
একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে প্রযুক্তির বিশ্বায়ন যখন গতি পেতে শুরু করেছিল, তখন মানবসভ্যতা এক দ্বিধাদ্বন্দ্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল—সুলভ কায়িক শ্রমের ওপর ভর করে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা হবে, নাকি উচ্চপ্রযুক্তির স্বয়ংক্রিয়তাকে আলিঙ্গন করে নেওয়া হবে? ২০০০ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত জার্মান ম্যাগাজিন ‘ডয়েচল্যান্ড’-এর ৬ষ্ঠ সংখ্যায় জার্মান গবেষক কার্স্টিন কুলসের ‘ডেলফি-৯৮’ শীর্ষক পূর্বাভাসমূলক গবেষণার মূল সুর ছিল এটাই।
তৎকালীন সময়ের বিশেষজ্ঞদের ধারণা ও দূরদর্শিতা কীভাবে দুই দশক পর এসে ২০২৬ সালের কর্মক্ষেত্রে প্রতিফলিত হচ্ছে, তা আজ এক গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে। সেই সময়ের তিন-চতুর্থাংশ বিশেষজ্ঞ যেসব রূপান্তরের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, ২০২৬ সালে এসে তা কেবল প্রাত্যহিক বাস্তবতাই নয়, বরং আমাদের উৎপাদন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
২০০০ সালের সেই দূরদর্শী পূর্বাভাসের সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে শ্রমবাজারের কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে তাকালে। গত দুই দশকে বিশ্বজুড়ে কায়িক শ্রমের চাহিদা যেভাবে কমেছে, তা সত্যিই চোখে পড়ার মতো। আগে যেখানে সস্তা শ্রমের ওপর ভর করেই অর্থনীতির মূল চাকা ঘুরত, আজ সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর মেধা ও বিশেষ দক্ষতা। সহজ কথায়, ২০০০ সালে যেসব কাজের জন্য শত শত শ্রমিকের শরীরের ঘাম ঝরাতে হতো, ২০২৬ সালে উন্নত সফটওয়্যার, রোবোটিকস আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কল্যাণে মাত্র অল্প কয়েকজন দক্ষ বিশেষজ্ঞই তা অনায়াসে সামলে নিচ্ছেন।
অবশ্যই, তবে এই স্বয়ংক্রিয়তা যে কেবল মানুষের চাকরি কাড়ার ভয় দেখিয়েছে, তা কিন্তু নয়; বরং আমাদের কাজের পরিবেশকে করেছে অনেক বেশি নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল। দুই দশক আগেও যেসব ঝুঁকিপূর্ণ কারখানায় কাজ করতে গিয়ে মানুষকে প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিতে হতো, ‘রিমোট মেইনটেন্যান্স’ ও ‘রিমোট ডায়াগনসিস’ প্রযুক্তির কল্যাণে আজ তারা সেই বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে অনেকটাই রেহাই পেয়েছে। এখন আর কোনো জটিল যন্ত্র বা অবকাঠামোর সমস্যা মেটাতে কাউকে সশরীরে সেখানে ছুটতে হয় না; সেন্সর আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়ে ঘরে বসেই দূর থেকে নিখুঁতভাবে সব সমাধান করা যাচ্ছে।
একইভাবে, ডেলফি-৯৮ গবেষণার অন্যতম সঠিক একটি পূর্বাভাস ছিল নির্মাণশিল্পে রোবট ও ‘প্রিফেব্রিকেটেড’ উপাদান ব্যবহারের প্রসার। ২০২৬ সালে এসে আমরা দেখতে পাচ্ছি, বড় বড় দালানকোঠা বা অবকাঠামো তৈরি এখন আর শুধু প্রথাগত রাজমিস্ত্রি কিংবা শ্রমিকের গায়ে খাটার ওপর নির্ভর করে না। পূর্বপ্রস্তুতকৃত মডিউল, থ্রিডি প্রিন্টিং আর স্মার্ট কনস্ট্রাকশন রোবটের সমন্বয়ে আজকাল বিশাল সব অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে অত্যন্ত দ্রুত ও নিখুঁতভাবে।
স্বভাবতই, এর ফলে শ্রমিকের সংজ্ঞাও পুরোপুরি বদলে গেছে। যেমন ধরুন, আগে একজন ‘ফিটার’ বা টেকনিশিয়ানের কাজ ছিল কেবল হাতুড়ি-বল্টু দিয়ে যান্ত্রিক গোলযোগ মেলানো। কিন্তু ২০২৬ সালের এই পরিবেশবান্ধব ও স্মার্ট সিটির যুগে শুধু মেকানিকের জ্ঞান নিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব; তাকে এখন ‘স্মার্ট হোম এনার্জি সিস্টেম’ ও আধুনিক নেটওয়ার্কিং প্রযুক্তিও সমানে বুঝতে হয়। মূলকথা হচ্ছে, গায়ের জোরে কাজ করার দিন শেষ; তার জায়গা করে নিয়েছে উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর নতুন এক দক্ষ কারিগর শ্রেণি।
আর প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে পুরোনো দক্ষতাকে আঁকড়ে ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ। তৎকালীন জার্মান শিক্ষামন্ত্রী এডেলগার্ড বুলমানের সেই ঐতিহাসিক কথাটা আজ ২০২৬ সালে এসে হাড়ে হাড়ে সত্যি প্রমাণিত হচ্ছে—‘একবার বিদ্যা শিখে সারা জীবন চালিয়ে দেওয়ার দিন শেষ।’ আজকের ডিজিটাল দুনিয়ায় টিকে থাকতে হলে এই সতর্কবার্তা মনে রাখা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
প্রযুক্তির গতি এখন এতই দ্রুত যে কয়েক বছর আগের অর্জিত প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিও খুব দ্রুত মান হারিয়ে ফেলে। তাই ২০২৬ সালের এই কঠিন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ‘লাইফলং লার্নিং’ বা সারা জীবন শেখার মানসিকতা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং ক্যারিয়ার বাঁচানোর আসল বিমা। সোজা কথায়, প্রতি কয়েক বছর পরপর নিজেকে নতুন করে না শেখালে আর দক্ষতার ঝুলিকে ঝালিয়ে না নিলে এই বাজারে টিকে থাকা একপ্রকার অসম্ভব।
একইভাবে, ভাষা ও যোগাযোগের ক্ষেত্রেও দারুণ এক পরিবর্তন এসেছে। ২০০০ সালের গবেষণায় ‘পকেট-আকৃতির রিয়েল-টাইম অনুবাদক’-এর যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে তা আমাদের স্মার্টফোনের সাধারণ এআই অ্যাপেই বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ফলে যেকোনো দেশের মানুষের সঙ্গে ব্যবসা বা যোগাযোগ করা এখন একেবারেই সহজ। তবে এআই অনুবাদ সহজ করলেও এক নতুন কাজের পথ খুলে দিয়েছে, তা হলো যন্ত্রের তৈরি লেখার মানোন্নয়ন, প্রুফরিডিং আর তথ্যের সত্যতা যাচাই করা। অর্থাৎ খসড়া অনুবাদটা মেশিন করলেও সেটি কতটা সঠিক ও প্রাকৃতিক হলো, তা পরখ করার আসল চাবিকাঠি কিন্তু এখনো মানুষের হাতেই রয়ে গেছে।
তবে প্রযুক্তির এই জোয়ারে অন্ধ হয়ে ভাসার আগে ডেলফি-৯৮ গবেষণার শেষ বার্তাটি মনে রাখা খুব জরুরি। ১৯৫০-এর দশকে অনেক আমেরিকান মহাকাশে যাওয়ার আবেগে উদ্বুদ্ধ হয়ে সময়ের আগেই চাঁদে ভ্রমণের টিকিট কেটে বসে ছিলেন, কিন্তু বাস্তবে প্রস্তুতি না থাকায় শেষে তাঁদের হতাশই হতে হয়েছিল। প্রযুক্তির ফাঁপা উন্মাদনায় মেতে উঠে আমাদের অবস্থাও যেন সেই টিকিট কাটা আমেরিকানদের মতো না হয়—২০২৬ সালের এই প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে এ কথাটা মাথায় রাখা বড্ড দরকার।
কারণ, উচ্চপ্রযুক্তির এই জোয়ারে সস্তা কায়িক শ্রমের চাহিদা কমে যাওয়ায় অসংখ্য মানুষ আজ চাকরি হারানোর মুখে পড়েছেন। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করে তোলা এবং তাদের জীবনমান বজায় রাখাটা বড় এক চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তি তো আর নিজে কোনো নীতিনৈতিকতা বোঝে না, সে তো স্রেফ একটা শক্তিশালী হাতিয়ার। তাই এই হাতিয়ারকে আমরা বৈষম্য বাড়ানোর কাজে লাগাব, নাকি মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করব, তা নির্ধারণের দায়িত্ব পুরোপুরি আমাদের মানবিক মূল্যবোধেরই।
২০০০ সালে কার্স্টিন কুলসের সেই লেখাটি প্রকাশের পর দুটি দশক পার হয়ে গেছে। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে দ্বিধাহীনভাবেই বলা যায়—প্রযুক্তি এখন আর হাত দিয়ে ব্যবহারের কোনো আলাদা যন্ত্র বা টুল নয়; এটি আমাদের সমাজ, অর্থনীতি এবং জীবনযাত্রারই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
‘সুলভ শ্রম বনাম উচ্চপ্রযুক্তি’র এই লড়াইয়ে দিনশেষে প্রযুক্তির জয় হলেও, সেই লাগাম যেন সব সময় মানুষের হাতেই থাকে—তা নিশ্চিত করাই আজ একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় দায়। চোখ বন্ধ করে প্রযুক্তিকে গিলে না
খেয়ে, অতীতের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং মানবিক বুদ্ধিমত্তা ও ক্রমাগত শেখার মানসিকতাকে কাজে লাগিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

বাংলাদেশে ঋতু ছয়টি। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। তবে এই তালিকাটি অসম্পূর্ণ। মধ্যবিত্তের সংসারের জন্য আরও একটি ঋতু আছে, হতাশার ঋতু। সেটি হলো মাসের শেষ ১০ দিন। এই ঋতুর কোনো সরকারি স্বীকৃতি নেই।
১ দিন আগে
বর্তমান সময়ে সবচেয়ে যে আলোচনার বিষয় সেটি হলো বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগ হতে পারে দুই প্রকার—দেশি এবং বিদেশি। প্রথমেই আসা যাক বিদেশি বিনিয়োগের আলাপে। আমাদের দেশে বিদেশিরা সাধারণত বিনিয়োগ করে থাকে বস্ত্র খাতে। বেশির ভাগ সময় বিনিয়োগ এ খাতেই বেশি এসেছে।
১ দিন আগে
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ঘটনাবহুল, কণ্টকাকীর্ণ এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে পুনরুত্থানশীল দলটির নাম বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আজ ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬; দলটির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালের এই দিনে যে দলটির যাত্রা শুরু হয়েছিল এক মহান রাষ্ট্রনায়কের হাত ধরে...
১ দিন আগে
পেটে কত বছরের খিদে থাকলে বিমানবন্দর এলাকা থেকে স্বর্ণালংকার ছিনতাই করতে পারে কেউ? দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় না থাকার কারণেই কি বিমানবন্দর থানা ছাত্রদলের সভাপতি আর বিমানবন্দর সাংগঠনিক ইউনিট বিএনপির সভাপতির খিদে এতটা বেড়েছে?
১ দিন আগে