
বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীর অর্থনীতি ও জ্ঞানভিত্তিক সামাজিক কাঠামোর দ্রুতগামী ট্রেন অনেকটাই পরিচালিত হচ্ছে সর্বাধুনিক গবেষণা, উদ্ভাবন, বায়োমেডিকেল, জিনোমিক্স কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো প্রযুক্তিনির্ভর বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে। পৃথিবীর প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আজ কেবল ডিগ্রি প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং টিকে থাকার লড়াইয়ে যোগ্য নেতৃত্ব তৈরির বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার দুর্দান্ত প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। আন্তর্জাতিক শিক্ষাঙ্গনে বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয় মূল্যায়নে যে বিষয়গুলো সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে—গবেষণার মান, কর্মনির্ভর শিক্ষা, একাডেমিক সততা, আন্তর্জাতিক সংযোগ, সামাজিক দায়বদ্ধতা।
কিন্তু স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, সেই মানদণ্ডে আমাদের দেশের ক্যাম্পাসগুলো আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে? বিশেষ করে মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা একজন সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থী আমাদের ক্যাম্পাসে যে শিক্ষা পাচ্ছে, তা কি তাকে এই বৈশ্বিক লড়াইয়ে টিকে থাকার মতো প্রস্তুত করছে? বৈশ্বিক একাডেমিক কাঠামোর সাপেক্ষে এই তুলনা টানলেই আমাদের দেশের ক্যাম্পাসের বাস্তবতা একধরনের গভীর সংকট, বৈপরীত্য ও সংস্কারের জরুরি প্রয়োজন চোখে পড়ে।
বৈশ্বিক মানদণ্ড: মেধার অগ্রাধিকার ও রেজুমে ভ্যালু উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিত্ব মূলত শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও কল্যাণমূলক স্বার্থকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়; দলীয় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কোনো অবস্থান নেই। এখানে একজন শিক্ষার্থীর মূল সময় কাটে গবেষণা প্রকাশনা, প্রেজেন্টেশন স্কিল আর নিজেকে বিশ্বমানের কর্মক্ষেত্র বা একাডেমিয়ার জন্য গড়ে তোলার প্রস্তুতিতে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃতি হলো শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক স্টুডেন্ট ইউনিয়ন, যেখানে প্রতিনিধিত্ব পাওয়ার মাপকাঠি হলো একাডেমিক দায়িত্বশীলতা, প্রমাণিত নেতৃত্ব আর শিক্ষার্থীকল্যাণমুখী কাজ; দলীয় পরিচয় নয়। এই ধরনের নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা একজন শিক্ষার্থীর যোগাযোগ, সংগঠন আর সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তুলে ধরে, যা পরবর্তী সময়ে তার পেশাগত সিভিতে সত্যিকারের মূল্য যোগ করে।
আমাদের বাস্তবতা: লেজুড়বৃত্তি ও মধ্যবিত্তের সংকট এর বিপরীত চিত্র ও বাস্তবতা দেখা যায় আমাদের অধিকাংশ জাতীয় ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। দীর্ঘদিনের ক্যাম্পাস রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রে দলীয় লেজুড়বৃত্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে নীতি-আদর্শ ও গবেষণা চর্চার চেয়ে দলীয় অ্যাজেন্ডা
বাস্তবায়নই শিক্ষার্থীদের জন্য মুখ্য হয়ে ওঠে। বৈশ্বিক মানদণ্ডে যেখানে যোগ্যতার মূল ভিত্তি একাডেমিক মেধা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা, সেখানে আমাদের ক্যাম্পাসে প্রাধান্য পায় দলীয় আনুগত্য ও ক্ষমতার দাপট। ফলাফল হিসেবে হলের বৈধ সিটের অধিকার, ডাইনিংয়ের খাবারের মান কিংবা গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দের মতো একেবারে মৌলিক বিষয়গুলোও রাজনৈতিক সমীকরণের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। আর সবচেয়ে বড় উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ ধরনের রাজনৈতিক পদ-পদবি আন্তর্জাতিক একাডেমিক বা পেশাগত মূল্যায়নে সাধারণত গবেষণা, নেতৃত্ব বা পেশাগত দক্ষতার প্রমাণ হিসেবে মূল্যায়িত হয় না।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশই আসে মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে। তাদের জন্য নির্ধারিত সময়ে পড়াশোনা শেষ করে কর্মসংস্থানে প্রবেশ করা কেবল কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং পুরো পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং আবেগ এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। সেশনজট, ক্যাম্পাসের অস্থিতিশীলতা কিংবা কৃত্রিম সংকটের কারণে শিক্ষাজীবন পিছিয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই মধ্যবিত্ত মেধাবীরাই। এখান থেকেই অনেকে হতাশায় ভুগতে শুরু করে এবং কর্মসংস্থানের জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার পথ বেছে নেয়, যা দীর্ঘ মেয়াদে মেধা ধরে রাখার প্রশ্নটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বাংলাদেশের তরুণদের মেধা, সহনশীলতা ও গ্রহণক্ষমতা সত্যিকার অর্থেই বিশ্বমানের। বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ রেখে চলেছে। এর উদাহরণ অসংখ্য। সমস্যাটা তাদের মেধায় নয়, সমস্যাটা মূলত আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ঘাটতিতে; একটি সুস্থ ও পেশাদার পরিবেশের অভাবে তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা অনেকাংশেই বিকশিত হতে পারছে না।
সংস্কারের সম্ভাবনা: সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার আরও মানসম্মত, আধুনিক ও বাস্তবমুখী করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও এ বিষয়ে সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপট উচ্চশিক্ষার কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। এক্ষেত্রে আমার প্রস্তাবনা এ রকম—
১. মেধাভিত্তিক ও নিরাপদ ক্যাম্পাস বাস্তবায়নে শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা, জবরদস্তি ও অনিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক প্রভাব থেকে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ রেখে সুস্থ, শান্তিপূর্ণ ও মেধাভিত্তিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
২. বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল সনদভিত্তিক কেন্দ্র হিসেবে না রেখে উচ্চশিক্ষায় গবেষণা বাজেট ও শিল্পমুখী শিক্ষাক্রমে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক কাঠামো ঠিক হলেও বর্তমান ‘স্টেট অব আর্ট’ প্রযুক্তি, যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বাস্তবমুখী দক্ষতা তৈরির মতো বিনিয়োগ ছাড়া শিক্ষার্থীরা সত্যিকারের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দাঁড়াতে পারবে না। তাই এটা সংস্কারের পরের ধাপ হিসেবে অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
৩. বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রতিনিধিত্বের মাপকাঠি বদলানো; শিক্ষার্থী প্রতিনিধি নির্বাচনে দাঁড়ানোর যোগ্যতা হিসেবে ন্যূনতম একাডেমিক পারফরম্যান্স আর সহশিক্ষা কার্যক্রমে (ডিবেটিং ক্লাব, রিসার্চ সোসাইটি, স্টার্টআপ ইনকিউবেটর) সম্পৃক্ততা যোগ করা যেতে পারে। সেই সঙ্গে হল ও ডাইনিং ব্যবস্থাপনা আর সিট বরাদ্দ থেকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পূর্ণভাবে মুক্ত রেখে প্রশাসনিক, স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক প্রক্রিয়ায় হলে এটা সাধারণ শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে বেশি পার্থক্য গড়ে দেবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞান ও গবেষণার দক্ষতা যদি বাস্তব কর্মক্ষেত্র, শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা বা উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তাহলে সেই শিক্ষার পূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য কীভাবে পাওয়া যাবে? শিক্ষাকে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য, একটি ডিগ্রি বা চাকরি পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত মূল্যকে ছোট করে দেখা হয়। একটি দেশের জন্য শিক্ষা হলো দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ, যার মাধ্যমে সত্যিকারের মানবসম্পদ, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ভিত্তি তৈরি হয় এবং সমাজের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সক্ষমতা গড়ে ওঠে। এতে শিক্ষার্থীরা শুধু চাকরির জন্য প্রস্তুত হবে না, বরং নতুন কাজ ও উদ্ভাবনের সুযোগও তৈরি করতে পারবে।
একই সঙ্গে দেশে একটি কার্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ তৈরি করা গেলে শিক্ষিত তরুণদের অর্জিত মেধা ও দক্ষতা দেশেই কাজে লাগানোর সুযোগ বাড়বে। তবে প্রকৃত পরিবর্তন আসবে তখনই, যখন এই সদিচ্ছা রূপ নেবে সুনির্দিষ্ট নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে; বিশেষত ছাত্রসংগঠনগুলোকে দলীয় লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত করে সত্যিকারের মেধাভিত্তিক ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক কাঠামোয় রূপান্তরের মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং শিক্ষার্থীসমাজ—এই তিন পক্ষ মিলে যদি আকাঙ্ক্ষা আর বাস্তবায়নের মধ্যে দূরত্ব ঘোচাতে সম্মিলিতভাবে কাজ করে, তবেই গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই মুহূর্তটি প্রকৃত অর্থে তরুণদের জন্য একটি টেকসই ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনাবিন্দু হয়ে উঠতে পারে।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক শিক্ষাঙ্গন গড়ে তোলা, যেখানে একজন শিক্ষার্থীর একমাত্র পরিচয় নির্ধারিত হবে তার মেধা, গবেষণা ও উদ্ভাবনী শক্তিতে; দলীয় পরিচয়ে নয়। এখন প্রয়োজন সদিচ্ছাকে দৃঢ় ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপে রূপান্তরিত করা। পাশাপাশি আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—মেধা তৈরি করা যেমন দেশের দায়িত্ব, সেই মেধাকে কাজে লাগিয়ে দেশে ধরে রাখার পরিবেশ তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ শুধু তার প্রাকৃতিক সম্পদ বা অবকাঠামো নয়; তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো জ্ঞান, দক্ষতা ও সম্ভাবনাময় মানুষ।

স্বাধীনতার এত বছর পরেও আমরা একটা যথাযথ শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে পারিনি। এ নিয়ে শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের আক্ষেপের শেষ নেই। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, তখন সেই দলের চিন্তাভাবনা তারা শিক্ষানীতিতে প্রয়োগ করে থাকে। ফলে শিক্ষার্থীরা বিশেষ করে দেশের ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে।
২ ঘণ্টা আগে
মো. ফয়সাল। বয়স মাত্র ২৬ বছর। তরতাজা এক যুবক। তাঁকে চোর সন্দেহে দিনের আলোয় নির্মমভাবে নির্যাতন করে পিটিয়ে হত্যা করেছে একদল মানুষ। ফয়সালের বাবার নাম বাদশাহ মিয়া। বাদশাহর সন্তান হয়েও ফয়সাল ছিলেন বাংলাদেশের একজন সাধারণ দরিদ্র দিনমজুর ও নিরীহ নাগরিক।
২ ঘণ্টা আগে
একজন নারীর নিরাপদে বেঁচে থাকা আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক বা দুই দশক আগে বলা হতো নারীরা ঘরের বাইরে অনিরাপদ, ঘরে তারা সুরক্ষিত। কিন্তু বর্তমান সময়ের পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা আমাদের এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
২ ঘণ্টা আগে
২০ সেপ্টেম্বর রাতে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনটি যখন জারি হলো, তখন ঢাকার পাম্পগুলোতে গাড়ির লম্বা সারি হচ্ছিল। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল লিটারে ১১৫ থেকে ১৩৫, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। চার পণ্যেই এক রাতে ২০ টাকা বৃদ্ধি।
১ দিন আগে