ইসরায়েল-আমেরিকার নিরন্তর আক্রমণ আর সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্রের জালে জড়িয়ে ইরানের বর্তমান রেজিম ও রাষ্ট্র যদি শেষ পর্যন্ত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র এমন এক রক্তক্ষয়ী গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাবে, যার সহজ কোনো সমাধান নেই। ইরানের পতন মানে শুধু রেজিমের পতন বা বিদায় নয়, বরং এক সুপ্রাচীন আঞ্চলিক শক্তির ভরকেন্দ্র চুরমার হয়ে যাওয়া।
ইরান কোনো একক জাতির দেশ নয়; এখানে পারসিকদের পাশাপাশি আজেরি, কুর্দি, আরব আর বেলুচদের বৈচিত্র্যময় সহাবস্থান রয়েছে। আর তাই বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এবং বিশ্লেষকেরা বারবার সতর্ক করছেন, ইরানের কেন্দ্রীয় শাসন যদি একবার ধসে যায়, তবে দেশটি লিবিয়া বা সিরিয়ার মতো কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়বে এবং ‘বলকানাইজেশনে’র ফাঁদে পড়বে। আর এই ফাঁদ শুধু ইরানে গৃহযুদ্ধ ডেকে আনবে না, বরং প্রতিবেশী তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইরাকের সীমান্তও দাউ দাউ করে জ্বালিয়ে দেবে।
বিশেষ করে কুর্দিস্তানের স্বাধীনতার দাবি তুরস্কের ভেতরে কুর্দি বিদ্রোহকে এমনভাবে উসকে দেবে, যা আঙ্কারার জন্য অস্তিত্বের সংকট হয়ে দাঁড়াতে পারে। তেমনিভাবে সিস্তান-বালুচিস্তান অঞ্চল পৃথক হওয়ার চেষ্টা করলে পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশেও সরাসরি এর প্রভাব পড়বে, যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেবে। একই সঙ্গে এই দেশগুলোতে কোটি কোটি মানুষ নিজ শিকড় হারিয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে, যা এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।
ইরানের অবর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের হৃৎপিণ্ডে এক বিশাল ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হবে। বর্তমানে ইরান লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজার হামাস কিংবা ইয়েমেনের হুতির মতো গোষ্ঠীগুলোর মূল অভিভাবক। তেহরানের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গেলে এই সশস্ত্র দলগুলো কোনো কেন্দ্রীয় কমান্ড ছাড়া ভবঘুরে, নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে, যা পুরো অঞ্চলে এক ছন্নছাড়া গেরিলা যুদ্ধের জন্ম দেবে। ইসরায়েল হয়তো ভাবছে, ইরান না থাকলে তারা নিরাপদ হবে, কিন্তু একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রের চেয়ে কয়েক ডজন অদৃশ্য আর মরণ কামড় দিতে প্রস্তুত সশস্ত্র গোষ্ঠীর মোকাবিলা করা হবে মোসাদ বা সিআইএর জন্য এক দুঃস্বপ্ন। ইরান রাষ্ট্র হিসেবে অন্তত আলোচনার টেবিলে বসে, কিন্তু তার সমর্থন পাওয়া প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো যখন অভিভাবকহীন হয়ে পড়বে, তখন তাদের ঠেকানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
নিওরিয়ালিজম বা নব্য-বাস্তববাদের আলোকে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্য বজায় থাকাই হলো শান্তির প্রধান শর্ত। ইরানের পতন হলে মধ্যপ্রাচ্য একমেরু ব্যবস্থায় পরিণত হবে, যেখানে ইসরায়েলের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হবে। ফলে ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান চিরতরে স্তিমিত হয়ে যাবে এবং ইসরায়েল কোনো আন্তর্জাতিক রীতির তোয়াক্কা না করেই নিজের সম্প্রসারণবাদী নীতি বাস্তবায়ন করবে। এমনকি সিরিয়া বা জর্ডানের সার্বভৌমত্বও তখন হুমকির মুখে পড়তে পারে।
