বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি প্রতিষ্ঠার দিন

ইতিহাসের গতিপথ সর্বদা সরলরেখায় চলে না; মাঝে মাঝে তা মোড় নেয় রক্তস্নাত অলিগলি অতিক্রম করে রাষ্ট্র ও জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সুনির্দিষ্ট বাঁকে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তৎকালীন দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ভূরাজনীতি এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়-পরবর্তী সংকটময় ইতিহাসে তেমনই এক যুগান্তকারী ও অবিনাশী অধ্যায়। সে কারণে বাংলাদেশের মানুষ ৭ নভেম্বরকে বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।
৭ নভেম্বরের প্রেক্ষাপট
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল, পরবর্তী চার বছরে ভুল শাসননীতি, দুঃশাসন, একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) এবং সার্বিক সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়ার অশুভ আঁতাতের কারণে তা গভীর সংকটে নিপতিত হয়। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে সে স্বপ্ন ও প্রত্যাশা ভঙ্গ হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। আওয়ামী লীগের দুঃশাসন, লুটপাট, দুর্নীতি, নির্যাতনের স্টিম রোলার মানুষকে বছর পার না হতেই মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করে। শাসক ও সাধারণ মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয় ব্যাপক অর্থনৈতিক বৈষম্য, গণতন্ত্র ও জনগণের মৌলিক মানবাধিকার হরণ, চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ, একদলীয় অগণতান্ত্রিক বাকশালী শাসন, দলীয় পেটোয়া ও রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার ও বীভৎস হত্যাযজ্ঞ, নতজানু পররাষ্ট্রনীতি এবং মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হওয়া সিপাই বিপ্লবের প্রেক্ষাপট তৈরি করে।
দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী এবং এদেশের নিপীড়িত জনগণ যখন অনুভব করল যে, লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা এবং প্রিয় মাতৃভূমি আজ পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে চলেছে, তখনই সিপাই-জনতার ঐক্যের এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ছিল মুজিববাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক বিস্ফোরণ, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপশক্তির আধিপত্যবাদকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল এবং বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে এনেছিল এদেশের স্বাধীনতার ঘোষক, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে। আজ এই ঐতিহাসিক বিপ্লবের ৫১ বছর পূর্তি।
প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও সেনাবাহিনীতে চরম বিভ্রান্তি
স্বাধীনতার পর একটি আধিপত্যবাদী শক্তি চায়নি বাংলাদেশ শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। তাই সেনাবাহিনীকে দুর্বল রেখে শক্তিশালী প্যারা মিলিটারি ফোর্স রক্ষীবাহিনী গঠন করা হয়েছিল। ফলে সেনাবাহিনীর মধ্যে সৃষ্টি হয় তীব্র অসন্তোষ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী গোষ্ঠী তাদের সুনির্দিষ্ট অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে সক্রিয় হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ বীর উত্তমের নেতৃত্বে একটি উচ্চাভিলাষী ও বিভ্রান্তিকর সেনা অভ্যুত্থান ঘটে। এই অভ্যুত্থানের পেছনের অদৃশ্য চালিকাশক্তি ছিল বিদেশি আধিপত্যবাদী প্রভুদের গোপন নির্দেশ। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে একটি বিশেষ পরাশক্তির বলয়ে ঠেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম ছিলেন একজন সৎ, নীতিবান, পেশাদার এবং জনপ্রিয় সেনা কর্মকর্তা। তিনি অনুধাবন করেছিলেন, সেনাবাহিনীতে রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি করলে তা দেশের সার্বভৌমত্বকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলবে। তাই তিনি চক্রান্তকারীদের অসাংবিধানিক পদক্ষেপে সায় না দেওয়ায় তাঁকে নিজ বাসভবনে গৃহবন্দী করা হয়।
এ বিষয়ে সাংবাদিক ও বিখ্যাত গবেষক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর আলোচিত ‘বাংলাদেশ: এ লিগেছি অব ব্লাড’ গ্রন্থে তৎকালীন পরিস্থিতির বিবরণ তুলে ধরেছেন, ‘৩রা নভেম্বরের ক্যু কোনো জনমুখী অভ্যুত্থান ছিল না; এটি ছিল একটি উচ্চাভিলাষী সামরিক পদক্ষেপ, যা সাধারণ সৈনিকদের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। জিয়াউর রহমানের গৃহবন্দিত্ব সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। কারণ তারা তাঁকে জাতীয় সম্মান ও সামরিক সততার প্রতীক মনে করত। ৩রা নভেম্বর থেকে ৬ই নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ বিভিন্ন স্থানে যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল, তা সাধারণ সিপাই এবং এদেশের ধর্মপ্রাণ দেশপ্রেমিক জনগণের মধ্যে এই স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেয় যে, এদেশকে আবারও বিদেশি আধিপত্যবাদের কলোনিতে পরিণত করার চক্রান্ত চলছে।’

জিয়াউর রহমানের মুক্তি এবং ইতিহাসের মোড় পরিবর্তন
৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে ঢাকা সেনানিবাসের সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার এক অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ ঘটে। সিপাইরা ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’ এবং ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই, জিয়াউর রহমানের মুক্তি চাই’ স্লোগানে রাজপথ ও ব্যারাককে মুখরিত করে তোলে। অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে সাধারণ সিপাইরা তাদের প্রিয় জেনারেলকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে আনেন। মুক্ত হয়ে তিনি যখন সেনানিবাসে বের হয়ে আসেন, তখন হাজার হাজার সাধারণ সৈনিক তাঁকে ঘিরে উল্লাসে ফেটে পড়ে। জিয়াউর রহমান কোনো ক্ষমতার লোভ বা ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে এগিয়ে আসেননি; বরং সিপাই ও জনতার আস্থাই তাঁকে দেশের সুপ্রিম কমান্ডার হিসেবে স্থান করে দেয়। সেনানিবাসের সিপাইদের বিপ্লবের খবর মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঢাকা শহরে। সাধারণ জনগণ রাজপথে নেমে আসে। সিপাই ও জনতা একে অপরকে কোলাকুলি করে, ট্যাংকের ওপর উঠে জাতীয় পতাকা ওড়ায় এবং আধিপত্যবাদ-বিরোধী স্লোগান দেয়। ইতিহাসে সিপাই-জনতার এমন রক্তপাতহীন ও স্বতঃস্ফূর্ত গণবিপ্লবের নজির বিরল।
সেই রাতের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী লে. কর্নেল (অব.) এম এ হামিদ পিএসসি এভাবে, ‘বিপ্লবী সেপাইরা বিভিন্ন ইউনিট থেকে বেরিয়ে এসে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জিয়ার বাসভবনের চারপাশে সমবেত হতে থাকে। সবারই লক্ষ্যস্থল ছিল জিয়ার বাসভবন। সবাই সেখানে একত্র হয়ে দুর্গ ভেঙে বন্দী জিয়াকে বের করে আনবে, এই ছিল পরিকল্পনা।’ (তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা, লে. কর্নেল (অব.) এম এ হামিদ, পিএসসি, হাওলাদার প্রকাশনী, ত্রয়োদশ সংস্করণ, ২০২৪, পৃষ্ঠা-১৫৮)। মুক্তিযুদ্ধকালীন জিয়াউর রহমানের ভূমিকা, উঁচুমানের পেশাদারত্ব, দেশপ্রেম ও সততার কারণে তিনি সেই অস্থির মূহূর্তে সেনা ও অফিসারদের ভরসার চূড়ান্তস্থলে পরিণত হয়েছিলেন। দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতির প্রখ্যাত মার্কিন গবেষক লরেন্স লিফশুলজ তাঁর আলোচিত ‘বাংলাদেশ: দ্য আনফিনিশড রেভুলেশন’ গ্রন্থে সে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, ‘৭ই নভেম্বরের ভোরের আলো ফোটার আগেই হাজার হাজার সৈনিক এবং বেসামরিক জনতা ঢাকার রাজপথে নেমে আসে। ট্যাংকগুলো জনগণকে দমন করতে বের হয়নি, বরং সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ফুল দিয়ে সজ্জিত হয়ে রাজপথে নেমেছিল।’
আধিপত্যবাদের পরাজয় ও স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ
৭ নভেম্বর শুধু একজন ব্যক্তির মুক্তির দিন ছিল না, দিনটি ছিল বাংলাদেশকে একটি পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত করার আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত পরাজয়। ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এবং অভ্যন্তরীণ নীতিতে যেভাবে প্রতিবেশী দেশের অনুকম্পা ও আধিপত্য চেপে বসেছিল, ৭ নভেম্বরের বিপ্লব সেই শৃঙ্খলকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। এ দিনের অভ্যুত্থান আঞ্চলিক আধিপত্যবাদের সেই শক্তিকে চূড়ান্তভাবে ভেঙে দেয়, যা জন্মলগ্ন থেকেই বাংলাদেশকে গ্রাস করার হুমকি দিচ্ছিল।
রাষ্ট্রনায়ক জিয়া: সামরিক আইন প্রশাসক থেকে প্রেসিডেন্ট
৭ নভেম্বরের সিপাই-জনতার বিপ্লব জিয়াউর রহমানকে এক ঐতিহাসিক জাতীয় দায়িত্বের মুখোমুখি এনে দাঁড় করায়। এ রকম অস্থির ও বিপন্ন সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার ভার গ্রহণ করা কোনো বিলাসিতা ছিল না, ছিল এক কঠিন ব্রত। তিনি প্রথমে উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংহতি রক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা পুনর্বাসনের স্বার্থে তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তবে সামরিক পোশাকের আড়ালে তিনি নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যে, একটি টেকসই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য জনগণের সরাসরি সম্মতি এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পুনরুজ্জীবন অপরিহার্য। তাই তিনি দ্রুত দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক রওনক জাহান তাঁর ‘বাংলাদেশ পলিটিকস: প্রবলেমস অ্যান্ড ইস্যুস’ গ্রন্থে লিখেছেন, জিয়াউর রহমান অনুধাবন করেছিলেন, সামরিক শাসনজনিত বৈধতা ক্ষণস্থায়ী। গণভোট আয়োজন, স্থানীয় নির্বাচন পরিচালনা এবং অবশেষে ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ের জন্য একটি রাজনৈতিক দল গঠনের মাধ্যমে তিনি তাঁর শাসনকে বেসামরিকীকরণ করেন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেন। ১৯৭৮ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিয়াউর রহমান ব্যাপক জনভোটে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি সিপাই-জনতার বিপ্লবের জনআকাঙ্ক্ষাকে সরাসরি গণতান্ত্রিক বৈধতায় রূপান্তর করেন।
বিএনপি গঠন ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ
এ বিপ্লবের পর বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক দর্শনের জন্ম হয়, তার মূর্ত রূপ হলো ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শহীদ জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ (বিএনপি)। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক দল ছিল না; এটি ছিল ৭ নভেম্বরের সিপাই বিপ্লবের চেতনাসম্ভূত এক বিরাট জাতীয় ঐক্যমঞ্চ। এদেশের বামপন্থী, ডানপন্থী, মধ্যপন্থী এবং দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক শক্তিকে একই পতাকাতলে নিয়ে আসার এক ঐতিহাসিক প্রয়াস ছিল এটি। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে ভৌগোলিক অবস্থান, ভাষা, ধর্ম এবং সংস্কৃতির অনন্য মিশ্রণে গঠিত এ ভূখণ্ডের মানুষের আসল পরিচয় হলো ‘বাংলাদেশি’। আওয়ামী লীগের সংকীর্ণ ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’, যা এদেশের অন্যান্য নৃগোষ্ঠীকে বাদ দিয়েছিল এবং বাংলাদেশকে একটি বিশেষ প্রতিবেশীর সাংস্কৃতিক বলয়ে আটকে রাখতে চেয়েছিল, তার বিপরীতে জিয়ার ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ এদেশের সর্বস্তরের মানুষকে একটি শক্তিশালী জাতীয় পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ করে এবং জাতীয় ঐক্যের সূচনা করে।
