
মানবসভ্যতার সঙ্গে কাগজ ও বই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যখন কাগজ ছিল না তখন তালপাতায় লেখা হতো, তালপাতার পুঁথি এখনো অনেক জাদুঘরে গেলে দেখা যায়। তারও আগে মানুষ কিসে লিখত? হয় পাথরে না হয় গুহার দেয়ালে। অনেক জাদুঘরে শিলালিপির দেখা আমরা পাই। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে বই বলতে আমরা বুঝি কাগজের বই। পড়ার জন্য খবরের কাগজ, সেটাও কাগজের। টাকা ছাপতে লাগে কাগজ। ঠোঙা বানানো থেকে শুরু করে কার্টন বানানো পর্যন্ত কাগজের রয়েছে বহুমুখী ব্যবহার।
মহান একুশের বইমেলা চলছে। এই এক মাসে যে পরিমাণ বই বাংলাদেশে ছাপা হবে, তার জন্য কয় টন কাগজ খরচ হবে, তার হিসাব কে রাখে? এ পরিমাণ কাগজ উৎপাদন করতে আমরা পরিবেশের কতটা ক্ষতি করলাম, সেটাও ভাবা দরকার। অনেকে হয়তো ভাবছেন, বইয়ের সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ক কী? বই ছাপতে যে কাগজ লাগে, তা গাছ কেটে বন ধ্বংস করেই করা হয়। গাছ ও বন হলো পরিবেশ রক্ষার প্রহরী। আমরা যদি বিশ্বের একটি পরিসংখ্যানের দিকে তাকাই, তাহলে ব্যাপারটা বেশি খোলাসা হয়ে যাবে। বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের জন্য প্রায় ৪০৫ মিলিয়ন টন অর্থাৎ ৪০ কেটি ৫০ লাখ টন কাগজ লাগে। আর এ পরিমাণ কাগজ ও কাগজের বোর্ড উৎপাদন করতে কাটতে হয় ৪ থেকে ৮ বিলিয়ন গাছ। ভাবতেও কষ্ট হয় যে পৃথিবীতে প্রতিবছর যে পরিমাণ গাছ কাটা হয় তার প্রায় ৪২ শতাংশ যায় কাগজকলে। কাগজশিল্প উল্লেখযোগ্যভাবে বন উজাড় তো করেই, সেই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ক্ষেত্রে সেগুলোর অবদান প্রায় ২০ শতাংশ। যার বিরূপ প্রভাব সরাসরি পড়ছে পরিবেশের ওপর।
এটি হলো এক দিকের চিত্র। অন্যদিকে নেপথ্যে ঘটছে আরেক ঘটনা। যেসব কলকারখানা এসব কাগজ উৎপাদন করছে, সেসব কারখানা চালাতে শক্তি বা এনার্জির দরকার হচ্ছে। যে প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদন নিয়ে আমাদের এত শোরগোল, সেই প্লাস্টিক কারখানার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ শক্তি ব্যয় করছে কাগজের কলগুলো। বর্তমানে জ্বালানি ব্যয়ের দিক থেকে কাগজশিল্প চতুর্থ বৃহত্তম।
শুধু শক্তির ব্যবহারই না, কাগজ উৎপাদন করতে লাগছে প্রাকৃতিক মূল্যবান সম্পদ পানি। কাগজের জন্য যেসব রাসায়নিক দ্রব্য লাগছে সেগুলো উৎপাদন করতে রয়েছে আরও অনেক রকমের কারখানা। এটি একটি চেইন ফর্মের ব্যবস্থাপনা, যেখানে প্রতিটি স্তরে রয়েছে পরিবেশের ওপর কিছু না কিছু বিরূপ প্রভাব। পরিবেশের ওপর কাগজশিল্পের মূল প্রভাবগুলো হলো:
বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক কাঠের প্রায় ৪২ শতাংশ কাঠ ব্যবহৃত হচ্ছে কাগজ উৎপাদনে, যার জোগান দিতে গিয়ে বছরে পৃথিবীর প্রায় ৪১ লাখ হেক্টর বন উজাড় হচ্ছে। এসব বনে ছিল বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ বৈচিত্র্য। কিন্তু দ্রুত সেসব বন পুনর্বনায়ন করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সেখানে এক বা স্বল্প কয়েক দ্রুতবর্ধনশীল প্রজাতির গাছ (ইউক্যালিপটাস বা আকাশমণি) লাগানো হচ্ছে, যার ফলে উদ্ভিদজগৎ তার বৈচিত্র্য হারাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র ও জীবজগৎ। বন উজাড়ের পাশাপাশি পরিবেশ দূষিত হচ্ছে কাগজের কলগুলো থেকে আসা বিভিন্ন রাসায়নিক বর্জ্যে, বিশেষ করে ডাইঅক্সিনসহ কাগজ ব্লিচিং বা সাদা করার বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য। বিস্মিত হতে হয় শুনে যে বিশ্বব্যাপী ল্যান্ডফিল বর্জ্যের প্রায় ২৬ শতাংশ হলো পরিত্যক্ত কাগজ।
বাংলাদেশে এসব গুরুত্ব বুঝে পরিত্যক্ত কাগজ ব্যবহার করে সীমিত আকারে হলেও এক নতুন ভাবনার শুরু হয়েছে। পরিত্যক্ত কাগজ দিয়ে ল্যান্ডফিল না করে তা ব্যবহার করে উদ্ভাবন করা হয়েছে বনকাগজ। নারায়ণগঞ্জের এক তড়িৎ প্রকৌশলী মাহবুব সুমন উদ্ভাবন করেছেন এই বনকাগজ। এ কাগজ থেকে পাওয়া যাচ্ছে ১১ রকমের গাছ, যার মধ্যে রয়েছে তিন ধরনের ফুল ও আট রকমের সবজি। কাগজটি ভিজিটিং কার্ড বা আমন্ত্রণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। পরে প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে পরিত্যক্ত হিসেবে এটিকে ছিঁড়ে ভেজা মাটিতে ফেলে দিলে সেইসব কাগজের টুকরোয় থাকা বীজগুলো গজিয়ে ওঠে। সুমন ও তাঁর শালবৃক্ষ দল এই বনকাগজ তৈরি নিয়ে কাজ করছেন। এরই মধ্যে সে কাগজ অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সামাজিক মাধ্যমে বনকাগজ নিয়ে বিভিন্ন আলোচনার সূত্র ধরেই এ সম্পর্কে জানতে পারি।
বনকাগজ মূলত তৈরি হয় পরিত্যক্ত কাগজ থেকে। পরিত্যক্ত কাগজ পরিবেশদূষণ করে, তাই সেগুলোর সদ্ব্যবহার নিঃসন্দেহে ল্যান্ডফিলের চেয়ে ভালো উদ্যোগ। উদ্যোগটি ক্ষুদ্র হলেও মনে করি তা অনুকরণীয়। এ নিয়ে আরও খুঁটিনাটি বিষয় ও সম্ভাব্যতা যাচাই করে শিল্প করপোরেশন এবং বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয় বনকাগজের ব্যাপক প্রসারের উদ্যোগ নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনকেও গার্হস্থ্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে হবে। বিদ্যমান ব্যবস্থার সংস্কার ও গৃহীদের সচেতন করতে হবে যেন তারা কেউ কাগজ ও কাগজজাতীয় বর্জ্যকে অন্য বর্জ্যের সঙ্গে না মেশান। সেগুলো সংগ্রহ থেকে রিসাইক্লিংয়ের সমস্ত প্রক্রিয়াতেই একটি শৃঙ্খলা, জনবলের অন্তর্ভুক্তি ও উৎপাদন পরিকল্পনা নিতে হবে। সাধারণ কাগজের মতোই এসব কাগজ আর্থিকভাবে সাশ্রয়ী ও সহজে বহুবিধ ব্যবহার-উপযোগী করতে পারলে সেসব শিল্প টিকে থাকবে। ব্যবহারের পর অপ্রয়োজনীয় কাগজকে ধ্বংস না করে তা থেকে পাল্প তৈরি করে যদি পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাগজ উৎপাদনকে উৎসাহিত করা যায়, তাহলে কাগজ উৎপাদনের জন্য গাছ কাটার প্রয়োজন অনেক কমে আসবে। কাঠ ছাড়াও অন্য কোনো ফাইবার বা তন্তু ব্যবহার করে কাগজ উৎপাদন করা যায় কি না, সেটাও দেখতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনে বর্তমানে নির্বিচারে গাছ কাটা ও বন উজাড় হওয়া এক অন্যতম প্রধান সমস্যা। বিশ্বব্যাপী ১২ শতাংশ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের জন্য দায়ী বন উজাড় হওয়া। শুধু তাই না, বন আমাদের পুরো বাস্তুতন্ত্রের পরিষেবাগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বন আমাদের বন্যা, ভূমিধস ও মাটির ক্ষয় থেকে সুরক্ষা দেয়, কার্বন সংশ্লেষণ করে, উদ্ভিদ ও প্রাণীর আহার এবং ওষুধ জোগায়। পৃথিবীতে অন্তত ৩০ কোটি মানুষ মনে করে যে তারা বনেরই বাসিন্দা, বনই তাদের জীবন ও জীবিকা। তাই বনের গাছ কাটা মানে অনেক কিছুই কেটে ফেলা, মানবজাতির বিনাশ ডেকে আনা। যে বনে গাছ নেই, সে বনে কার্বন সংশ্লেষণ হবে কেমন করে? তাই কাগজশিল্পের সংকোচন ও বনের সম্প্রসারণই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যত দ্রুত সেটি আমরা করতে পারব, ততই আমাদের ও পৃথিবীর জন্য তা মঙ্গলজনক হবে।
প্রিন্টারে একটি কাগজের প্রিন্ট নেওয়ার আগে অথবা খাতার একটি পাতায় কিছু লেখার আগে কয়েকবার ভাবুন যে সেটিকে পরিহার করা যায় কি না। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশ এখন ক্যাশলেস ও পেপারলেস হওয়ার পথে। ডিজিটালাইজেশনের যুগে এখন নানাভাবে লেনদেন হচ্ছে, আমরা এখন ই-কমার্সের যুগে প্রবেশ করেছি, যেখানে নগদ প্রদান-গ্রহণের কোনো ব্যাপার নেই। টাকা না ছাপলে কাগজ লাগবে না। অনলাইনে এখন অনেকেই ই-বুক প্রকাশ করছেন। বই না ছাপলে কাগজ লাগবে না। বই না থাকলে ঘরের আলমারিও বোঝাই হবে না, বই ব্যাগে পুরে ট্রাভেল করতে হবে না। একটা যন্ত্র থাকলেই যেকোনো জায়গায় বসে এখন পছন্দের অনেক বই দ্রুত পড়া যাবে। সংবাদপত্রও এখন অনলাইনে প্রকাশিত হচ্ছে। সংবাদপত্র না ছাপলে কাগজ লাগবে না। দ্রুত বিশ্ব নয়া ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। ভালো কি মন্দ, সুবিধা না অসুবিধা, সে বিচারের সময় এখনো আসেনি। তবে কাগজের ব্যবহার আমাদের কমাতেই হবে, নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া কাগজ ব্যবহার করা অনুচিত হবে। কাগজের ব্যবহার কমলেই বন বাঁচবে, পরিবেশ বাঁচবে। আমাদের টাকাও বাঁচবে।
মৃত্যুঞ্জয় রায়, কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক

ওবায়দুল হক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক। তিনি কর্মরত আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে। সম্প্রতি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা, ইসরায়েলের উদ্দেশ্য, ইরানের সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার মিত্রতা ইত্যাদি নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা...
৩ ঘণ্টা আগে
এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘অধিকার, ন্যায়বিচার, উদ্যোগ, সব নারী ও কন্যার জন্য হোক’। আজই তো সেই দিবস, ৮ মার্চ। ১৯৭৫ সাল থেকে জাতিসংঘ এ দিনেই দিবসটি পালন করে আসছে। কেন? যাঁরা বারবার ভুলে যান, তাঁদের একটু ইতিহাস মনে করিয়ে দিতে হয়।
৩ ঘণ্টা আগে
আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখী মানুষের যাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানোর অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
৩ ঘণ্টা আগে
আচ্ছা, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী তাঁরই সহপাঠীদের আপত্তিকর ছবি তুলেছেন গোপনে, তারপর এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিকৃত করেছেন—এ কথাও আমাদের হজম করতে হবে? শিক্ষার্থী বলতে তো সমাজে এগিয়ে থাকা একজন মানুষকেই বোঝানো হয়, কিন্তু শিক্ষার্থীর যদি এই দশা হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো....
১ দিন আগে