Ajker Patrika

শিশুদের নিরাপত্তাহীনতা

স্বপ্না রেজা
আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭: ৪১
শিশুদের নিরাপত্তাহীনতা

কয়েক দিন আগে কড়াইল বস্তিতে কাজের সুবাদে যেতে হয়েছিল। এলাকার সমস্যা কী, প্রশ্ন করতেই ওখানকার নারী বাসিন্দারা জানালেন, প্রতিদিন মাইকিং হয় বাচ্চা হারানোর সংবাদ প্রচারে। প্রচুর বাচ্চা নিখোঁজ হচ্ছে। আগে এমন ছিল না, ইদানীং বেড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কে থাকেন তাঁদের সন্তানদের নিয়ে। নিখোঁজ হওয়ার কারণ কী, জানতে চাইলে সঠিক জবাব পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ তাঁরা তা জানেন না। অবস্থার ভয়াবহতা বোঝাতে একজন স্থানীয় নারী হারিয়ে যাওয়া এক কন্যা শিশুর ঘটনা বললেন। শিশুর বয়স নয় বছর। তার মা বাসাবাড়ির কাজ থেকে ফিরে দেখেন ঘরে মেয়ে নেই। চারদিকে খোঁজাখুঁজি করেও মেয়েকে পাননি। রাতে মাইকিং করা হয়, পরের দিনও করা হয়। কিন্ত মেয়েকে পাওয়া যায় না। থানায় গিয়ে জিডি করেন। জিডি করতেও ঝামেলা ও সময় ক্ষেপণ হয় অনেক। নানা রকম প্রশ্ন করা হয়, যার উত্তর বিপদে পড়ে অনেকে দিতে পারেন, অনেকে দিতে পারেন না।

চার দিন পর মেয়ে বস্তিতে ফিরে আসে একা একা। বলতে পারে না কোথায় ছিল, কীভাবে ছিল, কীভাবে হারিয়ে গেল। শুধু একটা ঘরের বর্ণনা দেয়, মাথার চুল বাঁধার ফিতা, ক্লিপ, লিপস্টিক ছড়িয়ে থাকতে দেখেছে সে এবং এই ঘরটিতে তাকে রাখা হয়েছে। সঙ্গে আরও চার-পাঁচজন মেয়ে ছিল। শিশুটির সঙ্গে কেমন আচরণ করা হয়েছে, তা সে মুখ দিয়ে বলতে পারে না। তবে চোখে তার ভয় ছিল। যে ভাষায় অনেক নৃশংসতা বোঝা যায়। ঘরে ফেরার পরই সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। জানা যায়, সে ধর্ষণের শিকার।

যেহেতু নিখোঁজ হওয়ায় থানায় জিডি করা হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তাকে যে অবস্থায় পাওয়া গেছে সেই বিষয়টি থানাকে অবহিত করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, ‘গরিবের মাইয়া লইয়া কার অস্থির হইবার তাড়া আছে, না থাহে? থানা, পুলিশ তো যাগো ট্যাকা আছে, ক্ষমতা আছে, তাগোর। কত দিন বস্তি থাইক্যা পোলাপান চুরি হইতাছে, কী হইতাছে তাগোর লইয়া, হেই খবর কারোর কাছে আছে? নাই!’

সম্প্রতি শিশু নিখোঁজ ও হত্যার সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে জাতীয় প্রচারমাধ্যমগুলোতে। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও শিশুরা নিখোঁজ হচ্ছে, হত্যা ও নৃশংসতার শিকার হচ্ছে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে জানা যায় যে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী গত তিন বছর সাত মাসে ৭২ হাজার ৪৮৯ জন শিশুর নিখোঁজের ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। পুলিশ দাবি করেছে, নিখোঁজ শিশুদের ৯০ শতাংশের বেশি উদ্ধার হয়েছে। তবে তাদের কতজনকে জীবিত এবং কতজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেই তথ্য আলাদাভাবে করা নেই পুলিশ সদর দপ্তরে।

অপর দিকে বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলেছে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে সারা দেশে ২৫৪ জন শিশু খুন হয়েছে। তাদের মধ্যে নিখোঁজের পর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে ৩৬ শিশুর। ধর্ষণের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত অসংখ্য শিশু। আড়াই বছরের শিশুও এমন পাশবিকতার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। শুধু যে নারী শিশুরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে তা নয়, পুরুষ শিশুরাও প্রতিনিয়ত ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, বিশেষ করে মাদ্রাসাগুলোতে। মাদ্রাসার শিক্ষক ও সিনিয়র শিক্ষার্থীদের দ্বারা শিশু শিক্ষার্থীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে প্রায় প্রতিদিনই। অত্যন্ত উদ্বেগজনক এই যে মাদ্রাসায় ছোট-বড় শিক্ষার্থীদের ধর্ষণের শিকার হওয়া প্রসঙ্গে ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে কখনোই কঠোর অবস্থান গ্রহণ করার কথা বলতে শোনা যায়নি। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন অনৈতিক, অশালীন কাজে লিপ্ত হওয়া অপরাধীদের কঠোর শাস্তি হোক, এমন কোনো আহ্বান কখনো তারা করেছে বলে মনে পড়ে না। মাদ্রাসা মানেই যেন যৌন নিপীড়নের আস্তানা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধর্মীয় লেবাসে গড়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখন এক আতঙ্কের নাম। অনৈতিক কাজে লিপ্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ধর্মান্ধরা তেমনভাবে সোচ্চার হয়নি। তাদের নীরবতা যেন এহেন কাজে আরও বেশি সমর্থন দিয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, যে রাজনৈতিক চেতনা বাংলাদেশে সংস্কার এনে একটি নিরপেক্ষ, নিরাপদযোগ্য বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছিল, তারা যেন কোনোভাবেই কাউকেই নিরাপদ করতে পারছে না। বিশেষ করে শিশু ও নারীরা বেশি বিপজ্জনক অবস্থায় ও ঝুঁকিতে রয়েছে। দেশে কোনো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আর্থসামাজিক ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হলে, দুঃশাসন চললে তার জন্য বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারী ও শিশুরা।