স্বনির্ভর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
৭ নভেম্বরের বিপ্লবের পর জেনারেল জিয়াউর রহমান যে বাংলাদেশের শাসনভার লাভ করেছিলেন, সেটা ছিল তলাবিহীন ঝুড়ি নামে আখ্যায়িত এক অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া রাষ্ট্র। কিন্তু তাঁর কঠোর পরিশ্রম, সততা এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশ অল্প সময়ের মধ্যেই একটি স্বনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত হতে শুরু করে। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন। আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক বলেছিলেন, ‘সোভরেইনটি ইজ নট গিভেন, ইট ইজ টেকেন’ জিয়াউর রহমান ঠিক এই কাজটিই করেছিলেন। তিনি গ্রামে গ্রামে গিয়ে ‘খাল কাটা কর্মসূচি’ পরিচালনা করেন এবং এদেশের কৃষককে উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁর আমলেই বাংলাদেশ খাদ্যঘাটতি পূরণ করে বিদেশে চাল রপ্তানির যোগ্যতা অর্জন করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানকে তিনি শীর্ষে নিয়ে যান। ইসলামি সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি)-তে তিনি ওআইসি আল-কুদস কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধ মধ্যস্থতায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার যে স্বপ্ন জিয়াউর রহমান দেখেছিলেন, তার ফলেই পরবর্তীতে গঠন করা হয় ‘সার্ক’। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাপানকে পরাজিত করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়, যা ছিল জিয়ার দূরদর্শী কূটনৈতিক সাফল্যের এক জ্বলন্ত প্রমাণ।
বিএনপির রাজনৈতিক ধারা ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা
সিপাই-জনতার বিপ্লবের মূল চেতনা ছিল, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করা, আধিপত্যবাদকে প্রতিহত করা এবং গণমানুষের সরকার প্রতিষ্ঠা করা। বিএনপি এই চেতনাকেই তাদের মূল রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে গ্রহণ করেছে। যখনই বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিপন্ন হয়, যখনই কোনো অগণতান্ত্রিক ও আধিপত্যবাদী শক্তি জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে দেশকে একটি পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়, তখনই ৭ নভেম্বরের বিপ্লব আমাদের প্রেরণা জোগায়।
৭ নভেম্বরের অঙ্গীকার
আজ ঐতিহাসিক সিপাই-জনতার বিপ্লবের ৫১ বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে আমাদের শপথ নিতে হবে যে, ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাই ও জনতা যে ইস্পাতদৃঢ় ঐক্যের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছিল, আমরা তা কোনো অবস্থাতেই ক্ষুণ্ন হতে দেব না। জনগণের ঐক্য এবং সেনাবাহিনীর দেশপ্রেম যদি এক সুতোয় গাঁথা হয়, তবে পৃথিবীর কোনো আধিপত্যবাদী শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে গোলাম বানিয়ে রাখতে পারে না। শহীদ জিয়াউর রহমানের সেই ঐতিহাসিক বাণী আজও আমাদের হৃদয়ে অনুরণিত হয়: ‘দেশ ও জাতির স্বার্থে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, স্বনির্ভর হতে হবে।’
আজকে যখন দেশের ভেতরে ও বাইরে থেকে বাংলাদেশকে অস্থির করতে, এর অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে দেশি-বিদেশি যড়যন্ত্রকারীরা নানামুখী চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে, তখন জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের চেতনা পুনরুজ্জীবিত ও ধারণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।
লেখক: সালাহউদ্দিন আহমদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিএনপি









