Ajker Patrika

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সামাজিক উৎসব: পাহাড়ি সংস্কৃতির অনন্য রূপ

ড. মো. আনোয়ার হোসেন
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সামাজিক উৎসব: পাহাড়ি সংস্কৃতির অনন্য রূপ
বিজু, সাংগ্রাই কিংবা বৈসু—উৎসবের নাম ভিন্ন হলেও এর আবেদন এক ও অভিন্ন। ছবি: আজকের পত্রিকা

প্রকৃতির আবর্তনে ঋতুরাজ বসন্ত বিদায় নিয়ে যখন রুদ্র বৈশাখের পদধ্বনি শোনা যায়, তখন বাংলার জল-হাওয়া আর পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে জেগে ওঠে এক অপার্থিব উৎসবের দোলা। বাঙালির ‘পয়লা বৈশাখ’ আর পাহাড়ের ‘বৈসাবি’ যেন একই সূত্রে গাঁথা দুই ভিন্ন সুরের এক অনবদ্য রাগিণী। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ এই শুচিতার আবাহন কেবল সমতলের বাঙালির নয়, বরং পাহাড়ের কন্দরে বসবাসরত প্রতিটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রাণের স্পন্দন। চৈত্রসংক্রান্তির বিদায়বেলা আর নববর্ষের আবাহন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় পাহাড়ের অনন্য লোকজ ঐতিহ্যে। এই উৎসব কেবল আনন্দের নয়, বরং শিকড়ের টানে ফেরার, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করার এবং আদিম সংস্কৃতির সৌরভকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার এক মহাসম্মেলন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম নৃগোষ্ঠী চাকমাদের প্রধান উৎসব হলো ‘বিজু’। এটি মূলত তিন দিনব্যাপী পালিত হয়—ফুল বিজু, মূল বিজু এবং গোজ্যাপোজ্যা দিন। প্রথম দিন ভোরে ফুল দিয়ে ঘর সাজানো এবং নদীতে ফুল ভাসিয়ে গঙ্গা দেবীর পূজা করা হয়, যা পাহাড়ের স্নিগ্ধতাকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। বাড়ির আঙিনায় শিশুদের কলকাকলি আর প্রিয়জনের সান্নিধ্যে এই দিনটি হয়ে ওঠে অত্যন্ত আনন্দময়।

বিজুর দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ মূল বিজুর মূল আকর্ষণ হলো ‘পাজন’। এটি অন্তত ৩২ রকমের সবজি দিয়ে তৈরি এক বিশেষ নিরামিষ ব্যঞ্জন, যা প্রতিটি ঘরে রান্না করা হয়। এই দিনে পাড়ার ঘরে ঘরে নিমন্ত্রণ বিনিময় চলে এবং ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার পাশাপাশি ‘বিজু নৃত্য’ পরিবেশিত হয়। উৎসবের আমেজ প্রতিটি পাহাড়ি জনপদকে এক রঙিন রূপ দান করে।

তৃতীয় দিন তথা গোজ্যাপোজ্যা দিনটি মূলত বিশ্রামের এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের আশীর্বাদ নেওয়ার দিন। বৌদ্ধমন্দিরে গিয়ে প্রার্থনা এবং প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে তারা জগতের সকল প্রাণীর মঙ্গল কামনা করে। এই দিনটি আধ্যাত্মিক শান্তিতে পূর্ণ থাকে।

মারমা সম্প্রদায়ের প্রধান সামাজিক উৎসব হলো ‘সাংগ্রাই’। তারা মূলত চান্দ্রমাস অনুসারে বছরের শেষ তিন দিন এই উৎসব পালন করে থাকে। উৎসবের প্রথম দিনে তারা বুদ্ধমূর্তি স্নান করায় এবং ধর্মীয় শোভাযাত্রা বের করে। মারমাদের এই উৎসবটি তাদের ঐতিহ্যের এক সমৃদ্ধ প্রতিফলন, যেখানে আধ্যাত্মিকতা ও সামাজিকতা হাত ধরাধরি করে চলে।

সাংগ্রাইয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং দর্শনীয় অংশ হলো ‘রিলং পোয়ে’ বা জলকেলি উৎসব। তরুণ-তরুণীরা একে অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে পুরোনো বছরের গ্লানি ধুয়ে ফেলে এবং পবিত্র মনে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়। এই পানি ছিটানোর উৎসব অনেকটা বিশুদ্ধ ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। মনে হয় যেন পাহাড়ের চূড়া থেকে দেবতারাও এই জলকেলিতে যোগ দিতে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন।

