৫ আগস্টের পর আমরা অনেক আশায় বুক বেঁধেছিলাম। ফ্যাসিবাদ বিদায় হয়েছে, দেশ মুক্ত পরিবেশে অধরা কার্যকর গণতন্ত্রের সন্ধানে আবার সামনে যাত্রা শুরু করবে। তিন দিন সরকার ছাড়া দেশ চলার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান করে গঠিত হলো উপদেষ্টা পরিষদ। প্রথমে অল্প কয়েকজন সদস্য নিয়ে শুরু হলো সরকারের যাত্রা। উপদেষ্টাদের অনেকের রাজনীতি বা সরকারি প্রশাসনের অভিজ্ঞতা ছিল না। আওয়ামী লীগের পতনের পরের চরম অস্থিতিশীল পরিবেশে ইউনূস সরকার শুরুর দিকে হিমশিম খেয়েছে। ভেঙে পড়া পুলিশ বাহিনীকেই কাজে ফেরাতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। নিজেদের সীমাবদ্ধতা কিংবা ব্যর্থতার কথা প্রকারান্তরে উপদেষ্টাদের কেউ কেউ স্বীকার করেছেন। বলেছেন নিজেদের অভিজ্ঞতার অভাব এবং সমস্যার বিশাল মাত্রার কথা। মেয়াদের শেষে বিভিন্ন মহল থেকে সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব কষতে গিয়ে দেখা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির ফারাকটাও বেশ বড়। তবে অর্থনীতিকে খাদের কিনারা থেকে ফিরিয়ে আনার কৃতিত্বটা তাদের অবশ্যই দেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনা ক্ষমতার শেষ কয়েক বছর তাঁর নেতা-কর্মীদের প্রায়ই বলতেন, ক্ষমতা হারালে একজনেরও পিঠের ছাল থাকবে না। একপর্যায়ে ওবায়দুল কাদের বললেন, ক্ষমতা হারালে ৩ লাখ মানুষ মারা যাবে। একদিন শেখ হাসিনা বলে দিলেন, ৫ লাখ মানুষ মারা যাবে ক্ষমতা হারালে। অর্থাৎ ‘ক্ষমতা হারানোর মতো’ কাজ করা যাবে না। কিন্তু নানা কারণে দৃশ্যত দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল সরকার হয়েও আল্লাহর রহমত, দায়িত্বশীল নেতা-নেত্রীর প্রচেষ্টা আর দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে চরম নৈরাজ্য বা বড় ধরনের রক্তপাত এড়ানো গেছে।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছিল সাড়ে ১৫ বছর ধরে। তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানো অসম্ভব মনে হচ্ছিল। কিন্তু ছাত্রদের কোটা আন্দোলন অবিশ্বাস্যভাবে তাঁর পতন ডেকে আনল। চরম স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি পায় দেশবাসী। কিন্তু এরপর এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা জুলাইয়ের অর্জনে কিছুটা হলেও কালিমা মেখে দেয়। মবতন্ত্র, পীর-ফকিরের মাজারে হামলা, নারী ও বাউলদের নির্যাতন, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ভাস্কর্য ও স্থাপনায় ভাঙচুর বা বিকৃত করা এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
গোয়ালন্দে নুরাল পাগলার লাশ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে ফেলা হলো। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়েও বিতর্কিত কথা শোনা যেতে লাগল অনেকের মুখে। এসবের সমালোচনা করলে আবার ঢালাওভাবে ‘ফ্যাসিস্টের সহযোগী’ তকমাও দেওয়া হচ্ছিল। প্রবাসী কিছু মানুষ শুরু করলেন নতুন নতুন বয়ান প্রচার। দেশবাসী হতে থাকল বিভ্রান্ত। শুরু হলো নতুন ধরনের উৎপাত। সরকারের ওপর ক্ষুদ্র একটি উগ্র অংশের বেশ প্রভাব দেখা গেছে একপর্যায়ে। অতীতের মব ও অন্যান্য অরাজকতার প্রতিকার না দেখে কেউ কেউ উৎসাহ পেয়ে গেল। দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার ভবনে হামলা হলো। হামলা করা হয় ছায়ানট ও উদীচী কার্যালয়ে।
দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পর থেকে দ্বিধাগ্রস্ত সরকারের কাছে পেশ করা হয় একের পর এক দাবিনামা। শুরু হয়েছিল অটোপাস দিয়ে। ছাত্রদের পড়াশোনা উঠল লাটে। এই দাবি আদায়ের আন্দোলন এখনো চলমান। দুই দিন পর জাতীয় নির্বাচন, দায়িত্বে একটি বিদায়ের পথে থাকা সরকার। অথচ নবম পে স্কেলের প্রতিবেদন দিতে না দিতেই তা বাস্তবায়নের আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। বলা হয়েছে, সরকারি চাকুরেদের বেতন দ্বিগুণ থেকে আড়াই গুণ বাড়বে। সরকারের সক্ষমতা এবং মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় এখন তা কতটা বাস্তবসম্মত? ১০-১২ লাখের বেতন দ্বিগুণ হলে বেসরকারি খাতের অসংখ্য কর্মীর কী হবে? সবাইকে তো একই দামে চাল, তেল, মাছ-মাংস কিনতে হবে!
৫ আগস্টের পর সারা দেশে অনেক মানুষকে ঢালাও ফ্যাসিবাদের দোসর আখ্যা দিয়ে অপমান করা হয়েছে। সমন্বয়ক পরিচয় দেওয়া অনেকের দ্বারা মিথ্যা মামলা দেওয়া, চাঁদা দাবি করা, পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। গুলশানে সাবেক এক এমপির বাসায় টাকা চাইতে গিয়ে পুলিশে আটক হওয়ার ঘটনা তো দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে।
জুলাইয়ের নতুন বন্দোবস্তের অঙ্গীকার অনেক আশা জাগিয়েছিল। কিন্তু পত্রিকা অফিসে হামলা সাংবাদিকদের শঙ্কিত করেছে। আগের তুলনায় পরিস্থিতি ভালো হলেও সেলফ সেন্সরশিপ চর্চা করছেন অনেকে। যদিও তা কিছুটা অভ্যাসবশত আর কিছুটা অনিশ্চয়তা থেকে। ছাত্রলীগের নেতা সাদ্দাম স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুর পরও প্যারোলে মুক্তি পাননি। স্ত্রী ও শিশুসন্তানের লাশ এসেছে জেলগেটে জীবিত বাবার সঙ্গে দেখা করতে! তার জের না কাটতেই এমন আরেক ঘটনায় ভৈরবের ফুল মিয়ার লাশ জেলগেটে এসেছে ছেলে মিলন মিয়াকে দেখতে! সাংবাদিক আনিস আলমগীর হঠাৎ আটক হয়ে এখনো জেলে। এই প্রশ্নেরও জবাব খুঁজছেন অনেকে। এমন পরিস্থিতির জন্য তো ১ হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ দেয়নি।
নির্বাচন কমিশন গঠন করার পর তারা নীরবে কাজ করেছে। সিইসি বয়স্ক মানুষ, কথা মোটামুটি কমই বলেন। কিন্তু তাঁদের কিছু কাজ সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। আচরণবিধি সংশোধন করে তাঁরা অনেক কিছু নতুন যুক্ত করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল। তাঁরা কারও সঙ্গে আলোচনা না করে তা তুলে দিলেন। এটার উদ্বেগজনক ব্যবহার আমরা দেখতে পেলাম। পরে অবশ্য তার মাত্রা কমে এসেছে। আচরণবিধির ব্যাপারে ইসি অনেক নমনীয়তা দেখিয়েছে। বড় দলের এক প্রার্থী ১০ হাজার লোককে আপ্যায়ন করেছেন। তা সবারই জানা। কিন্তু ইসি নীরব থাকল। অথচ ছোট দলকে তারা শাস্তি দিল। ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে অনেক ঋণখেলাপি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। ইসির সাইবার টিম আছে। কিন্তু তারা কী ব্যবস্থা নিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার ফেক বা বিদ্বেষমূলক কনটেন্টের বিষয়ে? এবার কেউ কেউ ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ আশঙ্কার কথা বলেছেন। আবার অনেকে বলেন, তাঁরা সে রকম কোনো আশঙ্কা দেখছেন না। কারণ, সময়টা অন্য রকম। সাংগঠনিক শক্তি-সামর্থ্যের ব্যবধান থাকলেও কোনো পক্ষ ছেড়ে কথা বলবে না। কেউ উল্টাপাল্টা কিছু করতে গেলে রক্ত ঝরবে—সেটা কারও প্রত্যাশা নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে একটা সময়ে বারবার দ্রুত নির্বাচনের দাবি উঠতে থাকে। কিন্তু তারা কিছু সংস্কারের জনদাবিকে প্রাধান্য দিয়ে সময় নেয়। সময়টা দীর্ঘই বলতে হবে। এ সময়ের মধ্য অনেকগুলো কমিশন বহু বহু সুপারিশ দিয়েছে। তার কতখানি কাজে লাগানো হবে বা সম্ভব, তা দেখার বিষয়। তবে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ পাস হলে এর একটা আইনি ভিত্তিরও বাধ্যবাধকতা আসবে। দলগুলোর চাপের মুখে সরকার একপর্যায়ে নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণা করে। তারা শেষ দিকে বলেছে, যেকোনো মূল্যে নির্বাচন হবেই। কারও ক্ষমতা নেই তা ঠেকানোর। এখন মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ একটা নির্বাচন করতে পারলে ইউনূস সরকারের অনেক ঘাটতিকে ‘ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে’ দেখতে দেশবাসী নিশ্চয় আপত্তি করবে না।
প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার দিতে হয় বাস্তবভিত্তিক, যা রক্ষা করা যায়। কবি রবার্ট ফ্রস্ট লিখেছিলেন: ‘বাট আই হ্যাভ প্রমিজ টু কিপ’। ‘প্রমিজ ইজ ক্লাউড’ বলে একটা কথা চালু আছে। অঙ্গীকারকে বলা হয় মেঘের মতো, যতক্ষণ না তা বৃষ্টি হয়ে ঝরে। সরকার যা বলেছে, নির্বাচন কমিশন যা বলেছে, দলগুলো যা বলেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যা বলেছে—সবই হলো অঙ্গীকার। এটা আকাশে উড়ে বেড়ায়। এক এলাকায় মেঘ জন্ম নিয়ে ভেসে অন্যদিকে চলে যায়। অনেক সময় মেঘ মসিকালো হলেও বৃষ্টি হয়ে ঝরে না। এখন দেশের আকাশে মেঘের মতো প্রতিশ্রুতি ভেসে বেড়াচ্ছে। কথায় বলে, প্রতিশ্রুতি, বিশ্বাস ও হৃদয়—এই তিনটি কখনো ভাঙতে নেই। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা অর্থ উপদেষ্টার ভাষায় ‘স্থিতিশীল’ হলেও তা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। বিগত সরকারের দুর্নীতির ম্যানহোলগুলো ‘উন্নয়নের চাদর’ দিয়ে ঢাকা ছিল। বর্তমানে দেশে ৪০০ পোশাক কারখানাসহ বহু কলকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ। সুতরাং কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিতান্ত খারাপ। খেলাপি ঋণ সর্বকালের সর্বোচ্চ, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ স্থবির, জিডিপির প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩ শতাংশ, এডিপি বাস্তবায়ন সর্বনিম্ন, মূল্যস্ফীতি উচ্চ, রপ্তানি ঋণাত্মক। একমাত্র রেমিট্যান্স স্বাভাবিক। উদ্যোক্তারা প্রায় সবাই হাত গুটিয়ে বসে আছেন। তবে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই পারে এই দমবন্ধ অবস্থা থেকে দেশের ১৮ কোটি মানুষকে মুক্তি দিতে।
শেষ করি কবিগুরুর কথা দিয়ে: বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি/ শুষ্ক হৃদয় লয়ে আছে দাঁড়াইয়ে/ ঊর্ধ্বমুখে নরনারী।
লেখক: সংবাদকর্মী

ফেব্রুয়ারি আমাদের ভাষার মাস—আবেগ, আত্মত্যাগ আর গৌরবের মাস। এই মাস এলেই আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি ভাষাশহীদদের, যাঁদের রক্তের বিনিময়ে পেয়েছি মাতৃভাষার অধিকার। প্রতিবছর মাসজুড়ে অমর একুশে বইমেলার আয়োজন সেই স্মৃতিকে আরও জীবন্ত করে তোলে।
৩ ঘণ্টা আগে
মুদ্রণযন্ত্রের কোনো ভুল নয়। শিরোনামটি ‘নির্যাতন’ই লেখা হয়েছে। পাঠক হয়তো ভাবছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে যত ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোই বুঝি এ মুহূর্তে বেশি গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু নির্বাচনের ডামাডোলের ভিড়ে নির্যাতনের একটি খবর চাপা না পড়ে বরং জনগণের বিবেক নাড়িয়ে দিচ্ছে।
৩ ঘণ্টা আগে
‘কথায় রাজা উজির মারা’র বাংলাদেশ কথামালার রাজনীতিচর্চার এক অতি উর্বর ক্ষেত্র। এ দেশে ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়নের মধ্যে কত যে বিস্তর ব্যবধান থাকে, সে নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না পারতপক্ষে। বেশির ভাগ রাজনীতিবিদ যেমন প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সময় সেটি আদৌ বাস্তবায়নযোগ্য কি না...
১ দিন আগে
বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ—প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের বসবাস এখানে এবং দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গতিশীল উন্নয়ন-ধারার একটির মধ্য দিয়ে দেশটি এগোচ্ছে। এ ধরনের বিশাল জনগোষ্ঠীর বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ কোনো পার্শ্বিক চ্যালেঞ্জ নয়; এটি কাঠামোগত বাস্তবতা।
১ দিন আগে