ইরানের পতন হলে ইরাকের অস্তিত্বও বিপন্ন হবে। ইরাকের রাজনীতি ও নিরাপত্তা ইরানের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। যদি তেহরান ধসে পড়ে, তাহলে বাগদাদে এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হবে, যা শিয়া-সুন্নি সংঘাতকে নতুন মাত্রা দেবে।
আছে অন্য এক বিপদও। ইরান দৃশ্যপট থেকে সরে গেলে সুন্নি বিশ্বের দুই প্রধান শক্তি সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে নতুন শীতল যুদ্ধ শুরু হতে পারে। এতকাল ইরান ছিল তাদের অভিন্ন প্রতিপক্ষ, যা একধরনের পরোক্ষ ঐক্য বজায় রাখত। সেই প্রতিপক্ষ না থাকলে আঞ্চলিক নেতৃত্বের নেশায় রিয়াদ আর আঙ্কারার দ্বৈরথ মধ্যপ্রাচ্যে ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও গভীর করতে পারে। যদিও তেহরান ও আঙ্কারা উভয়ের সঙ্গে সদ্ভাব তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে রিয়াদ। এবং তুরস্কও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা তেহরানের বর্তমান রেজিমের পতন চায় না।
এর পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতে পানির দরে তেলের বদলে সোনার দামে জ্বালানি কেনার যে পরিস্থিতি তৈরি হবে, তার ভয়াবহতা বর্ণনাতীত। হরমুজ প্রণালি হলো পৃথিবীর জ্বালানি প্রবাহের শ্বাসনালি। এই কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ প্রণালির ঠিক মুখের ওপর এবং এক পাশের নিয়ন্ত্রণ ইরানের। ফলে দেশটির ভাঙন বা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে যদি এই পথ যুদ্ধের কবলে পড়ে কিংবা মাইন বিছিয়ে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়, তবে তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে।
যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের জন্য এটি হবে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। কারণ, মার্কিন অর্থনীতিসহ পুরো বিশ্ব এক ভয়াবহ দীর্ঘমেয়াদি মন্দার মুখে পড়বে। তেলের দামের এই ঊর্ধ্বগতি চীন, ভারত ও জাপানের মতো বড় আমদানিকারক দেশগুলোর শিল্প উৎপাদনকে পঙ্গু করে দিতে পারে।
চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগ বা বিআরআই প্রকল্পের এক বিশাল অংশ ইরানের মধ্য দিয়ে যাওয়ার কথা। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের এক বিশাল অংশ স্থবির হয়ে পড়বে এবং বেইজিং তার জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বিকল্প খুঁজতে গিয়ে অন্য কোনো সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।
ইরানের ভেঙে পড়ার ক্ষেত্রে আরও একটি ভয়ংকর প্রসঙ্গ আছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং তা দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কয়েক শ বিজ্ঞানী ও সুরক্ষিত স্থাপনার এক জটিল নেটওয়ার্ক। রাষ্ট্র ভেঙে পড়লে এই প্রযুক্তি বা বিপজ্জনক তেজস্ক্রিয় পদার্থ কালোবাজারে ছড়িয়ে পড়া কিংবা কোনো উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর হাতে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি এক মহাবিপর্যয়।
এমনকি আইএসের মতো গোষ্ঠীগুলো এই বিশৃঙ্খলার সুযোগে পুনরায় সিরিয়া ও ইরাকের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে তাদের ‘খিলাফত’ পুনর্গঠনের সর্বাত্মক করতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম আমলে আমরা মধ্যপ্রাচ্যে যে অস্থিরতা দেখেছি, ইরানের পতন হলে সেই অস্থিরতা আক্ষরিক অর্থে আগুনে ঘি ঢালার মতো করে মধ্যপ্রাচ্যকে জ্বালিয়ে দিতে পারে। কারণ, ইরান শুধু একটি দেশ নয়, একটি প্রাচীন সভ্যতা, যার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার নাড়ির টান সংযুক্ত। তাই ইরানের ভেঙে পড়া মানে এই পুরো অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক দাবানল ছড়িয়ে পড়ার সমূহ শঙ্কা।
সবশেষে ধেয়ে আসবে এক মহাকাব্যিক মানবিক ট্র্যাজেডি। দ্য গার্ডিয়ানের রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানের ৯ কোটি মানুষের এক বিরাট অংশ যদি বাস্তুচ্যুত হয়, তাহলে সেই শরণার্থীর স্রোত সামাল দেওয়ার ক্ষমতা আর কারও থাকবে না। এই বিপুল জনস্রোত তুরস্ক হয়ে ইউরোপের দিকে ধাবিত হবে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে চরম রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ডানপন্থীদের উত্থান আরও ত্বরান্বিত করবে। নিওরিয়ালিজম বা নব্য-বাস্তববাদী সমাধান সূত্র বলছে, ধ্বংসের চেয়ে নিয়ন্ত্রণ বা ‘কনটেইনমেন্ট’ই হলো শ্রেষ্ঠ পথ। ইরানকে একদম নিশ্চিহ্ন না করে তাকে একটি নিয়ন্ত্রিত আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে টিকিয়ে রাখাই হবে বিশ্বনেতাদের জন্য সবচেয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। কারণ, আগুনের সঙ্গে খেলা করা হয়তো রোমাঞ্চকর, কিন্তু সেই আগুন যখন ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে পাড়াময় ছড়িয়ে পড়ে, তখন শুধু হাহাকার ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।
মধ্যপ্রাচ্যের স্থায়িত্বের স্বার্থে ইরানকে ধ্বংস নয়, বরং তাকে আন্তর্জাতিক নিয়ম মানতে বাধ্য করাই হবে প্রকৃত বুদ্ধিমত্তার কাজ। একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ছাড়া কোনো অঞ্চলে শান্তি আসে না, বরং এক ভয়ংকর অরাজকতা জন্ম নেয়। তাই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যে নতুন মধ্যপ্রাচ্য জন্ম নেবে, তা আমাদের পরিচিত পৃথিবীর চেয়ে অনেক বেশি হিংস্র, ধর্মীয় উন্মাদনাপূর্ণ আর অনিয়ন্ত্রিত হতে পারে। যুদ্ধের দামামা বাজানো যতটা সহজ, সেই যুদ্ধোত্তর ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে সভ্যতা গড়া ততটাই কঠিন।

সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে, র্যাব সদস্যদের ওপর হামলা করেছে একদল দুর্বৃত্ত। তবে সবচেয়ে দুঃখজনক খবর হলো, এই হামলায় নিহত হয়েছেন র্যাব কর্মকর্তা মো. মোতালেব হোসেন। র্যাবের আরও তিন সদস্য এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন। ১৯ জানুয়ারি বিকেলে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে অস্ত্র উদ্ধার...
২ ঘণ্টা আগে
বিশ্বের শেষ প্রান্তের একটি অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড। ২১ লাখ ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই অঞ্চল বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপ। আয়তনের হিসাবে দ্বীপটি বাংলাদেশের চেয়ে সাড়ে ১৪ গুণ বড়। তবে জনসংখ্যা ৫৬ হাজারের কিছু বেশি। তাদের সিংহভাগই মৎস্যজীবী। অঞ্চলটির ৮০ শতাংশ এলাকাই মানববসতিশূন্য।
২ ঘণ্টা আগে
ভেনেজুয়েলার সম্প্রতিকালের রাজনৈতিক সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ওয়াশিংটনের কৌশলগত অবস্থানে একটি বিস্তৃত রূপান্তরের ইঙ্গিত বহন করে। এই হস্তক্ষেপ শুধু আঞ্চলিক সংকটে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং তা বৈশ্বিক ক্ষমতাকাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের...
৩ ঘণ্টা আগে
সভ্যতার ইতিহাস তো আসলে অসন্তোষেরই ইতিহাস। সন্তোষ দেখা দিলে সভ্যতা এগোত না। কিন্তু ওই অসন্তোষটা শুধু ব্যক্তিগত তো নয়ই, প্রধানতও ব্যক্তিগত নয়; হয়ে পড়েছে সমষ্টিগত এবং যখন সে সমষ্টিগত হয়েছে, তখনই ঘটেছে উত্তরণ, তার আগে নয়। সমষ্টির আঘাতে এবং সমষ্টির স্বার্থেই পুরোনো ব্যবস্থাটা ভেঙে পড়েছে।
১ দিন আগে