শিশুরা নিরাপদ অবস্থানে নেই, এটা অত্যন্ত পরিষ্কার। প্রতিদিনকার পত্রিকা ও সোশ্যাল মিডিয়া সেই কথা বলছে, সেই খবর ছাপাচ্ছে, যদিও সরকারের সংশ্লিষ্টদের এই বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। যে হারে শিশু নির্যাতন হচ্ছে, নিখোঁজ হচ্ছে, সেই হারে কিন্তু প্রতিরোধ ও প্রতিকারে তৎপরতা দেখা যায় না। ফলে এই বিষয়ে তাদের মনোযোগ দেওয়ার তাড়া নেই বলেই অনেকে মনে করছে। ইদানীং একটা ঘটনা বেশ আলোড়ন তুলেছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকার ১৩ বছরের সন্তান অপ্রতিমকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। যতটুকু জানা গেছে যে এখনো পর্যন্ত তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ বলছে ও দাবি করছে, অপ্রতিমের আইফোনই তাকে হত্যার মূল কারণ ছিল। আর অপ্রতিমকে হত্যা করেছে তারই পরিচিতজন, যাদের সঙ্গে তার সখ্য ও ভালো রকম মেলামেশা, ওঠাবসা ছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই ধরনের বেশ কিছু ছবি অপ্রতিমকে নিয়ে এবং তার হত্যার বিষয়ে অনেক সংশয় ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

যাহোক, অপ্রতিমকে আইফোনের জন্য হত্যা করা হয়েছে, এমন অনুমান, ধারণা বা স্বীকারোক্তি নতুন কিছু নয়। বাসা থেকে আইফোন নিয়ে বের হয়েছে বন্ধুদের নিয়ে ছবি তুলবে বলে, তারপর আর তার খোঁজ নেই। সুতরাং এমন পরিস্থিতিতে ধারণা করা পানির মতো সহজ যে তাকে গুম বা হত্যা করা হয়েছে আইফোন ছিনতাইয়ের জন্য। এটা একটা খুব সাধারণ প্রচলিত ধারণা। যেহেতু দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে সাধারণ জনগণ মনে করছে এবং কোনোভাবেই নিরাপদ বোধ করছে না, সেহেতু ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণ, ধর্ষণ, হত্যার মতো ঘটনাগুলো তাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয় বিধায় তারা উল্লেখিত ধারণার সঙ্গে একমত পোষণ করতে অনেকটা বাধ্য হয়। কিন্তু উল্লেখিত অপরাধগুলোর নেপথ্যের কারণ কী, কেন অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে, অপরাধ প্রতিকার করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ, কৌশলইবা কী, এই বিষয়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের আশানুরূপ ও সন্তোষজনক কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায় না। দেশে যেভাবে শিশু নির্যাতন, শিশু নিখোঁজ তথা শিশু নিধন শুরু হয়েছে, তা কিন্তু এই দেশের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য যথেষ্ট হুমকিস্বরূপ।

অপ্রতিমকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক ধরনের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পেয়েছে। একজন ফুটফুটে শিশুকে এভাবে হত্যা করার আঘাত কমবেশি সবার মনে লেগেছে। তারা দুঃখ প্রকাশ করেছে, অপরাধীদের কঠিন শাস্তি চেয়েছে। আবার একটা অংশ দোষারোপের সংস্কৃতিতে মেতেছে। গুড প্যারেন্টিংয়ের অভাবকে সামনে এনেছে। অপ্রতিম কী করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের সঙ্গে চলাফেরা করে একটা শিক্ষিত পরিবারের সন্তান হয়ে ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার একটা গ্রুপ সোশ্যাল মিডিয়ায় অপ্রতিমের মায়ের চব্বিশের জুলাইয়ের ভূমিকা নিয়ে কটাক্ষ করছে, সমালোচনা করছে, ঘটনাটিকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনায় আনার চেষ্টা করছে। ফলে হত্যাকাণ্ড যে একটি জঘন্য অপরাধ—বিষয়টি সেখানে না দাঁড়িয়ে থেকে বিভিন্ন পথে হাঁটতে শুরু করে। তদন্তের অসংখ্য বাঁক সৃষ্টি হয়, হত্যাকাণ্ডের মতো একটা ভয়াবহ অপরাধ বিচারের দৃষ্টিতে তখন দুর্বল হতে সুযোগ পায়।

আমাদের দেশে কিশোর গ্যাং তৈরি হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণটি হচ্ছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং এই অভাব প্রকট। যারা দেশের উন্নয়নের কথা বলে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে দেশ শাসনের স্বপ্ন দেখে, তারা কিন্তু পরবর্তী অবস্থায় সেই জায়গায় আর থাকে না। রাজনীতিকে পুঁজি করে তারা মূলত নিজেদের আখের গোছায়।

স্বপ্না রেজা, কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত