বাংলাদেশে মাছ ধরতে জেলেরা এখন প্রাচীন পদ্ধতি আর ব্যবহার করছেন না। প্রায়ই দেখা যাচ্ছে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকারের খবর। জেলেরা এক ধরনের অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড বা গ্যাস ট্যাবলেট দিয়ে মাছ শিকার করছেন। এই ট্যাবলেট অত্যন্ত ক্ষতিকর। কেননা, এটি পানিতে ফেললে জলে থাকা সব মাছ তো মারা যায়ই, সঙ্গে মাটির নিচের মাছগুলোও মারা যায়। মৃত মাছ পানিতে ভেসে ওঠে। পরে তা জেলেরা ধরে বিক্রি করেন। এইভাবে জেলেরা মাছ শিকার করছেন প্রায়ই। কেননা, এতে সময় অনেক কম লাগছে। পরিশ্রমও কম হচ্ছে। ধরা পড়ছে সব মাছ। কিন্তু একটা বিষয় তাঁরা ভাবছেন না যে, এই পদ্ধতিতে মাছ ধরা হলে মাছসহ জলাশয়ের সব জীব-অণুজীব মারা যায়। এতে করে জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য পুরোটাই ধ্বংস হয়ে যায়।
অসাধু ব্যক্তিরা দ্রুত ও সহজে মাছ ধরার জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের মাধ্যমে মাছ ধরছেন। এমিল নাইট্রেট এমন এক ধরনের মাছ ধরার বিষ। এটি হলুদ রঙের তরল পদার্থ। এটি ব্যবহার করলে খুব দ্রুত প্রচুর মাছ ধরা যায়। অল্প সময়ে অধিক মাছ ধরা যায় বিধায় অর্থনৈতিকভাবে লাভবানও হওয়া যায়। এই বিষটি কখনো পানিতে মিশিয়ে দিয়ে মাছ মারা হয়, আবার কখনো মাছের খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে পানিতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এমিল নাইট্রেটের কারণে পানিতে অক্সিজেন খুব তাড়াতাড়ি কমে যায়। এতে মাছেরা শ্বাসকষ্টের কারণে পানির উপরিভাগে আসে। সে সময় সহজেই মাছ ধরা যায়। কিন্তু এটি ব্যবহারের কারণে মাছ ছাড়া জলজ অন্যান্য প্রাণীও মারা পড়ে। যেমন কচ্ছপ, কাঁকড়া, শামুক ইত্যাদি। এটি মাটির তলদেশে জমা হয়ে মাছের গুণাগুণও নষ্ট করে দেয়। এমিল নাইট্রেট বিষ প্রয়োগে ধরা মাছ খেলে মানুষেরও নানা সমস্যা হয়। এটি মানবদেহে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে। এর ফলে বমি, পেট ব্যথা, মাথা ঘোরানো ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এই ধরনের মাছ বেশি খেলে কিডনি ও লিভারের ক্ষতি হতে পারে। গর্ভবতী নারীরা এই ধরনের মাছ খেলে ভ্রূণের বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। এ ছাড়া ত্রুটি নিয়ে বাচ্চা জন্ম হতে পারে। অ্যালার্জি ও শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণগুলোও দেখা যায়।
সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে বিষ দিয়ে মৎস্য শিকার সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যকে ভয়াবহ হুমকির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। একশ্রেণির অসাধু জেলের
কাজ এসব। তাঁরা সুন্দরবনের খালে জোয়ারের আগে চিড়া, ভাত বা অন্য কিছুর সঙ্গে কীটনাশক মিশিয়ে ছিটিয়ে দেন। এতে করে অভয়ারণ্যের খাল থেকে অল্প সময়ে অনেক মাছ ধরা যায়। ফসলের পোকা দমনে যেসব কীটনাশক ব্যবহার করা হয়, তা দিয়েই এইসব মাছ ধরা হয়। সাধারণত ডায়মগ্রো, ফাইটার, রিপকর্ড ও পেসিকল নামক কীটনাশক দিয়ে মাছ ধরা হয়। এসব বিষ প্রয়োগ করা হলে খালের ছোট-বড় সব ধরনের মাছ ও পোনা মারা যায়। এসব বিষমিশ্রিত পানি গভীর সমুদ্রে গিয়ে সেখানকার প্রাণীরও ক্ষতি করে। এই বিষ তাৎক্ষণিকভাবে শুধু মাছই মেরে ফেলে না, এটি দীর্ঘদিন খালে বা সমুদ্রে থাকার ফলে জলজ নানা প্রাণীও ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এতে করে মাছের প্রজননক্ষমতা কমে যায়। মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার সঙ্গে এর ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য প্রাণীরও খাদ্য-সংকট দেখা দেয়। তা ছাড়া বিষযুক্ত মাছ খেয়ে পাখি ও বড় মাছেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যে সুন্দরবন আমাদের বাঁচায় তাকে বাঁচাতে আমাদের প্রত্যেকেরই এগিয়ে আসা উচিত। সুন্দরবনের খালগুলোতে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার যে মাত্রায় বেড়েছে তাতে সহজেই অনুমেয়—প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবে সুন্দরবন।
সুন্দরবনসহ সারা দেশে বিভিন্ন জলাশয়ে বিষ দিয়ে মাছ ধরা অব্যাহত রয়েছে। এসব জায়গায় প্যারাথিয়ন, এন্ডোসালফান, ডিডিটি ইত্যাদি যেমন ব্যবহার করা হয়, তেমনি ইউরিয়া, সায়ানায়েড বা অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানও ব্যবহার করা হয়। এসব বিষ প্রয়োগে জলাশয়ের প্রায় সব মাছেরই মৃত্যু ঘটে। এতে করে মাছের প্রজনন চক্র ভেঙে যায়। কিছু রাসায়নিক পদার্থে পানিতে বিদ্যমান অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। এর ফলে শৈবাল, প্ল্যাংকটন, ব্যাঙ, পোকামাকড়, কচ্ছপসহ জলাশয়ে নির্ভরশীল সব জীব মারা যায়। এতে ভেঙে পড়ে জীববৈচিত্র্য। ধ্বংস হয়ে যায় জলাশয়ের বাস্তুতন্ত্র। মানুষেরও ক্ষতি হয়—ক্যানসারসহ যকৃৎ ও কিডনি রোগ বেড়ে যায়। বিষক্রিয়ায় মানুষের মৃত্যুও হতে পারে।
সাময়িক সময়ের জন্য জেলেরা লাভবান হলেও পরবর্তী সময়ে মৎস্য উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে বিপদে পড়ে যান তাঁরা। সুন্দরবন ছাড়াও মেঘনা নদী, ফেনী নদী, যমুনা নদী, ধলাই নদী, মাতামুহুরী নদী প্রভৃতিতে বিষ প্রয়োগে মাছ ধরার ঘটনা ঘটছে। নদী-খাল ছাড়াও গ্রামের পুকুরগুলোতেও বিষ প্রয়োগে মাছ মারার ঘটনা দেখা গেছে। এ ব্যাপারে আমাদের সবাইকে সতর্ক হতে হবে। জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সরকারকেও নজরদারি বাড়াতে হবে যেন এ ধরনের বিষ সহজলভ্য না হয়। যাঁরা বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরবেন তাঁদেরও আইনের আওতায় নিয়ে আসা দরকার।
লেখক:- পরিবেশবিষয়ক লেখক

দেশের দুর্যোগের ইতিহাস দীর্ঘ। বন্যা, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, ঘূর্ণিঝড় কিংবা জলাবদ্ধতা—প্রায় প্রতি বছরই দেশের কোনো না কোনো অঞ্চলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়। এসব পরিস্থিতিতে মানুষের জীবন রক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা...
১১ ঘণ্টা আগে
নওগাঁর মান্দা উপজেলার প্রসাদপুর ইউনিয়নের দ্বারিয়াপুর এলাকার বন বিভাগের অনুমোদন ছাড়াই তিনটি সরকারি রাস্তার ২৩৭টি ইউক্যালিপটাস ও আমগাছ কেটে বিক্রির প্রক্রিয়া চলছে। এর মধ্যে ৫০টি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। ‘ফ্যামিলি ওয়েল ফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন দ্বারিয়াপুর (এফডব্লিউএডি)’ নামের একটি বেসরকারি সংস্থার...
১২ ঘণ্টা আগে
আমরা ছোটবেলা থেকে জেনে এসেছি, বিশ্বের তিন ভাগ জল, আর এক ভাগ স্থল। সেই এক ভাগ স্থলের বড় অংশ আবার মানবসভ্যতার আদিকাল থেকে নানা দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জর্জরিত। সেসব দ্বন্দ্ব-সংঘাত যে কেবল স্থলের ওপরের স্বার্থ নিয়ে, তা কিন্তু নয়। বহু ক্ষেত্রে জলভাগও দ্বন্দ্ব-সংঘাতের জন্ম দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যও এর ব্যতিক্রম নয়।
১২ ঘণ্টা আগে
মিয়ানমারের বর্তমান সংকটকে কেবল গৃহযুদ্ধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করলে এর প্রকৃত চিত্র ধরা পড়ে না। এটি বিশ্বের সবচেয়ে জটিল, দীর্ঘস্থায়ী এবং বহুমাত্রিক সংঘাতগুলোর একটি, যেখানে একই সময়ে সামরিক জান্তা, গণতন্ত্রপন্থী প্রতিরোধ বাহিনী, বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন, আন্তর্জাতিক শক্তি, অস্ত্র ব্যবসায়ী...
১২ ঘণ্টা আগে