যারা অর্থনৈতিকভাবে অনিশ্চিত, রাজনৈতিকভাবে হতাশ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে, পাকিস্তান সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় কাঠামো এমনভাবে দৃঢ় হচ্ছে, যেখানে রাজনৈতিক বিরোধিতা ও গণ-আন্দোলনের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ফলে প্রশ্নটি শুধু ‘পাকিস্তানে জেন-জি আন্দোলন হবে কি না’ নয়, বরং প্রশ্ন হলো, এই বিচ্ছিন্ন ক্ষোভগুলো কখন এক সাধারণ রাজনৈতিক দাবিতে পরিণত হবে এবং রাষ্ট্র সেই দাবির মুখোমুখি হলে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে।
পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকট গত কয়েক বছরে দেশটির রাজনীতির অন্যতম প্রধান ইস্যু। আইএমএফের হিসাবে ২০২৬ সালে পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩.৬ শতাংশ হতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির হার ৭ শতাংশের কিছু ওপরে থাকার পূর্বাভাস আছে। অর্থাৎ সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরলেও সাধারণ মানুষের জীবনে চাপ পুরোপুরি দূর হয়নি।
এখানে জেন-জির জন্য সমস্যা শুধু মূল্যস্ফীতি নয়। তাদের জন্য বড় প্রশ্ন হলো, শিক্ষা শেষ করার পর কী হবে? চাকরি কোথায়? যোগ্যতার মূল্য কতটা? রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া সুযোগ পাওয়া যাবে কি? দেশে থেকে মধ্যবিত্ত জীবন তৈরি করা সম্ভব কি? আর যদি সম্ভব না হয়, তাহলে বিদেশে চলে যাওয়াই কি ভালো পথ?
এই প্রশ্নগুলো অর্থনৈতিক অসন্তোষকে রাজনৈতিক অসন্তোষের সঙ্গে যুক্ত করে। কারণ, একজন তরুণ যখন মনে করে—তার ভবিষ্যৎ শুধু অর্থনীতির কারণে নয়, রাজনৈতিক ব্যবস্থার কারণেও আটকে আছে, তখন তার ক্ষোভ আর শুধু চাকরির দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকে না।
পাকিস্তানে এখন ঠিক সেই জায়গাটিই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সরকারকে কিছুটা সময় দিতে পারে, কিন্তু তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দূর না হলে অর্থনৈতিক সংকটের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন।
কিন্তু আসল সমস্যা অর্থনীতির চেয়েও বড়। পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট বুঝতে হলে সামরিক বাহিনীর ভূমিকাকে পাশ কাটানো যায় না। দেশটির রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই প্রভাব শুধু রাজনৈতিক পর্দার আড়ালে থাকা কোনো ‘অদৃশ্য শক্তি’ হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতর আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
২০২২ সালে ইমরান খান সরকারের পতনের পর এই সংঘাত প্রকাশ্য রূপ নেয়। এরপর খানের দল পিটিআইয়ের ওপর চাপ, তাঁর গ্রেপ্তার, ২০২৩ সালের বিক্ষোভ এবং সামরিক স্থাপনায় হামলার পর ব্যাপক ধরপাকড় ও সামরিক আদালতে বেসামরিকদের বিচার পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে। ২০২৪ সালের নির্বাচনেও পিটিআইকে রাজনৈতিক ও আইনি বিধিনিষেধ দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। তারপরও দলটির সমর্থিত প্রার্থীরা সবচেয়ে বেশি আসন পায়।
এরপর পরিস্থিতি আরও একধাপ এগিয়েছে। ২০২৬ সালে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নিজেদের প্রভাব আরও প্রাতিষ্ঠানিক করেছে। রাজনৈতিক দমন, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ, ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনা এবং সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে তারা পাকিস্তানকে একটি ‘হার্ড স্টেট’ বা কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। পাকিস্তান এমন এক সামরিক নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থায় এগিয়েছে, যেখানে নির্বাচিত বেসামরিক সরকার থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক সিদ্ধান্তে সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্ব চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়।
এখানেই জেন-জি আন্দোলনের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, তরুণদের একটি অংশ যদি মনে করে যে—নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের মৌলিক ক্ষমতার কাঠামো বদলায় না, তাহলে তাদের রাজনৈতিক হতাশা আরও গভীর হতে পারে।
পাকিস্তানের তরুণ রাজনীতিতে ইমরান খানকে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি শুধু সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি এমন এক নেতা, যিনি বিপুলসংখ্যক তরুণকে সক্রিয় রাজনীতিতে এনেছেন। তাঁর দল পিটিআই প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে এক নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করেছিল, বিশেষ করে শহুরে ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে।
কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা আছে। ইমরান খানকে ঘিরে তরুণদের আন্দোলন আছে, কিন্তু সেটিকে সরাসরি জেন-জি আন্দোলন বলা যায় না। কারণ, পিটিআইয়ের প্রধান রাজনৈতিক দাবি এখনো অনেকাংশে ইমরান খানকেন্দ্রিক—তাঁর মুক্তি, রাজনৈতিক অধিকার, নির্বাচনী বৈধতা এবং দলের ওপর বিধিনিষেধের অবসান।
সাম্প্রতিক ঘটনাই তার প্রমাণ। পিটিআই-সমর্থকেরা ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে খাইবার পাখতুনখাওয়া থেকে ইসলামাবাদের দিকে লংমার্চ শুরু করেছে। সরকার রাজধানী ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে এবং আন্দোলন ঠেকানোর ঘোষণা দিয়েছে।
এটি পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটের গভীরতা দেখায়, কিন্তু একই সঙ্গে জেন-জি আন্দোলনের সীমাবদ্ধতাও দেখায়। কারণ, ‘ইমরান খানকে মুক্ত করা’ শক্তিশালী রাজনৈতিক দাবি হলেও এটি পাকিস্তানের সব তরুণের অভিন্ন দাবি নয়। একজন পিটিআই সমর্থকের কাছে এটি প্রধান দাবি হতে পারে। কিন্তু বেলুচিস্তানের একজন তরুণের কাছে নিখোঁজ স্বজন, নিরাপত্তা অভিযান বা আঞ্চলিক অধিকার বড় প্রশ্ন হতে পারে। পাঞ্জাবের একজন শিক্ষিত বেকারের কাছে চাকরি ও অর্থনীতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর কাছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিংবা শিক্ষাব্যবস্থা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই দাবিগুলোকে এক জায়গায় আনতে না পারলে পিটিআইয়ের আন্দোলন বড় রাজনৈতিক সংঘাত তৈরি করতে পারে, কিন্তু তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি সর্বজনীন জেন-জি আন্দোলনে পরিণত হবে না।
শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ বা নেপালের সাম্প্রতিক তরুণ আন্দোলনগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল, বিভিন্ন পটভূমির তরুণেরা একটি তুলনামূলক সহজ ও সাধারণ দাবিতে নিজেদের যুক্ত করতে পেরেছিল। কিন্তু পাকিস্তানের তরুণেরা এখনো একই রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলছে না। এটাই পাকিস্তানের জেন-জি আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বাধা।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যদি পাকিস্তানে জেন-জি আন্দোলন শুরু হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় সামরিক নিয়ন্ত্রণ কি সেই আন্দোলন ঠেকিয়ে রাখবে? স্বল্প মেয়াদে এটি আন্দোলনের বড় বাধা হতে পারে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী আছে, প্রশাসনিক ক্ষমতা আছে, ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা আছে এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিজ্ঞতাও আছে। ফলে পাকিস্তানে কোনো বিক্ষোভ শুরু হলে সেটিকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাষ্ট্রের রয়েছে।
এখানে একটি বিপজ্জনক দ্বৈততা আছে। কারণ, দমন-পীড়ন আন্দোলন থামাতে পারে, কিন্তু ক্ষোভের কারণ দূর করতে পারে না। বরং অতিরিক্ত দমন তরুণদের মনে এই ধারণা তৈরি করে যে সাংবিধানিক বা নির্বাচনী পথেও পরিবর্তনের সুযোগ নেই। আর তাই তারা আরও বেশি অনলাইন ও অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের দিকে ঝুঁকতে পারে।
পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ জেন-জি আন্দোলন প্রচলিত ছাত্রআন্দোলনের মতো নাও হতে পারে। এর কোনো একক নেতা নাও থাকতে পারে। কোনো রাজনৈতিক দলের পতাকাও নাও থাকতে পারে। বরং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, শহর, অনলাইন নেটওয়ার্ক ও স্থানীয় আন্দোলন একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেতে পারে।
তবে এর জন্য একটি বড় ট্রিগার দরকার। সেই ট্রিগার কোথা থেকে আসতে পারে? এটি আগে থেকে নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। কোনো বড় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক গ্রেপ্তার, নির্বাচনী সংকট, আন্দোলনে প্রাণহানি, ইন্টারনেট বন্ধ, বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক কোনো ঘটনা অথবা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের একটি দৃশ্য এমন ট্রিগার তৈরি করতে পারে।
কিন্তু ট্রিগার নিজে আন্দোলন তৈরি করে না। ট্রিগার শুধু আগে থেকে জমে থাকা ক্ষোভকে দৃশ্যমান করে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তাই আসল প্রশ্ন হলো, ক্ষোভ কতটা গভীর নয়, বরং ক্ষোভের মধ্যে সংযোগ কতটা তৈরি হয়েছে। এখন পর্যন্ত সেই সংযোগ দুর্বল।

ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতার মালা পরিয়ে দেওয়ার ন্যক্কারজনক একটি ঘটনা ঘটেছে। এই কাণ্ড কেন ঘটছে এবং কাদের প্রশ্রয়ে ঘটছে, তা উদ্ঘাটন করে প্রকৃত কুশীলবদের আইনের আওতায় এনে বিচার করে শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের...
১ ঘণ্টা আগে
লোহিতসাগরের পাড়ে এক শরণার্থীশিবিরে সারি সারি তাঁবু। পানির জার কাঁধে নিয়ে কয়েকজন নারী ধীর পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন, আর দূর থেকে ভেসে আসছে কামানের গর্জন। কয়েক সপ্তাহ ধরে এ ধরনের খবর প্রকাশিত হয়েছে সংবাদমাধ্যমে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পর যে লড়াই অনেকটা থিতিয়ে...
১ ঘণ্টা আগে
খুলনার সোনাডাঙ্গার ভাড়া বাসায় ২০২১ সালের ডিসেম্বরে এক তরুণীর স্বপ্ন থমকে গিয়েছিল। মিম আক্তার নামের সেই তরুণী প্রায় ১২০০ প্রার্থীর মধ্যে মেধাক্রমে প্রথম হয়েছিলেন খুলনা জেলা পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষায়। অনেক উত্তীর্ণকে ফোন করে জানানো হলো; কিন্তু ফোন এল না কেবল মিমের কাছে।
১ দিন আগে
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মানুষের ভিড় নিয়ে একটি প্রতিবেদন বেরিয়েছে আজকের পত্রিকায়। সাদামাটা কথায় বলতে হয়, এই ভিড়ের জন্য যাত্রীরা নন; বরং দায়ী হলো যাত্রীকে বিদায় দিতে আসা মানুষ। একজন মানুষকে স্বাগত জানাতে কিংবা বিদায় দিতে যখন পুরো পরিবারের মানুষ চলে আসেন বিমানবন্দরে, তখন সেই ভিড় সামলাতে...
১ দিন আগে