উৎসবের সমাপ্তি ঘটে নানাবিধ পিঠা তৈরি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। মারমারা তাদের বিশেষ ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে নাচ-গানে মেতে ওঠে। কবি শঙ্খ ঘোষের ভাষায়, ‘পবিত্র এই জলধারা যেন ধুয়ে দেয় মনের সব কলুষতা’। সাংগ্রাই উৎসবের মধ্য দিয়ে মারমা সমাজ তাদের সংহতি এবং ভ্রাতৃত্ববোধের এক অনন্য নজির স্থাপন করে।

ত্রিপুরাদের প্রধান উৎসবের নাম ‘বৈসু’। চৈত্রসংক্রান্তির দুই দিন আগে থেকেই উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়। উৎসবের প্রথম দিনকে বলা হয় ‘হারি বৈসু’, দ্বিতীয় দিন ‘বিসুমা’ এবং তৃতীয় দিন ‘বিসিকাতাল’। ছোট ছেলেমেয়েরা ভোরে ফুল সংগ্রহ করে ঘরদোর সাজায় এবং গৃহপালিত পশুদের গলায় ফুলের মালা পরিয়ে সম্মান জানায়।

বৈসু উৎসবের বিশেষ একটি দিক হলো ‘গড়াইয়া নৃত্য’। ত্রিপুরারা বিশ্বাস করে, গড়াইয়া দেবতা তাদের তুষ্ট হলে জুম চাষ ভালো হবে এবং রোগবালাই দূর হবে। তরুণ-তরুণীরা ঢোলের তালে তালে এই নাচে অংশ নেয়, যা বীরত্ব ও আধ্যাত্মিকতার সংমিশ্রণ। তাদের এই রঙিন পোশাক আর ছন্দময় নাচে পাহাড়ের প্রকৃতিও যেন নতুন রূপ ধারণ করে।

ত্রিপুরাদের আতিথেয়তা এই সময়ে চরমে পৌঁছায়। তারা অতিথিদের ‘সুজানি’ বা বিশেষ পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করে। বিসুমা দিনে ঘরে ঘরে বিশেষ খাবার প্রস্তুত করা হয় এবং

একে অপরের বাড়িতে গিয়ে কুশল বিনিময় করে। এটি কেবল একটি উৎসব নয়, বরং ত্রিপুরা জাতির আত্মপরিচয় রক্ষার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের উৎসবের নাম ‘বিষু’। তারা মনে করে চৈত্রসংক্রান্তির এই সময়টি প্রকৃতির পরিবর্তনের প্রতীক। বিষু উৎসবের প্রথম দিনে তারা নদী বা ঝরনায় স্নান করে পবিত্র হয় এবং ফুল দিয়ে বাড়িঘর সাজায়। তাদের সরল জীবনযাপনের প্রতিফলন এই উৎসবের পরতে পরতে লক্ষ করা যায়।

বিষু উপলক্ষে তঞ্চঙ্গ্যারা ঐতিহ্যবাহী পিঠা এবং মুখরোচক খাবার তৈরি করে। তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিতে ‘ঘিলা খেলা’ একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় অনুষঙ্গ। বড় বড় ঘিলা ফলের বিচি নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক এই খেলায় মেতে ওঠে গ্রামের যুবসমাজ। এই খেলাটি কেবল বিনোদন নয়, বরং তাদের শৈশবের স্মৃতি ও ঐতিহ্যের স্মারক। উৎসবে তঞ্চঙ্গ্যা নারীরা তাদের নিজ হাতে বোনা রঙিন পোশাক ‘পিনোন ও হাদি’ পরিধান করে। তাদের পোশাকে থাকে নিখুঁত কারুকাজ, যা তাদের শৈল্পিক মনের পরিচয় দেয়। আধ্যাত্মিক প্রার্থনা এবং প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে তারা উৎসবের সমাপ্তি ঘটায়।

ম্রো বা মুরং সম্প্রদায়ের উৎসব হলো ‘চাসত্ পউ’ বা গো-হত্যা উৎসব। যদিও এটি ধর্মীয় অনুশাসনকেন্দ্রিক, তবে নববর্ষের আবহে তারা ভিন্ন আমেজে মেতে ওঠে। তাদের জীবনের প্রধান উৎসবগুলোর একটি হলো ফসলের আশীর্বাদ নেওয়া। বাঁশির সুর আর দ্রিমি দ্রিমি মাদলের শব্দে ম্রো পাড়াগুলো মুখরিত হয়ে ওঠে।

ম্রোদের বিশেষ বাদ্যযন্ত্র ‘প্লুং’-এর সুর পাহাড়ি ঢালে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে। তারা দীর্ঘ বাঁশ দিয়ে তৈরি এই বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে বৃত্তাকারে নৃত্য করে। তাদের এই নৃত্যশৈলী অত্যন্ত আদিম ও নান্দনিক। ম্রো সমাজ তাদের উৎসবের মাধ্যমে পূর্বপুরুষদের আত্মা এবং প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। উৎসবের সময় তারা সম্মিলিত ভোজের আয়োজন করে, যেখানে গ্রামবাসী একাত্ম হয়। তাদের এই উৎসবের প্রতিটি স্পন্দন যেন মাটির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দেয়।

সাঁওতাল সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান উৎসব ‘সোহরাই’, যা তারা বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে পালন করে। যদিও এটি পৌষ মাসে পালিত হয়, তবে চৈত্রসংক্রান্তি ও বৈশাখের আবহে তারা ‘বাহা’ উৎসব পালন করে থাকে। বাহা মানে হলো ফুল; অর্থাৎ এটি ফুলের উৎসব। শাল ফুলের সৌরভে তখন সাঁওতাল গ্রামগুলো আমোদিত হয়ে ওঠে। বাহা উৎসবে সাঁওতাল পুরুষ ও নারীরা দলবেঁধে নাচ-গানে মেতে ওঠে। মাদল, ধামসা আর বাঁশির সুর আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের দ্রোহ আর প্রেমের মতোই তাদের নাচে থাকে এক অদম্য প্রাণের শক্তি। তারা প্রকৃতির পূজা করে এবং বিশ্বাস করে প্রকৃতি রুষ্ট হলে জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে।

উৎসবের দিন তারা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে এবং একে অপরের কানে শাল ফুল গুঁজে দেয়। এটি ভালোবাসার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। তাদের এই উৎসবে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে মাটির গভীর টান। সাঁওতালদের এই সহজ-সরল জীবনবোধ আমাদের যান্ত্রিক সমাজকে বারবার শিক্ষার আলো দিয়ে যায়।

মণিপুরি সম্প্রদায়ের প্রধান উৎসবগুলোর অন্যতম হলো ‘বিষু’ বা ‘চৈত্রসংক্রান্তি’। তবে তাদের বসন্তকালীন বড় উৎসব হলো ‘লাই হারাওবা’। এটি মূলত সৃষ্টির উল্লাসে পালিত হয়। মণিপুরি নৃত্যের যে বিশ্বজোড়া খ্যাতি, তার মূল ভিত্তি এই উৎসবগুলোর মধ্যেই নিহিত। মণিপুরিরা তাদের উৎসবে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং আধ্যাত্মিক থাকে। তারা রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা এবং প্রকৃতির বন্দনা করে গীত রচনা করে। তাদের এই পরিবেশনাগুলো যেন একেকটি চলমান মহাকাব্য। উৎসবে তারা ঐতিহ্যবাহী পিঠা এবং স্থানীয় খাবার তৈরি করে। মণিপুরি নারীরা তাদের বিশেষ তাঁতে বোনা পোশাক পরে মন্দির প্রাঙ্গণে একত্র হয়। উৎসব শেষে তারা জগতের শান্তি কামনায় সম্মিলিত প্রার্থনায় রত হয়।

বাংলাদেশের এই ভূখণ্ডে বৈচিত্র্যের মাঝে যে ঐক্য রয়েছে, পাহাড়ের এই উৎসবগুলো তার বলিষ্ঠ প্রমাণ। বিজু, সাংগ্রাই কিংবা বৈসু—নাম ভিন্ন হলেও এর আবেদন এক ও অভিন্ন। এটি নব প্রাণের স্পন্দন, এটি জরাজীর্ণতাকে বিদায় জানিয়ে নতুনের জয়গান গাওয়ার প্রত্যয়। পাহাড়ের এই বর্ণিল উৎসবগুলো আমাদের সামগ্রিক সংস্কৃতিকে ঋদ্ধ করেছে এবং বিশ্ব মানচিত্রে আমাদের এক বহুমাত্রিক পরিচয় এনে দিয়েছে। দেশাত্মবোধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমাদের উচিত এই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া এবং সংরক্ষণ করা।

লেখক: ড. মো. আনোয়ার হোসেন, প্রেসিডেন্ট, ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি অ্যালকোহল

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত