Ajker Patrika

আগামীর সবুজ বাংলাদেশ

শাইখ সিরাজ
আগামীর সবুজ বাংলাদেশ
জাতীয় বৃক্ষমেলায় দর্শনার্থী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলছেন লেখক। ছবি: লেখকের সৌজন্যে

ইট-পাথরের ধূসর নগরীর কংক্রিটের এই জঙ্গলে হাঁপিয়ে ওঠা নগরবাসীর কাছে প্রতিবছর এক পশলা প্রশান্তির বৃষ্টি হয়ে আসে ‘জাতীয় বৃক্ষমেলা’। ‘বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—এই সময়োপযোগী ও উদ্দীপনামূলক প্রতিপাদ্যকে বুকে ধারণ করে শুরু হয়েছে জাতীয় বৃক্ষমেলা-২০২৬। পুরোনো বাণিজ্য মেলার বিশাল প্রাঙ্গণ যেন এখন পরিণত হয়েছে এক টুকরা নিবিড় অরণ্যে। মেলায় ঢুকলেই চোখ জুড়িয়ে যায় সারি সারি গাছে ঝুলন্ত রঙিন ফল আর স্নিগ্ধ সবুজের সমারোহে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন, যার মূল লক্ষ্য কেবল যত্রতত্র গাছ লাগানোই নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলা করা এবং দেশের আপামর জনসাধারণকে এই সবুজ বিপ্লবে সরাসরি সম্পৃক্ত করা।

আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের এক যুগান্তকারী মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। জিআইএস, ড্রোন প্রযুক্তি আর ‘ন্যাশনাল ট্রি ডেটাবেইস’-এর মাধ্যমে ডিজিটাল মনিটরিংয়ের আওতায় আসবে এই বিশাল বনায়ন কর্মসূচি। কোথায় গাছ লাগানো হচ্ছে, গাছের বর্তমান অবস্থা কী, তা স্যাটেলাইট ও ড্রোনের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ করা হবে। এই মেগা পরিকল্পনার হাত ধরে দেশে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ নতুন সবুজ কর্মসংস্থান বা ‘গ্রিন জব’ সৃষ্টি এবং ১০ হাজার নতুন নার্সারি উদ্যোক্তা গড়ে তোলার এক সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

মেলার ভেতরে হাঁটলেই বোঝা যায়, নগরবাসীর রুচি, চাহিদা ও বাস্তবতায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ১২০টি স্টলজুড়ে ফুল, ফল, বনজ আর ঔষধি গাছের এক বিশাল সমাহার। দেশি ফলের পাশাপাশি নার্সারির মালিকেরা নিয়ে এসেছেন ভিনদেশি সব চমকপ্রদ প্রজাতি। জাপানের বিশ্বখ্যাত মিয়াজাকি আম থেকে শুরু করে আমেরিকান রেড পালমার, ভিনদেশি রাম্বুটান, আরবের খেজুর কিংবা পারসিমন—কী নেই এই মেলায়!

নগরবাসী এখন আকাশ পানে তাকিয়েছেন, তাঁদের বাড়ির ফাঁকা ছাদগুলো হয়ে উঠছে এক টুকরা আবাদি জমি। ছাদকৃষির এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা বৃক্ষমেলার পুরো চিত্রটাই বদলে দিয়েছে। মেলায় এখন সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ‘হাফ ড্রাম’ এবং ‘রেডি গ্রো-ব্যাগ’ উপযোগী গাছ। মাটি ছাড়া অর্কিড, উন্নতমানের সারমাটি, ড্রাম আর বাগানের সব আধুনিক সরঞ্জাম নিয়ে মেলাটি যেন নগর-কৃষকদের জন্য এক পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজ। শুধু জিনিসপত্র বিক্রিই নয়, মেলায় মিলছে বাগানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ পরামর্শও।

সবুজের এই বিশাল হাটে ক্রেতাদের উন্মাদনা যেমন আছে, তেমনি আছে কিছু আক্ষেপের সুর। অনেক ক্রেতার দীর্ঘদিনের অভিযোগ, চড়া দামে কেনা শখের চারা বাড়িতে নেওয়ার কিছুদিন পরই মারা যায়। আবার অনেক সময় বিদেশি উন্নত জাত বলে সাধারণ দেশি জাত গছিয়ে দেওয়ার মতো প্রতারণাও ঘটছে অহরহ। এখানেই আসে রাষ্ট্রের ভূমিকার প্রশ্ন। দেশে উৎপাদিত বা আমদানি করা বিভিন্ন খাদ্য, রাসায়নিক, কৃষি ও প্রকৌশল পণ্যের গুণগত মান নির্ধারণ ও তদারকি করতে যেমন বিএসটিআই রয়েছে, গাছের চারার জাত ও সুস্থতা নিশ্চিতে তেমন কোনো সার্টিফিকেশন অথরিটি বা ‘চারার মান নিয়ন্ত্রণ বোর্ড’ থাকা উচিত।

এই খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে নার্সারিগুলোকে অবিলম্বে কঠোর নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। প্রতিটি চারার গায়ে যদি কিউআর কোড ট্যাগ করে দেওয়া যায়, তবে এই জালিয়াতি রোধ করা সম্ভব। ক্রেতারা স্মার্টফোনে কিউআর কোড স্ক্যান করেই গাছের সঠিক জাত, বয়স, উৎপত্তিস্থল এবং পরিচর্যার নিয়মকানুন জানতে পারবেন। এতে একদিকে যেমন প্রতারণা কমবে, অন্যদিকে মানসম্মত চারা রোপণ নিশ্চিত হবে।

বৃক্ষরোপণের এই বিশাল আয়োজনের সঙ্গে বর্তমান বিশ্বের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ধারণা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, আর তা হলো ‘কার্বন ক্রেডিট’। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, কার্বন ক্রেডিট হলো একধরনের পারমিট বা সনদ, যা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বা অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডল থেকে অপসারণ বা হ্রাস করার স্বীকৃতিস্বরূপ দেওয়া হয়। একটি কার্বন ক্রেডিট মানে হলো বায়ুমণ্ডল থেকে এক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড কমানো বা অপসারণ করা।

শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের বিশাল বিশাল কলকারখানা, যানবাহন ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে কার্বন নিঃসরণ করে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু চুক্তি অনুযায়ী, অনেক দেশের বা বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য কার্বন নিঃসরণের একটি নির্দিষ্ট আইনি সীমা বেঁধে দেওয়া থাকে। যখন কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠান সেই নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করে, তখন তাদের জরিমানা থেকে বাঁচতে বাজার থেকে ‘কার্বন ক্রেডিট’ কিনতে হয়। আর এই কার্বন ক্রেডিট তারা কেনে সেই সব দেশ বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে, যারা বেশি বেশি গাছ লাগিয়ে, বনভূমি রক্ষা করে বা পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন শুষে নিচ্ছে। এটি অনেকটা বিশ্ববাজারে নিজেদের জমানো অক্সিজেনের বিনিময়ে অর্থ উপার্জনের মতো একটি প্রক্রিয়া।

বাংলাদেশের জন্য কার্বন ক্রেডিটের বাজার এক বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হলেও, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে আমাদের দায় একেবারেই নগণ্য (১ শতাংশের কম)। এই ক্ষতিপূরণ এবং পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক কার্বন বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সুবিধা আদায় করতে পারে।

সরকারের নেওয়া আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের মহাপরিকল্পনাটি এ ক্ষেত্রে তুরুপের তাস হতে পারে। বাংলাদেশ কীভাবে এই কার্বন ক্রেডিটের অংশীজন হবে, তার চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে সরকারের ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থার মধ্যে। কার্বন ক্রেডিট পাওয়ার প্রধান ও সবচেয়ে কঠিন শর্ত হলো—স্বচ্ছতা, পরিমাপ এবং প্রমাণ (এমআরভি: মেজারমেন্ট, রিপোর্টিং অ্যান্ড ভেরিফিকেশন)। আপনি যে গাছ লাগাচ্ছেন এবং তা যে সত্যিই কার্বন শুষে নিচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক মহলকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করে দেখাতে হবে।

এখানেই কাজে লাগবে সরকারের জিআইএস, ড্রোন প্রযুক্তি আর ন্যাশনাল ট্রি ডেটাবেইস। ড্রোনের মাধ্যমে বনায়নের নিখুঁত ম্যাপিং এবং ডেটাবেইসে গাছের রিয়েল-টাইম তথ্য সংরক্ষণ করার ফলে বাংলাদেশ খুব সহজেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিজেদের কার্বন অফসেট প্রজেক্টের ভেরিফিকেশন করাতে পারবে।

শুধু সরকারি বনভূমি নয়, স্থানীয় পর্যায়ে নার্সারি উদ্যোক্তা এবং সাধারণ মানুষকেও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা সম্ভব। ছাদকৃষিতে যাঁরা বড় পরিসরে গাছ লাগাচ্ছেন বা গ্রামাঞ্চলে যাঁরা পতিত জমিতে বনায়ন করছেন, তাঁদের তথ্যও ন্যাশনাল ট্রি ডেটাবেইসে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত ‘কার্বন পোর্টফোলিও’ তৈরি করা যেতে পারে।

আন্তর্জাতিক পরিসরে তাকালে আমরা বৃক্ষরোপণ নিয়ে অভাবনীয় কিছু অনুপ্রেরণার গল্প দেখতে পাই। ফিলিপাইনে একটি যুগান্তকারী আইন রয়েছে, সেখানে হাইস্কুল বা কলেজ পাস করতে হলে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে অন্তত ১০টি গাছ লাগাতে হয়। ভাবুন তো, আমাদের দেশে প্রতিবছর যত শিক্ষার্থী পাস করে, তাদের দিয়ে যদি এমন কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা যায়, তবে দেশটা কতটা দ্রুত সবুজে ভরে উঠবে! অন্যদিকে, কেনিয়ায় নোবেলজয়ী পরিবেশকর্মী ওয়াঙ্গারি মাথাই ‘গ্রিন বেল্ট মুভমেন্ট’-এর মাধ্যমে নারীদের দিয়ে রোপণ করিয়েছিলেন ৫ কোটির বেশি গাছ। এই আন্দোলন শুধু পরিবেশই বাঁচায়নি, হাজার হাজার নারীকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বীও করেছিল।

গাছ হতে পারে আমাদের অমূল্য স্মৃতির ধারক ও বাহক। পরিবারের কারও জন্ম, বিবাহবার্ষিকী কিংবা প্রিয়জনের প্রয়াণে একটি গাছ হতে পারে সবচেয়ে সুন্দর ও জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ। আপনার সন্তানের বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আপনারই আঙিনায় বা ছাদে একটি গাছও বড় হতে পারে, যা বংশপরম্পরায় সাক্ষ্য দেবে আপনাদের অস্তিত্বের।

আগামী ৯ আগস্ট পর্যন্ত চলবে জাতীয় বৃক্ষমেলা-২০২৬। তবে এর আবেদন, শিক্ষা ও প্রভাব সুদূরপ্রসারী। রাজধানী ঢাকা ছাড়িয়ে আজ বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে এই সবুজের আন্দোলন।

একটি গাছের চারা রোপণ করা মানে আগামীর পৃথিবীর জন্য, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দারুণ এক বিনিয়োগ। আসুন, শিকড়ের টানে আমরা ফিরে যাই মাটির কাছে। ইট-পাথরের এই শহরের প্রতিটি ছাদ, প্রতিটি বারান্দা আর গ্রামের প্রতিটি পতিত জমি ভরে উঠুক সবুজে। আমাদের প্রত্যেকের লাগানো একটি করে গাছই পারে কার্বনমুক্ত, নিরাপদ ও আগামীর এক সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।

লেখক: পরিচালক ও বার্তাপ্রধান চ্যানেল আই

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত