
ভাষা নিয়ে আন্দোলন করতে গিয়েই পূর্ব বাংলার মানুষ উপলব্ধি করেছিল, শোষকের কোনো ধর্ম নেই। যেকোনো ধর্মের মানুষই শোষক হতে পারে। আগে ব্রিটিশরা শোষণ করেছে, এরপর এল পাকিস্তানিরা। তাদের ধর্ম আলাদা, কিন্তু শোষণের রূপ একই।
১.
খেয়াল করলেই দেখা যাবে, পাকিস্তান নিয়ে যে উচ্ছ্বাসে ভেসেছিল পূর্ব বাংলার মানুষ, সে উচ্ছ্বাস ভাষা আন্দোলন প্রশ্নেই ফিকে হয়ে গেল। তবে বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশককে স্মরণ করলে মনে হবে, আমরা ভাষা আন্দোলনের যে ইতিহাস জেনে এসেছি, তাকে ধোঁয়াশায় ঢেকে দিতে বর্তমানে তৎপর হয়েছে যারা, তাদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের ফসল লোপাট করেছিল তারাই। ফলে, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে অগ্রাহ্য করার দুঃসাহসও তারা দেখাতে পেরেছিল। অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে যারা শাসন ক্ষমতায় ছিল এবং যাদের যা কিছু করার লাইসেন্স দিয়েছিল ইউনূস সরকার, তাদের কার্যকলাপেই প্রমাণিত হয়েছে, দেশকে তারা কোন দিকে নিতে চায়। সর্বশেষ, শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির যেভাবে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছেন দেশবাসীকে, সে কথাও দেশের মানুষ নিশ্চয়ই ভুলবে না। কখনো নিজ মতলব হাসিল করার জন্য তারা তাদের গুরু গোলাম আযমকে ভাষাসংগ্রামী হিসেবে মর্যাদা দিতে চায়, কিন্তু ভুলেও বলে না, গোলাম আযম পরে বলেছেন, ভাষা আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি ভুল করেছিলেন। পাঠক নিশ্চয়ই বিষয়টি খেয়াল রাখবেন।
মনে করার কোনো কারণ নেই যে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের ওপর যারা গুলি চালিয়েছিল, তাদের সবাইকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আমদানি করা হয়েছিল। গুলিবর্ষণের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে বাঙালি পুলিশ অফিসাররাও ছিল। ফলে, বাঙালি-বিরোধী গাদ্দাররা শুধু একাত্তরেই পাকিস্তানিদের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে ছিল, সে কথা মনে করার কোনো কারণই নেই। গুপ্ত থাকার অভ্যাস তাদের সব সময়ই ছিল। পতনের আগে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের মধ্যে যেভাবে শিবিরের সদস্যরা ঢুকে পড়েছিল এবং বঙ্গবন্ধুর নামকে ঢাল হিসেবে সামনে রেখে চালিয়ে যাচ্ছিল তাদের গোপন কার্যক্রম, তেমনি বায়ান্নতেও দেখা গেছে। তবে সে সময় এদের সংখ্যা ছিল কম। তেলাপোকার মতোই এরা দিনে দিনে বেড়ে উঠেছে।
এ কথা বললে ভুল হবে না, ভাষা আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল ছাত্রসমাজ। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাই নয়, কলেজ ও স্কুলের ছাত্ররাও এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। রাষ্ট্রভাষা উর্দু হলে সরকারি চাকরিসহ নানা পর্যায়ে বাঙালিরা পিছিয়ে পড়বে, সে ভাবনা যেমন সঞ্চারিত হয়েছিল মানুষের মনে, তেমনি পাকিস্তানে ভাষা ব্যবহারের দিক থেকে সবচেয়ে বড় জাতিই ছিল বাঙালি, তাদের ভাষা রাষ্ট্রভাষা হবে না কেন, সে প্রশ্নও জেগেছিল বাঙালির মনে। এই সত্যকে অস্বীকার করে পাকিস্তানি শাসকেরা আসলে কী বার্তা দিতে চেয়েছিলেন, তা বোধগম্য নয়। পশ্চিমারাই পাকিস্তানের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা—এই কথা পুবের মানুষদের বোঝানোর জন্যই কি ভাষার প্রতি এই তীব্র অবহেলা?
১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে মূলত তিনটি শক্তির প্রাবল্য ছিল। তমদ্দুন মজলিসের মাধ্যমে ইসলামি ধারা, জাতীয়তাবাদী ধারা আর বামপন্থী ধারা। তবে ১৯৫২ সালে এসে জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থী ধারাকেই মূলত সক্রিয় দেখা যায়। ভাষা আন্দোলনের কারণেই যে ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয়, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আমরা যখন ভাষা আন্দোলন নিয়ে আলোচনা করি, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঢাকা শহরের আন্দোলনকেই মুখ্য করে তুলি। কিন্তু এই আন্দোলন যে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল, সে ইতিহাস নিয়ে এখন গবেষণা হচ্ছে। নাম না জানা বহু ভাষাসংগ্রামী তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি পেয়েছেন। তবে তা রাষ্ট্রীয়ভাবে নয়, গবেষকদের মাধ্যমেই তাঁরা ফিরে এসেছেন ইতিহাসের অংশ হিসেবে।
ভাষা আন্দোলনের সময় ভারতীয় জুজুর ভয় দেখানো হয়েছিল। ভাষা আন্দোলন যে পূর্ব বাংলার মানুষের প্রাণের দাবি নয়, এটা ভারতে থাকা কমিউনিস্টরাই আমদানি করেছে—এ রকম প্রচারণা চালিয়েছিল ক্ষমতাসীন দল। নিজেদের যেকোনো ব্যর্থতা ঢাকার জন্য তারা ভারতীয় চক্রান্ত আমদানি করত। বর্তমান সময়েও ভারতবিরোধী কার্ডটির ব্যবহার দেখা যায়। ১৯৭১ সাল জুড়েই তো বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষকে ভারতীয় চর আখ্যা দেওয়া হয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পরও সেইসব মানুষের দেখা পাওয়া গেছে, যারা সবকিছুর পেছনে ভারতীয় জুজুর খোঁজ করেছে। ভারতীয় আধিপত্যবাদকে কূটনৈতিকভাবে মোকাবিলায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে ইউনূস সরকার। অথচ সেটা করা হলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য আসতে পারত।
ভারতীয় জুজুতত্ত্বের গল্প ভাষা আন্দোলনের সময়কার মানুষের মন গলাতে পারেনি। এটা হজম করানোর মতো কোনো তরিকা সরকারের জানা ছিল না। বরং সাধারণ মানুষও তখন ইতিহাসের সত্যের সঙ্গে পরিচিত হতে থাকে। খোঁজ করতে গিয়ে দেখা যায়, আল্লামা ইকবাল যে পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাতে পাঞ্জাব আছে, কাশ্মীর আছে, সিন্ধু আছে, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ আছে, বেলুচিস্তান আছে, কিন্তু বাংলা নেই। ইকবালের স্বপ্নের দেশটিতে বাংলা ছিল না। বাংলা ও আসাম মিলে একটা আলাদা রাষ্ট্রের কথা এসেছিল ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে, কিন্তু সেটাই ১৯৪৬ সালের দিল্লি প্রস্তাবে কীভাবে একই রাষ্ট্রের অন্তর্গত হয়ে গেল, সে ইতিহাসও এখন কারও অজানা নয়। আবুল হাশিম সম্মেলন চলাকালেই ভুলটা ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, আলাদা দুটি রাষ্ট্রের কথা স্পষ্টভাবে বলা আছে লাহোর প্রস্তাবে। কিন্তু জিন্নাহ সে প্রশ্ন পাশ কাটিয়ে গিয়েছিলেন। আর তারই ফল ভোগ করতে হয়েছে ২৩ বছর ধরে।
এবার ভাষার রাজনীতি নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। যদিও এরই মধ্যে আলোচনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তো বটেই, মূলধারার সংবাদপত্র, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, ইউটিউবসহ বহু মাধ্যমই সরগরম রয়েছে, তবু ভাষাতত্ত্বের সামান্য ছাত্র হিসেবে এ বিষয়ে কয়েকটি কথা বলতে চাই।
রাজনীতির ছাত্রমাত্রই জানেন, ভাষারও রাজনীতি আছে। কোন ভাষায় কোন কথা বললে, কিংবা কোন শব্দের বদলে কোন শব্দ ব্যবহার করলে ভাষার রাজনীতি টিকে থাকে, সেটা রাজনীতির লোকেরা জানেন। আমাদের এই দেশটাতেও ভাষার রাজনীতি হয়েছে। কেউ আমাদের বাংলা ভাষার মধ্যে অযাচিতভাবে সংস্কৃত শব্দ, কেউ জোর করে আরবি-ফারসি শব্দ ঢোকাতে চেয়েছেন। সে শব্দগুলোই টিকে গেছে, যেগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষ গ্রহণ করেছে। কাজী নজরুল ইসলাম বহু আরবি-ফারসি শব্দকে সুপ্রযুক্ত করেছেন তাঁর কবিতায়, কিন্তু নজরুলের অন্ধ অনুসারীরা যখন সেই শব্দগুলো কিংবা সে আদলের শব্দ ব্যবহার করতে গেছেন, তখন তাঁরা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। ভাষার সহন ক্ষমতা আছে। কেউ জোর করে প্রচলিত ভাষায় কোনো শব্দকে আরোপ করতে পারে না। ভাষা-ব্যবহারকারীরা যদি শব্দটাকে গ্রহণ করে, কেবল তখনই তা ভাষার অঙ্গ হয়ে যায়। বহু শব্দ থেকে যায় অভিধানে, কিন্তু সব শব্দই ব্যবহৃত হয় না। আবার কোনো কোনো শব্দ তাদের রূপও বদলে ফেলে। এ কথা বলতে গেলে একাত্তরেই ফিরে যেতে হয়। ‘রাজাকার’, ‘আলবদর’ শব্দগুলো মুক্তিযুদ্ধের আগে এই দেশের মানুষের কাছেও সহনীয় ছিল। কিন্তু একাত্তরে এই নাম নিয়ে সাধারণ মানুষকে হত্যা করা, ধর্ষণ করা, লুটপাট করাকে ‘শিল্পে’ পরিণত করেছিল এরা। পাকিস্তানিদের মনস্কামনা পূর্ণ করার জন্য তারা জান বাজি রেখেছিল। এর পর থেকেই এই দেশের মানুষ শব্দ দুটি ব্যবহার করে ঘৃণার সঙ্গে।
চব্বিশে যে গণ-আন্দোলনটি হয়, তার সঙ্গে বায়ান্নর আন্দোলনের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো, দুটি আন্দোলনের গতিপথ ভিন্ন। সবাই মিলেই আন্দোলন করেছে, কিন্তু বায়ান্নর সংগ্রামী মানুষ তাদের দ্বারা সংঘটিত ইতিহাস নিয়ে একক ও সামষ্টিকভাবে গর্ব করে। তাদের জানা আছে, কেন ছিল সে আন্দোলন, কীভাবে সে আন্দোলনে যুক্ত হলো সারা দেশের মানুষ। কিন্তু চব্বিশের আন্দোলনটি ব্যাপক গণমানুষ ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সংঘটিত হলেও এই আন্দোলনের ফল ভাগ করে নিল অল্প কিছু মানুষ। বামপন্থীসহ নানা মহলকে সরিয়ে দেওয়া হলো। যারা ছাত্রলীগের মধ্যে ঘাপটি মেরে ছিল, কিংবা বহু আগে থেকেই যারা পাকিস্তানিদের সঙ্গে গলাগলি করার অভিপ্রায় নিয়ে রাজনীতি করেছে, তারাই আরবি-ফারসি-উর্দু থেকে সেই শব্দগুলো নতুন করে আমদানি করছে, যার প্রতিশব্দ হিসেবে বাংলায় অনেক ভালো শব্দ আছে। তাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে ব্যবহার করা শব্দগুলো বাংলা ভাষায় কতটা গুরুত্ব পাবে, সেটা ভবিষ্যৎই বলে দেবে।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে এই শব্দগুলোর মধ্যেও রাজনীতি আছে। শব্দগুলো অপরিচিত নয়। কিন্তু ব্যবহার করা হচ্ছে নিজ ভাষার শব্দকে অগ্রাহ্য করে, ধর্মীয় রাজনীতি তথা পাকিস্তানপ্রীতিকে সম্বল করে। তাই এই শব্দগুলো প্রচলিত শব্দগুলোকে হটিয়ে দিতে পারবে বলে মনে হয় না। তবে, শব্দগুলো কারা ব্যবহার করছে, সাহিত্যের ভাষায় তা স্থান পাচ্ছে কি না, সংবাদপত্রে তা লেখা হচ্ছে কি না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার প্রচলন হচ্ছে কি না, সেগুলোও দেখার বিষয়। কিন্তু গোটা আন্দোলনটাকেই যারা সম্মিলিতভাবে নস্যাৎ করে দিল, তাদের মুখের কথার ওপর দেশের মানুষ আস্থা রাখবে—এমনটা ভাবা কঠিন।
একুশ মানে মাথা নত না করা—এই কথাটি বুঝতে হবে তরুণদের। তরুণেরাই গড়ে তুলবে দেশ, দেশের ভবিষ্যৎ। তবে সেই তরুণেরা নয়, যারা ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে নিজ পরিচয় ভুলে যায়। সেই তরুণের হাতে ক্ষমতা আসুক, যারা সত্যিই দেশ নিয়ে স্বপ্ন বুনতে জানে, সেই স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করতে জানে। আমরা তাদের প্রতীক্ষায় থাকব।
জাহীদ রেজা নূর
উপসম্পাদক
আজকের পত্রিকা

সম্প্রতি সড়ক পরিবহনমন্ত্রী চাঁদাবিষয়ক যে সংজ্ঞা দিয়েছেন, তাতে দেশের জনসাধারণ দ্বিধায় পড়ে আছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের প্রতিক্রিয়া দেখলেই তা বোঝা যায়।
২ ঘণ্টা আগে
মন্ত্রীদের বক্তব্য প্রদানে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। বর্তমান সরকারের মন্ত্রীদের মনে রাখতে হবে যে তাঁরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত যদিও, তথাপি অধিকার সচেতনতার দিক দিয়ে এই জনগণ কিন্তু ২০ বছর আগের অবস্থানে এখন আর নেই। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থার দলীয় জাঁতাকলে পড়ে জনগণ বৈষম্যের শিকার ও অধিকার....
২ ঘণ্টা আগে
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এমন অনেক ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে, যা অভূতপূর্ব। তার মধ্যে অন্যতম হলো, আইনবহির্ভূতভাবে মব সন্ত্রাস তৈরি করে কিছু আদায় করে নেওয়া। কে কখন কোন স্বার্থান্বেষীর কবলে পড়ে অপমানিত হবেন, অর্থ খোয়াবেন, তা এতটাই অনিশ্চিত ছিল যে এই দুর্ঘটনাগুলো আতঙ্কে পরিণত হয়েছিল।
১ দিন আগে
একসময় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলনের দৃঢ় সমর্থক ছিল ভারত। কালের পরিক্রমায় সেই ভারতই এখন ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের দখলদার ইসরায়েলের অন্যতম কৌশলগত মিত্র। মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমলেই ভারত-ইসরায়েলের সম্পর্ক এমন ঘনিষ্ঠ অবস্থানে পৌঁছেছে।
১ দিন আগে