Ajker Patrika

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ

আসিফ
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

বিজ্ঞানীরা বিংশ শতাব্দীজুড়ে বহির্জাগতিক প্রাণ অনুসন্ধানের চেষ্টা চালিয়েছেন। খুঁজেছেন কার্বনভিত্তিক, সিলিকনভিত্তিক বা অ্যামোনিয়া যৌগনির্ভর প্রাণ। এটা আমাদের জানা জরুরি যে প্রাণের প্রকৃতি, আর অন্য জায়গায় প্রাণ আছে কি না, তা আসলে একই প্রশ্নের দুটো দিক। তা হলো, ‘কেন আমরা এখানে?’ বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, যে সিলিকনভিত্তিক প্রাণ মানুষ বহির্জগতে খুঁজেছে, সেটা কৃত্রিমভাবে পৃথিবীতে প্রায় তৈরি করে ফেলেছে মানুষ, যা আমাদের নিয়ে যাচ্ছে টেকনোলজিক্যাল সিঙ্গুলারিটির দিকে। অর্থাৎ বহির্জগতে সেই অতি বুদ্ধিমান প্রাণ (যদি থেকেও থাকে) আবিষ্কারের আগেই মানুষ দেখা পেয়ে যেতে পারে নিজের আবিষ্কৃত সিলিকননির্ভর প্রাণের। তবে খোদ কৃত্রিম বুদ্ধিবৃত্তিবিষয়ক গবেষকেরা দুশ্চিন্তায় আছেন—বাস্তবের সিলিকন সত্তা দেখার আগেই পরিসমাপ্তি ঘটতে পারে কার্বনভিত্তিক সভ্যতার।

টেকনোলজিক্যাল সিঙ্গুলারিটি বা প্রাযুক্তিক একতা হচ্ছে এমন এক প্রাযুক্তিক বিশ্বব্যবস্থা, যেখান থেকে আর পেছনে ফেরার সুযোগ থাকবে না আমাদের। এআই মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে আরও দ্রুত হারে স্ব-উন্নয়নের মাধ্যমে একটি সুপার ইন্টেলিজেন্স তৈরি করবে, যাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে কি না, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। প্রাযুক্তিক সিঙ্গুলারিটি ধারণার প্রবর্তক রে কার্জউইল তাঁর ‘সিঙ্গুলারিটি ইজ নিয়ার’ গ্রন্থে এ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে বলেছেন। তিনি মানবতার ভবিষ্যৎ চিত্রিত করেছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জৈবিক বুদ্ধিমত্তার সম্মিলিত অস্তিত্বের একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে। কার্জউইল দীর্ঘকাল ধরে যুক্তি দিয়ে আসছিলেন যে এজিআই (কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা) শুধু সম্ভব নয়, বরং অনিবার্য। ২০২৯ সালে তা আবির্ভূত হবে বলে তিনি পূর্বাভাস দিয়েছেন।

মহাকাশ সংস্থা স্পেস এক্স ও অটোমোটিভ ইন্ডাস্ট্রি টেসলার উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক। তাঁর সবগুলো প্রকল্পই ভবিষ্যৎ পৃথিবী বিনির্মাণের সঙ্গে জড়িত। এগুলোর মূলে কাজ করছে মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি। এজিআইয়ের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কার্জউইলের মতো তিনিও এমন একটি ভবিষ্যৎ কল্পনা করেন, যেখানে এআই ব্যবস্থা সব রকম কাজ সম্পাদন করতে পারবে, যেগুলো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি বিশ্বাস করেন, এজিআই ২০৩০ সালের মধ্যে মানব বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে, আবার এটি অনিয়ন্ত্রিত হলে মানবতাকে শেষ করে দিতে পারে।

চ্যাটজিপিটি খ্যাত ওপেন এআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা সিইও স্যাম অল্টম্যান। তিনিই প্রথম সাধারণের কাছে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের (এলএলএম) অভাবিত কর্মক্ষমতা তুলে ধরেন, যাকে আমরা চ্যাটজিপিটি নামে চিনি। এজিআইয়ের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্যাম অল্টম্যান বলেন, এআইয়ের বর্তমান সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মানুষ উল্লেখযোগ্য উৎপাদনশীলতা লাভে চ্যাটজিপিটির মতো টুলগুলো ব্যবহারের উপায় খুঁজে পেয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা শেষ পর্যন্ত এজিআইয়ের দিকে নিয়ে যাবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তিনি আরও বলেন, ওপেন এআই এমন এজিআই পরবর্তী বিশ্বের জন্য কল্পনা করছে, যেখানে মানুষ ও এজিআইয়ের মধ্যে একটি সিম্বাওটিক সম্পর্ক রয়েছে, যেখানে এজিআই মানবতার তৈরি সেরা হাতিয়ার হিসেবে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসবে। অল্টম্যান এমন একটি ভবিষ্যৎ কল্পনা করেন, যেখানে একাধিক এজিআই, বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার দ্বারা বিকশিত হবে এবং সহাবস্থান করবে। এই বৈচিত্র্য বিভিন্ন দৃষ্টিকোণকে উৎসাহ দেওয়ার মাধ্যমে এর ব্যবহারিক ক্ষেত্রকে সমৃদ্ধ করে তুলবে।

তবে এআইসংক্রান্ত গবেষণা পদ্ধতির ব্যাপারে নোয়াম চমস্কি এবং তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের জায়গা থেকে রজার পেনরোজ বিরোধিতা করেছেন। উল্লেখ্য, নোয়াম চমস্কি তাঁর কর্মজীবনের বেশির ভাগই ভাষাতত্ত্ব এবং কগনিটিভ বা চৈতন্যবিজ্ঞানের সুসংজ্ঞায়িত ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে ব্যয় করেছেন। গবেষণার পদ্ধতিগত দিকের প্রতি দৃষ্টিপাত করে চমস্কি বলেছেন, শুধু অসংখ্য উপাত্তের ভিত্তিতে ডিডাকটিভ পদ্ধতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চেতনার জায়গায় পৌঁছাতে পারবে না। এটা একটা বিপজ্জনক বাণিজ্যিক প্রবণতার প্রকৌশলজাত অভিঘাত। পদার্থবিজ্ঞানের জায়গা থেকে চমস্কি বলেছেন, যদি সাফল্য বলতে বিপুল পরিমাণ অবিশ্লেষিত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে মোটামুটি সঠিক একটা অনুমানে আসতে পারাকে বোঝানো হয়, তাহলে চিরকাল বিজ্ঞান সবকিছুকে যেভাবে উপলব্ধি করতে চেয়েছে, সেই ধরনের উপলব্ধি অর্জন সম্ভব নয়—আমরা যা পাব তা হচ্ছে বিভিন্ন ঘটনাবলির একটা ভাসা ভাসা অনুমান।

রজার পেনরোজ মানুষের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে সন্দেহ পোষণ করে আসছেন। তিনি যুক্তি দেন যে কম্পিউটার নির্দিষ্ট কাজে পারদর্শী হতে পারে, তবে তাদের সচেতন চিন্তার জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলোর অভাব রয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, গাণিতিক কিংবা অ্যালগরিদমিক উপায়ে মানুষের চেতনা এবং উপলব্ধি সম্পূর্ণরূপে প্রতিলিপি করা যায় না। এটা পদার্থবিজ্ঞানের সেই মৌলিক নীতি, কোয়ান্টাম কম্পিউটার বানাতে গেলেও মেনে চলতে হবে। অনিশ্চয়তার নীতি, ১৯২৭ সালে ওয়ার্নার হাইজেনবার্গের আবিষ্কার, এটি ২০২০ সালেও সত্যি। অনিশ্চয়তার নীতি হলো কোয়ান্টাম বলবিদ্যার দীর্ঘ ছায়া—আপনি নিজের ছায়া থেকে পালাতে পারবেন না।

বিজ্ঞানের মৌলিক নীতিমালা বোঝা ছাড়া, শুধু পরিসংখ্যানগত অবিশ্লেষিত তথ্য দিয়ে সম্ভাবনার তত্ত্ব ব্যবহার করা, ইঞ্জিনিয়ারিং ট্রেডের ভিত্তিতে বিকশিত হওয়া এআইসম্পন্ন স্মার্ট ডিভাইসগুলো মানবসমাজে খুব একটা ভালো ভূমিকা নেবে বলে মনে হয় না। একধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে। বিজ্ঞানের মৌলিক নীতিসমূহে সম্পৃক্ত না হওয়ায় সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ খুবই অস্পষ্ট বিষয় হয়ে পড়তে পারে। ফলে আমরা বুঝতে পারছি না স্মার্টফোনসহ এআই সম্পর্কিত সব ডিভাইসের স্বরূপ। তবে এটা খুব স্পষ্টত যে উল্কাপিণ্ডের অভিঘাতে গ্রহ-উপগ্রহগুলো ক্ষতবিক্ষত হওয়ার মতোই প্রযুক্তির কারণে সমাজ-সভ্যতা ও পারিবারিক বন্ধনগুলো নড়বড়ে হয়ে পড়াটা ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। ছোটরা বড়দের অভিজ্ঞতা নিতে চাইছে না। শুধু তা-ই নয়, অবজ্ঞা করছে। কিছু ক্ষেত্রে অসম্মানের পর্যায়ে পৌঁছেছে মা-বাবার সঙ্গে সন্তানদের সম্পর্ক; শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক বেসামাল হয়ে পড়েছে। শুধু ছয় ইঞ্চি বাই আড়াই ইঞ্চি প্রস্থের একটি স্মার্ট যন্ত্রই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এটা যেন রবীন্দ্রনাথের সেই গল্পের মতো, যেখানে পিতা-পুত্রের সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিপরীত—পিতা ছোট এবং পুত্র বড়।

ভবিষ্যৎকে নিখুঁতভাবে নিরূপণ করা না গেলেও ৩০ হাজার বছর আগের গুহাচিত্র থেকে বোঝা যায়, অতীতের অভিজ্ঞতা ও বর্তমানের বাস্তবতার আলোয় পরিবর্তন বা ভবিষ্যৎ মোকাবিলার প্রচেষ্টা আমাদের রয়েছে, এভাবেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু স্মার্ট প্রযুক্তির কারণে পরিস্থিতিটা এমন যে বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ অবহেলা করে ভার্চুয়াল জগৎকে বাস্তব ভেবে জীবনের সম্পর্কগুলো নিরূপণ করা শুরু করেছে বর্তমান প্রজন্ম, যা আমাদের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত বলা যায়। যেখানে মৃত্যু সফটওয়্যার গেমের মতো সাময়িক; সেই পরম বিশ্বাসে যাওয়া যে আমরা আবার জীবিত হব। এতে জীবনের প্রতি মমতা, ভালোবাসা ক্রমাগত হারিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক অনেক ঘটনাই সেটার আলামত দিচ্ছে। অর্থনৈতিক ও শিক্ষায় দুর্বল আফ্রিকা-এশিয়ার দেশগুলো প্রযুক্তির এই অভিঘাতে আক্রান্ত হচ্ছে। সঠিক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া ছাড়া এই বাণিজ্যের লোভ ও লাভের থাবা থেকে পশ্চিমা দেশগুলোর তরুণ প্রজন্মও রেহাই পাবে না। এ জন্য স্মার্টফোনসহ এআইসংক্রান্ত ব্যাপারে আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ধর্ষণে বাধা দেওয়ায় ৩৪ বছরের নারীকে খুন ১৮ বছরের তরুণের

বিদেশ থেকে মেশিন এনে টঙ্গিবাড়ীতে ইয়াবা তৈরি, বিপুল সরঞ্জামসহ যুবক আটক

আজকের রাশিফল: চোখের পানি মুছতে সঙ্গে রুমাল রাখুন, পেটের চর্বিটা আজ খুব ভাবাবে

বনশ্রীতে স্কুলছাত্রীকে হত্যা: নিজেদের হোটেলের কর্মচারী আটক

নির্বাচনে প্রার্থিতা: বিদ্রোহে ভুগছে বিএনপি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত