Ajker Patrika

জীবনযাত্রার ব্যয়ে নাভিশ্বাস, উত্তাল ইউরোপ

সম্পাদকীয়
জীবনযাত্রার ব্যয়ে নাভিশ্বাস, উত্তাল ইউরোপ

ইউরোপজুড়ে ক্ষোভ বাড়ছে। আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়া, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতিতে নাভিশ্বাস উঠছে মানুষের। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কার্যত থমকে আছে। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ও গ্রিসে ঋণ পরিশোধে সুদের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে স্কুল পুনর্গঠন, আবাসনে ভর্তুকি কিংবা খরায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মতো কাজে যে অর্থ ব্যয় করা হতো, তার বড় অংশই চলে যাচ্ছে ঋণদাতাদের পাওনা মেটাতে।

জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির এই সংকট ইতিমধ্যেই স্পষ্ট আকার ধারণ করেছে। ফ্রান্সের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের আড়ালে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। ইতালিতে ব্যাহত হচ্ছে পণ্য সরবরাহব্যবস্থা। স্পেনের ঐতিহাসিক চত্বরগুলোতে প্রতিবাদ জানাতে জড়ো হচ্ছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। পরিস্থিতি ঠেকাতে প্যারিস ও রোমে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করেছে কর্তৃপক্ষ।

মৌলিক যে সমস্যার জন্য মানুষ রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছে, অর্থসংকটে ধুঁকতে থাকা ইউরোপিয়ান সরকারগুলোর পক্ষে তা সমাধান করা কঠিন। ফ্রান্সের গ্রিন পার্টির এমপি পোরিয়া আমির শাহির মতে, গত ৫০ বছরেও কোনো প্রজন্মকে এত কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়নি।

তাপমাত্রা দ্রুত কমছে, অথচ জ্বালানিসংকট কাটার কোনো লক্ষণ নেই। এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপের সামনে ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে শীত। এর মধ্যেই ইউরোপের দেশগুলোতে কড়া নাড়ছে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। কয়েকটি দেশে জাতীয়তাবাদী ও জনতুষ্টিবাদী দলগুলো ভালোভাবে এগিয়ে আছে।

একদিকে ফ্রান্সে কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবরোধ করে রেখেছে শিক্ষার্থীরা—তাদের দাবি, শিক্ষায় সরকারি বরাদ্দ বাড়াতে হবে; অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে কয়েক দিন আগে তাদের সঙ্গে রাস্তায় নামে লাখো মানুষ। ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্থিতিশীলতার জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ, দেশটি জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। তবে এই সংকট যে শুধু ফ্রান্সেই, এমনটা নয়।

গত মাসে মাদ্রিদে ৮৭ বছর বয়সী এক অবসরপ্রাপ্ত নারীকে তাঁর বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনায় স্পেনজুড়ে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। আবাসনের নিরাপত্তা ও বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণের দাবিতে রাস্তায় নামে মানুষ। ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটিতে বাড়ির দাম বেড়েছে ৮০ শতাংশ। অথচ একই সময়ে বেতন বেড়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ। এরপর একই ধরনের প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে পর্তুগালেও। অতিরিক্ত পর্যটকদের চাহিদা মেটাতে দেশটিতে বাড়ির দাম ২০১৫ সালের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেড়েছে।

আলবেনিয়ায় মে মাস থেকে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করছে মানুষ। তাদের অভিযোগ, সরকার ব্যাপক দুর্নীতিগ্রস্ত। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের একটি বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাবও তাদের ক্ষুব্ধ করেছে। গত সপ্তাহে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যোগ দেওয়ার পর পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। দারিদ্র্য, জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের অভাবের মতো বিষয়গুলো সামনে এনে তারা বর্তমান সরকারের পদত্যাগ দাবি করে।

শিক্ষায় সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধি, নিরাপদ স্কুলভবন এবং সাশ্রয়ী আবাসনের দাবিতে গত সপ্তাহে এথেন্সসহ গ্রিসের প্রায় ৫০টি শহরে রাস্তায় নামে হাজারো শিক্ষার্থী ও শিক্ষক। জার্মানিতেও তরুণদের বিভিন্ন সংগঠন বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। এরই মধ্যে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানোর প্রতিবাদে বার্লিন ও হ্যানোভারে ছোট পরিসরে সমাবেশ হয়েছে।

ইতালির উত্তরের কয়েকটি শহরে মজুরি কম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে মিছিল করে শিক্ষার্থীরা। ফ্রান্স ও আলবেনিয়ার মতো সেখানেও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। মুখোশধারীরা দোকানপাট লুটপাট করে, পুলিশের দিকে পাথর নিক্ষেপ করে এবং বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন দেয়। ইতালির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম রাই পুলিশের একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, বিভিন্ন শহরে মোট বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ হাজার। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকার মিলানে পাঁচ শতাধিক সেনা মোতায়েন করেছে। প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেছেন, আন্দোলন করা সবার অধিকার, কিন্তু শহর ধ্বংস করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।

ফ্রান্সের বিক্ষোভের বিস্তার এবং গভীরভাবে বিভক্ত রাজনৈতিক বিতর্কে আগুন দিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণকারী প্ল্যাটফর্ম ভিসিব্রেইনের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের একদিনে ঘণ্টায় বিক্ষোভ নিয়ে ২২ লাখের বেশি টুইট করা হয়েছে। ২০১৮ সালের শেষ দিকে ফ্রান্সে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন যখন তুঙ্গে ছিল, তখনকার তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় তিন গুণ। লুটপাট ও দাঙ্গার সরাসরি ভিডিও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ার পর গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিনিধিদের তলব করে ফরাসি সরকার। সহিংসতাকে উসকে দেয়—এমন কনটেন্টের বিস্তার রুখতে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়।

অনলাইন তৎপরতা এক দেশের আন্দোলনকে অন্য দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে। ইতালির বোলোনিয়া শহরের বিক্ষোভে ফ্রান্সের আন্দোলনে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা স্লোগান মুখে মুখে শোনা গেছে। ইনস্টাগ্রামের বিভিন্ন পেজে ফ্রান্সে নতুন করে বিক্ষোভের জন্য ডাক ছড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, টেলিগ্রাম গ্রুপগুলোতে দুই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে।

আলবেনিয়ার কয়েকজন বিক্ষোভকারী জানিয়েছেন, স্পেনের আন্দোলনকারীরা তাদের মাস্ক ও বিশুদ্ধ পানির মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার জন্য অর্থ সহায়তা পাঠিয়েছে। আরেক দিকে, ফ্রান্স, স্পেন ও পর্তুগালের কট্টর ডানপন্থী দলগুলো রাজপথের ক্ষোভকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। তাদের বক্তব্য, সাধারণ মানুষের প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে মধ্যপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলো।

আগামী বছর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এগিয়ে থাকা প্রার্থী মেরিন লো পেন ভোটারদের বলেছেন, একমাত্র তাঁর দলই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারবে! স্পেনের কট্টর ডানপন্থী দল ভক্সের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য হোর্হে মার্তিন ফ্রিয়াসের অভিযোগ, ইউরোপের মূলধারার রাজনীতিকেরা অহংকারের পাপে ডুবে সাধারণ মানুষকে ভুলে গেছেন। ফরাসি সরকার ও ডানপন্থী রাজনীতিকদের আঙুল প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী এবং কট্টর বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলঁশেঁর দিকে। আন্দোলনে তিনি শুরু থেকেই সমর্থন দিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের উসকে দিচ্ছেন। দাঙ্গার পর প্রকাশিত জনমত জরিপেও তাঁর জনপ্রিয়তা কমার লক্ষণ দেখা যায়নি।

তবে ইতালির পরিস্থিতি বলছে, রাজনৈতিক মতাদর্শ যা-ই হোক, প্রায় সব পক্ষের নেতারাই একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। দেশটির উত্তরাঞ্চলে মেলোনির ডানপন্থী সরকারকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে তরুণদের বিক্ষোভ। আর দক্ষিণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে মহাসড়কের প্রবেশপথ অবরোধ করে রেখেছেন ট্রাকচালক ও কৃষকেরা।

স্পেনের আগাম নির্বাচনে রক্ষণশীল পিপলস পার্টি পর্যাপ্ত আসন পেয়ে কট্টর ডানপন্থী ভক্সের সঙ্গে জোট সরকার গঠন করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আবাসনসংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের প্রস্তাবিত পদক্ষেপ দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর আইনপ্রণেতারা তা প্রত্যাখ্যান করেন। বিক্ষোভের জবাবে নেওয়া ওই পদক্ষেপগুলো প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরই আগাম নির্বাচনের ডাক দেন সানচেজ। তবে নির্বাচন হলেই স্পেনের মানুষের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর ক্ষোভ কমবে, এমনটা মনে করেন না অনেকেই।

তাপমাত্রা কমছে, বাড়ছে জ্বালানির দাম। শীত যত এগিয়ে আসবে, ততই চাপে পড়বে সাধারণ জার্মানরা। জ্যাক দেলর ইনস্টিটিউটের এনার্জি সেন্টারের প্রধান ফুক-ভিন নগুয়েনের মতে, ইরান যুদ্ধের জেরে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব থেকে পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দিতে সরকার বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছিল। এখন সেগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে। তাই অসন্তোষ ও নতুন আন্দোলনের মুখে পড়তে পারে জার্মানি। এ পরিস্থিতিতে কোনো দেশই পুরোপুরি নিরাপদ নয়। তবে আসন্ন শীতে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি জার্মানি।

নগুয়েন বলেছেন, জার্মানির গ্যাসের মজুত সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি চলে গেছে। এর অর্থ, গ্যাসের দাম বাড়লে জার্মানির পরিবারগুলোর ঘর গরম রাখার খরচও ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে। গ্যাসের বাজারে অস্থিরতার প্রভাব বিদ্যুতেও পড়তে পারে। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে প্রতিবেশী দেশেও। জার্মান অর্থনীতিবিদ ব্রজেস্কিও একই আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেছেন, ফ্রান্সে যা ঘটছে, কয়েক বছর পর জার্মানিতেও তা সহজেই ঘটতে পারে।

(পলিটিকোতে প্রকাশিত বিশ্লেষণটি অনূদিত ও ঈষৎ সংক্ষেপিত)

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত