Ajker Patrika

বাগ্‌যুদ্ধে সব অভিযোগই কি সত্যের অপলাপ

‘ধর্ম যাবে’, ‘দেশ যাবে’ ‘ভারতের গোলামি’—এসব অভিযোগ বাংলাদেশে ভোটের রাজনীতিতে অনেক পুরোনো। পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে অনেক অসত্য তথ্য বা অতিশয়োক্তি থাকলেও সবকিছুই অসত্য নয়। বরং অনেক সত্য এড়িয়ে যাওয়া হয়।

আজাদুর রহমান চন্দন
বাগ্‌যুদ্ধে সব অভিযোগই কি সত্যের অপলাপ
প্রতীকী ছবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণের বাকি আর মাত্র ১৭ দিন। এরই মধ্যে জমে উঠেছে প্রচারযুদ্ধ। আর এই প্রচারযুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় দিক হলো, প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও প্রার্থীদের মধ্যে বাগ্‌যুদ্ধ। বাগ্‌যুদ্ধে প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগ। পাল্টাপাল্টি অভিযোগ না বলে বরং পাল্টাপাল্টি আক্রমণ বলাই ভালো। কথার সেই আক্রমণ এতটাই শাণিত যে, মাঝেমধ্যেই তা মাত্রা-সীমা ছাড়িয়ে যায়। কথায় আছে, প্রেম ও যুদ্ধ নিয়মনীতির ধার ধারে না। এটাও তো ভোটযুদ্ধপূর্ব বাগ্‌যুদ্ধ! কাজেই এখানেই বা মাত্রা-সীমা, রীতিনীতির বালাই থাকার দরকার কী? এমন প্রশ্ন তুলতে পারেন কেউ কেউ। কিন্তু আন্তরাষ্ট্র যুদ্ধের ক্ষেত্রেও তো বিশ্বকে কিছু নিয়মনীতি আরোপ করতে হয়েছে জাতিসংঘ সনদের মাধ্যমে। সেই নিয়মনীতি লঙ্ঘনের কারণে কখনো কখনো যুদ্ধাপরাধের মামলা এবং তাতে শাস্তিও হয়ে থাকে। যদিও অতি ক্ষমতাধর কোনো কোনো রাষ্ট্রকে এসব নিয়ম মানা কিংবা শাস্তির তোয়াক্কা করতে দেখা যায় না।

কিছুদিন আগেই ভেনেজুয়েলায় বিমান হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে মার্কিন বাহিনী। খোদ যুক্তরাষ্ট্রসহ দেশে দেশে শান্তিকামী মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়লেও জাতিসংঘ নিশ্চুপ-নির্বিকার। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী গণহত্যা চালাচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্যমতেই, ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে নিহত গাজাবাসীর সংখ্যা ২৬ হাজার ছাড়িয়েছে, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহত হয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার মানুষ। গাজার ২৩ লাখ বাসিন্দার মধ্যে ১৯ লাখই বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছে। গাজায় সংঘাত শুরুর প্রায় দুই বছর পর প্রকাশিত জাতিসংঘের এক তদন্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। তদন্তটি করেছে অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে জাতিসংঘের গঠন করা একটি আন্তর্জাতিক স্বাধীন কমিশন। এতে জাতিগত নিধনের জন্য ইসরায়েলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের দায়ী করা হয়েছে। জাতিসংঘের এই তদন্ত কমিশনের প্রধান নাভি পিল্লাই গত সেপ্টেম্বরে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট ও প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হেরজগ গাজায় হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ ও উসকানি দিয়েছিলেন বলে তদন্তে দেখা গেছে। তাঁরা যেহেতু ইসরায়েল রাষ্ট্রের কর্মকর্তা, তাই বলা যায় এই জাতিগত নিধন ইসরায়েলই চালিয়েছে।

জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনেই কেবল ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় জাতিগত নিধন চালানোর অভিযোগ আনা হয়নি। এর আগে ২০২৩ সালে গাজায় জাতিগত নিধন চালানোর অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। এর পরিপ্রেক্ষিতে গাজায় গণহত্যা বন্ধ করার ব্যবস্থা নিতে ইসরায়েলের প্রতি নির্দেশ দেয় আইসিজে। কিন্তু এই নির্দেশ মানার কোনো ইচ্ছাই প্রকাশ করছে না ইসরায়েল। গাজায় গণহত্যার তদন্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতও (আইসিসি)। ওই তদন্তের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের করা আপিল খারিজ করার পর আইসিসির দুই বিচারকের ওপরই উল্টো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন প্রশাসন। গত ১৮ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বিবৃতিতে বলেন, মঙ্গোলিয়া ও জর্জিয়ার দুই বিচারক আইসিসিতে ইসরায়েলের আবেদনের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছিলেন। তাই তাঁদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। গাজায় গণহত্যার তদন্ত শুরু করায় আইসিসি ও আইসিজের বিচারকদের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কঠোর অবস্থান ‘মাইট ইজ রাইট’ তথা ‘জোর যার মুলুক তার’ নীতিরই বহিঃপ্রকাশ। গাজা থেকে ভেনেজুয়েলা—সব ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র আইন প্রয়োগের ভাষা ব্যবহার করে শক্তি প্রয়োগের রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে।

আবার নজর দেওয়া যাক দেশের নির্বাচনী রাজনীতির হালচালের দিকে। ভোটের প্রচারের নামে কয়েক দিন ধরে দলগুলোর মধ্যে যে বাগ্‌যুদ্ধ চলছে, তাতে ধর্মের দোহাই দেওয়া থেকে শুরু করে দেশ বিক্রির অভিযোগও বাদ যাচ্ছে না। ভোটের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হওয়ার আগে থেকেই অভিযোগ শোনা যাচ্ছিল, ধর্মভিত্তিক একটি দল নাকি প্রচার করছে, তাদের ভোট দিলে বেহেশতের টিকিট পাওয়া যাবে। আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হওয়ার পর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান একাধিক সমাবেশে দেওয়া ভাষণে ধর্মভিত্তিক ওই দলটির মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার সমালোচনা করেন। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, বেহেশতের টিকিট দেওয়ার নাম করে একটি দল জনগণকে ঠকাচ্ছে। তারেক রহমান ২২ জানুয়ারি মৌলভীবাজারে এক নির্বাচনী জনসভায় বলেন, বেহেশতের টিকিট বিক্রি করছে একটি দল। তারা মানুষকে ভুল বুঝিয়ে গুনাহের কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, বেহেশত ও দোজখ দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ। এ ধরনের কথা বলে তারা শিরক করছে।

তারেক রহমানের ওই বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। ২৩ জানুয়ারি খুলনার ডুমুরিয়ায় এক নির্বাচনী সমাবেশে তিনি বলেন, ‘আমরা ধারণা করেছিলাম, উনি লন্ডনে গেছেন, পড়াশোনা করেছেন, কিছুটা পলিটিক্যাল ম্যাচিউরিটি হয়তো আছে। কিন্তু দেখি যে, উনি তো এখন বড় মুফতি হয়ে গেছেন। বিলেত থেকে এসে ফতোয়া দিচ্ছেন, কে মুসলমান আর কে কাফের। এটা বলার তাঁর কোনো অধিকার নেই।’ গোলাম পরওয়ার আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে দ্বীন কায়েমের নিয়মতান্ত্রিক জিহাদ হিসেবেও আখ্যা দেন। একই দিনে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে এক জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, একটি দল ভারতের সঙ্গে আঁতাত করে ক্ষমতায় আসতে চায়। বিএনপিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, তারা ভারতের সঙ্গে আপস করে দেশ শাসনের জন্য বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বিক্রি করে দিতে চায়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ওই দিন কক্সবাজারের চকরিয়ায় এক পথসভায় বলেছেন, ‘যারা ভারতের পক্ষের শক্তি ছিল তারা ভারতে পালিয়েছে। আরেকটি শক্তি বিদেশি শক্তির গোলামি করে, তারা বাংলাদেশে বিভিন্ন রকম বিভ্রান্তি করে রাজনীতি করছে। আমরা বাংলাদেশের শক্তি, বাংলাদেশের মানুষের পক্ষের শক্তি। আমাদের স্লোগান হচ্ছে, সবার আগে বাংলাদেশ।’ সালাহউদ্দিন আহমদ বিদেশি শক্তি কে বা কারা, তা উল্লেখ না করলেও আগের দিন ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কূটনীতিকেরা দলটির সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের কাজ শুরু করেছেন। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, তাদের হাতে কয়েকটি অডিও রেকর্ডিং এসেছে। এসব কথোপকথন বিশ্লেষণ করে জামায়াতের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঝুঁকে পড়ার বিষয়টি জানা গেছে। এর সূত্র ধরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত শনিবার বলেছেন, ‘পত্রিকায় একটি খবর বেরিয়েছে, ফরহাদ মজহার সাহেব একজন বিশিষ্ট দার্শনিক, তিনি বলতেছেন, জামায়াতের সঙ্গে আমেরিকার একটি গোপন আঁতাত হয়েছে। এই আঁতাত বাংলাদেশের জন্য মোটেও ভালো নয়। এটা বাংলাদেশের ক্ষতি করবে।’

‘ধর্ম যাবে’, ‘দেশ যাবে’ ‘ভারতের গোলামি’—এসব অভিযোগ বাংলাদেশে ভোটের রাজনীতিতে অনেক পুরোনো। পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে অনেক অসত্য তথ্য বা অতিশয়োক্তি থাকলেও সবকিছুই অসত্য নয়। বরং অনেক সত্য এড়িয়ে যাওয়া হয়। সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত ছাড়াই ‘বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বিক্রি করে’ দেওয়ার অভিযোগ করা হলেও বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনালসহ গভীর সমুদ্রের তেল-গ্যাসক্ষেত্র বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়া বা চেষ্টা করার বিষয়ে বড় দলগুলোকে কিছু বলতে শোনা যায় না। নব্বইয়ের দশকে বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশনে পাট খাত সংস্কার কর্মসূচির নামে দেশের পাটশিল্পকে সংকুচিত করা হয়েছিল। তখন বাম দলগুলো ছাড়া কেউ টুঁ-শব্দটিও করেনি। অথচ সে সময় যে কর্মসূচির আওতায় বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে অর্থ দিয়েছিল, পাটশিল্প বন্ধ করে দিতে সেই একই কর্মসূচির আওতায় ভারতকে অর্থ দেওয়া হয়েছিল তাদের পাটশিল্প সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের জন্য। তাতেও কিন্তু দেশের স্বার্থহানি হওয়ার কোনো অভিযোগ করা হয়নি বুর্জোয়া কিংবা ধর্মভিত্তিক কোনো দলের পক্ষ থেকে। কথায় কথায় যাদের মুখে ভারত-বিরোধিতার বুলি ফোটে, তারা কিন্তু তখন দেশের কোনো স্বার্থহানি দেখতে পায়নি।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তি না মেলার দায় কার, বাগেরহাটের ডিসি কি অপরাধ করেছেন

পোস্টারবিহীন নির্বাচনে প্রচারের ধরনে বদল

আজকের রাশিফল: প্রাক্তনের ছবিতে লাইক দেবেন না, গিন্নির হাতে আজ খুন্তি

আদানির সঙ্গে চুক্তি বিদ্যুতে দুর্নীতির বৃহত্তম প্রতীক

সাদ্দামের প্যারোল: বাগেরহাটের ডিসি ও মন্ত্রণালয়ের ভিন্ন কথা

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত